সিন্ধু সোম-এর গল্প

Spread This

সিন্ধু সোম

ময়ূরপঙ্খি
এই পিঠা পিঠা আমগাছের দুলুনির ঘোর আঙ্গিনার গোটা সামনেটা ভরে দৌড় দিতে থাকে আন্‌খাই সারা বেলা। কোনো কাম না থাকার এই এক জ্বালা। তার ওপর ভরা বাদল। সারাদিন জল হয়ে ঝিমিয়ে থাকা মাটি আর সোঁদা বু ছড়াতে পারে না। তো এইরকম কোনো ভোরে বা সাঁজাবেলায় তিওয়ারিদের তুলসীতলার হাওয়া বে-এক্তিয়ার লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে এই আঙ্গিনায় এসে পড়লে সবে ফেলে যাওয়া মাটির নরম কলিজা শোঁ শোঁ ডাক পাড়ে। কে জানে! তা পেটের ডাকও হতে পারে। ভিজা হাওয়াটা জোর চললে তাতে আলো নিবে আসে বলে তিওয়ারিরা আজকাল এদিকে পেদিম দেয় না। বিরাট বিরাট ঘর ঘেঁষে নতুন তুলসীতলায় তাদের নতুন পেদিম জ্বলে। তাতে আগুন নাই। বিজলি গুনগুনাতেই থাকলে সেই আওয়াজ পিছনের বনের ঝিঁঝিঁর আওয়াজের সঙ্গে মিশে মাথার খোলে গুবগুবি কাটতে থাকে। জলের সময় এলে পেত্যেকবার আগুন সামায় যায় ঘরের ভিতর। ভিজা হাওয়াতে পেট বড় ডাকে। আবার তা পিছনের ঝুপো বনে ব্যাং এর ডাকও হতে পারে। এই সময় মদ্দা মাদি ব্যাং দুইটাকে কোথাও জড়িয়ে থাকতে দেখলে নিজেদের যোবন যোব্‌তী সময় মনে নেয় খুব। কিন্তু তার আজকাল দাঁড়ায় না আর!
চিকমিকা চিজ টা বাসবের মনে লাগে আছে যেন আঠা! তবে মনের ভুল হতে পারে, চোখের নোনা সময় সময় জিনিসপত্রে চারায় যায়, জানে সে। গত কয়দিন পেটে ভাতও পড়েছে আধা। মাঝে মাঝে পেটের ভিতরে রাক্ষসদের ছুপা আঁতাত ধরিছে মনে নিলে ঘুরনপাক মন ধেয়ে ধেয়ে যায় সেই আলো ঠিকরানো চাকতির দিকে। কয়েকদিন থেকেই এই আঙ্গিনায় গভীর রাতে একা একা বসে ঝিমায় প্রায় মাথা বুকের সঙ্গে লেগে আসার সময় ঝোলা চিবুক আর ফুটা কপালের মাঝখান দিয়ে অতি আবছা ভাবে বাসবের যেন মনে হইছে একটা পয়সা, সে বোধ হয় সোনারই হবে, কী যেন বলে, কী যেন বলে, মনে পড়ছে না, তা সেই পয়সা চিকমিকায় চলে ফিরে বেড়াচ্ছে সারা আঙ্গিনায়। অন্যের টাকা, তার দরকারই বা কী, আর ভগবান দিবার চাইলে তো তার কোলেই ফেলতে পারত! তা যখন ফেলে নাই, তখন ওতে লোভ দেওয়া পাপ। অমন করে লোভ দে কি এত যাদের বাড় বাড়ন্ত তারাই বাঁচবে ভাবো? হ্যাঁ! চেয়ে চিনতে নিলে এক জিনিস, কিন্তু সেই জ্ঞান হওয়া তক্‌খ ওপর‍্যালার কাছে এত যে চাওয়া, তার হিসেব মিলাতে গেলে পাওয়ার আশা নাকে জব্বর কড়া সরিষার ত্যাল মেরে এমন ঘুমায় এমন ঘুমায় শালা, চরাচর টুপ করে খসে পড়ে বাসবের! দিনে দিনে কত কীই যে দেখবে! গোয়ালার বেটা গোয়ালা, সে আবার বড়লোক! তাও গুঁতাগুঁতি যখন লাগে তেওয়ারিদের সঙ্গে তখন থানা পুলিশ না ডাকে থামান যায় না। গোয়ালা মাথামোটার জাত। আর এইদিকে রতু তেওয়ারি মারা যাবার পরে ভাই ভাই এখন আলাদা খায়। বাড়িটা রেখেছে। সে বাড়ি আর এ গোয়ালার বাড়ি! হুর! বাসবের ঘোলা চোখের সামনে মালিকের আঙ্গিনার আকন্দ ফুলগুলো পর্যন্ত ভেজা ভেজা মুখ করে মাটি ভালে। তেওয়ারিদের সেই বাড়িতে ঘর অন্তত গোটা ষাট সত্তর। তবে দুতলার বেশি বাড়া না। মাঝে বিরাট উঠান! গোয়ালার বুদ্ধিতে ও জিনিস হবার নয়। তাও তো মাতু আর সতু জমি জিরেত বুঝে আলাদা হয়ে গেল। বাচ্চা কাচ্চার হাঁকে বাড়ি থাকে সরগরম। তবে এখন আর যুবক কাউকে দেখে না আশে পাশে বাসব। হিল্লি দিল্লি কলকাতা। কেউ এদিকে খুব একটা থাকে না সোমত্থ হয়ে। আনমনে খানিক লালা চলকে বাসবের ছেঁড়া স্যাণ্ডো গেঞ্জি ভিজায় দিলে তার হুঁশ হয়। লজ্জিত হয়ে একটু চারপাশ দেখে হাতের তেলো দে মুখ পুঁছে পোষ্কার করে সে। বামুন মানুষ সেও! না পারার মধ্যে পুজোপাঠ টুকু সে করতে পারে না, চক্কোত্তি বামুন বলে কথা। পারলে এতদিন কি এইভাবে দেখে দেখে পিরায় যাবার সে দিতে পারে? এই পাঁচ মাইলের মধ্যে মন্দির হইছে এখন সাড়ে সত্তরখানা। বাসন্তী মন্দিরের ছাত নাই দীর্ঘদিন, তাই ওটাকে আধাই ধরে সে। সেই মন্দির গ্যালার কয়টা আর গেরামের কয়টা বাড়ি, জাঁকাইড়তে পারলেই হেসে খেলে কাটানো যেত, নয়? যেমনটা ফুলু মাস্টারের বেটা চালাচ্ছে। বাপ তার ঘোর নাস্তিক, সিপিএম করে গেল সারাটা জীবন, আর বেটা গায়ে নামাবলি ট চাপায় সাইকেল লে খালি একবার এদিক, আর একবার ওদিক। টিকির গেঁদা ট যদি একটুকু থেমে থাকে! “তা হাঁ রে নুনু! কত বড় কলা টরে? কে দিলেক?” বাসবের অবাঞ্ছিত কৌতূহলে টুলু একটু আমোদই বোধ করে। “নরেশ মণ্ডলের বাড়ি। এই সবে নামাইঞ্ছে পুরা কাঁদি! তা যা বহর ঠাকুর! চাঁপাবরণ রঙ! নাই নাই কইরেও চল্লিশ কিলো তো হবেকৈ! তার থেকে দুই ডজন দিইন্দিলেক! বলে, পণ্ডিত, লিঞ্জাও! ফলার কইরে খেও! তুমি হৈলে গে বামুন মানুষ, বড় পেট। ছোটলোকের পারা এক দুইটা কি তুমারে দিবার পারি? লিঞ্জাও ডজন দুই। বইল্লে বিশ্বাস কৈরবে নাই, হাথে দিলেক গুঁইজে! তা তুমার খবর কি ঠাকুর, বিয়েবাড়ি রাঁইধতে রাঁইধতে চালটা কলাটা তো ভালোই সরাইছ শুনলম!” বাসব কিছুক্ষণ তোতলাই তোতলাই মুখের বাঁধুনি আলগা করলে গোটা মুখ তার তিতা তিতা উৎকট স্বাদে ভরে ওঠে। পূজার বামুন, গাল দিতেও ভরসা হয় না যা হোক। সে একটা বিষ হাসি হেসে ঘরে ফিরে আসে। নরেশ মণ্ডল কলা দিইঞ্ছে, তাও দুই ডজন! গুলতানি মারার আর জায়গা পায় নাই! ও লোক এক দানা চাল তক্‌খ কারুরে এমনি দেয় না! নিশ্চয় বামুনের পো কিছু ফন্দি করেছে! কতরকম ফন্দি…তা ভগবানের এই কথাগুলায় খারাপ লাগলে তার কীই বা করার আছে! সেবা করাছ যাকে দে তার তো নিদেন একটা মান থাকবে! তা না, কোথাকার কে! বাসব নাকি চাল কলা সরায়! বলুক তো কেউ! অ্যাদ্দিন যাদের বাড়ি কাজ করেছে একজনা বলুক, বাসব মেনে লিবেক। লকডাউনের গোটা ট সময় সে তার চেয়ার ছেড়ে খুব একটা নড়ে নাই। আঙ্গিনার মাঝামাঝি চেয়ার ট পাতা থাকে। জল হলে সেই চেয়ার বাসব সমেত ঘরে উঠে আসে। ঘরটা এখন পাকা বটে, কিন্তু ঘরে কুনও কবাট নাই। একখান ফাটা টিন রাতে হেলান দে রাখা থাকে দোরে। ঐটাই কবাট। দিনের পর দিন পেট আধা, সাড়ে আধা, সওয়া আধা হতে থাকলে ঘরের ভিতর বা আঙ্গিনার ভিতর বসে বসে ঘুম তার বেমালুম এতখানি বেড়ে যায় যে ঘুমের ঝিমুনি উপভোগ করতে করতেও তার মনের ভিতর একটা ডর কিলবিলায়। সে ঘুম আর ডর মিলমিশ খায়ে বিরাট এক বক হয়ে, নাকি সে বক রাক্ষসই হবে, বাসবকে বুকের এ কোনা থেকে ও কোনা তাড়া করে ফেরে। সেই তাড়ায় অতিষ্ঠ হতে হতে বাসবের আরো জানি বা ঝিমিয়ে পড়ারই হয়তো কথা ছিল, কিন্তু এমন সময় দূরে তেওয়ারিদের পারিবারিক হনুমান মন্দির থেকে শাঁখ বেজে ওঠে। বাসবের চমকে চিন্তা ভাবনা সব লাল হয়ে গলায় দলা আটকিয়ে এমন একটা বিষম হয়ে ওঠে যে বাসব কাশবে না কাঁদবে সে ঠিক কূল পায় না। “মা, মাগো, মা!” আর্তনাদ করতে গেলে তার গলার ঝুলে আসা ঝিল্লি প্রবল বেগে কেঁপে কেঁপে ওঠে, এবং মুখ দমকে দমকে জোর কাশির বাড়া আর কিছুই বেরিয়ে আসে না। একটু সামলে নিয়ে বাসব নড়ে চড়ে বসে। কোন চুতমারানি বলে শাঁখের আওয়াজ মিষ্টি? এমন পিলা চমকাইঁ… এরাম! ছিঃ! ছিঃ! এমন করে লাগাতার ভগবানকে অপমান করলে সে শালা কি আর পয়সা দিবে কুনদিন? চার কুড়ির পরে আর কয়টা দিনই বা হাতে থাকে। মেরে কেটে এক কুড়ি মাত্র! মানিক মণ্ডলের বেটা শুনলে পরে হাসে গেদে। সে হাসুক! ক্যানে? জিতেন মাহাতো, ঐ অঙ্ক মাস্টার, বাসবেরই বয়েসি তো…উয়ার মায়ের হল গে পাঁচ কুড়ি নয়, বুড়ি এখনও চলে ফিরে বেড়াচ্ছে! যত কমতি শুধু বাসবের বেলায়, নয়? মাহাতোর মতো ছোটো জাত যদি অতদিন বাঁচতে পারে…সরাকের ছিলা, কুচিন্তাই তো ভবি! তা এই এক কুড়ির মধ্যে মা লক্ষ্মী এসে বসত করলে মন্দ হয় না! কিছুই তো হল না জীবনে। এখন দুটি খাওয়া যায় পেট ভরে। সারাজীবন রাশি রাশি লোককে খাওয়ানো মণ মণ পাঁঠার মাংস দোরে যখন হিসেব দিতে আসে, বাসবের চোখ মালিকের আকন্দ ফুলের পারাই মাটি ভালে। না পারার লজ্জা কি কম! এই এতদিনের সংসারে, সে কদিনই বা খাসির মাংস খাওয়াতে পেরেছে পরিবারকে! আগে তাও কুনো কুনো বাড়ি ছিল ভালো, লোক খাইয়ে যা বাঁচত, তার ভাগ দিত বাসবকে ঘরে নে যাওয়ার জন্য। ছাঁদা বাঁধত বাসব, নিজে খাওয়ার তার সুবিধা ছিল কিন্তু ঘরে আরো চারটে মুখ গলার কাছে ঢিপ হয়ে খাদ্যনালী বুজিয়ে দিত তার। ঘরে না আনতে পারলে খাওয়া হত না বেশির ভাগ দিনই! তবে একেবারেই কি হত না? পাপ তো বাসব কম করে নাই! ঐ টুক টুক খিদার মুখগ্যালা ছাপায় এক একদিন নিজের খিদা চাগাড় দিয়েছে। তখন পেটের গভীর খোঁদল থেকে উঠে আসা পাপসমেত মাংসের গন্ধ চাপা দিবার জন্য সে তাড়ি খেয়ে ফিরত আকণ্ঠ! বাড়ির লোকের কাছে আকণ্ঠ তাড়ির গন্ধ দে পাপের গন্ধ ঢাকত সে। আজকাল তো কিছুই জোটে না তেমন। তবে আশার কথা এখনও সময় ট আছে। ভগবান প্রসন্ন কখন কার উপরে হয় বলা যায়! দুটি পেটকাড়া ভাত হলেও আপাতত চলে বাসবের। মফস্‌সল সংলগ্ন এই গ্রামে মদ ধার দেয় লোকে চাল দেয় না। আজকাল না পেতে পেতে চাওয়ার ইচ্ছাটাও বাসবের শরীরের পারাই ঝিমায় আসছে। এখন সন্ধ্যা অথবা ভোর। পেট থেকে পরতে পরতে ঘুম উঠে এসে বাসবের চোখ ঢেকে ফেলতে চাইলেও সরু একটা চিনচিনে লাল পিঁপুড়ি তার কলিজায় ঘুরফিরা করে অন্তর অবধি সে ঘুম পৌঁছাতে দেয় না। শালা খানকির বেটা পিঁপুড়ি! কী করে ঢুকলো কে জানে! কিষ্টর মা বলে ঘুমাবার সময় তার মুখ খানা নাকি হাঁ হয়ে রয়। তা হতে পারে। সেই ফাঁকে শালার বেটা কখন সামাইছে অন্তরে। এখন ভোগো! পাকা চুলে এখন তখন দুটা আঙ্গুল চালালে বাসবের মাথার চামড়ার নিচের শক্ত ঠ্যাকোনে আরাম পহুঁচায় গেদে। চেয়ারের দুই পায়ের ফাঁক বরাবর নিঃশ্বাস গড়িয়ে নেমে যায় কাদার গভীরে। বাসব খেয়াল করে যেন মাথায় একফোঁটা জল পড়ল। কাল রেতে বালতি বালতি জল ছাঁচা ঘুমের মা চোদা দিয়েছে এমন! বাসবের চোখ একবার আলো দেখে, আবার ধীরে ধীরে মাথার ভিতরে মেঘ করে আসে তার। কে যেন দাঁড়ায় দূরে লাল পাড় শাড়ি পরে। ঘুঁটে দেয়। এক একবার মনে নেয় মা এসেছে নাকি? ঐরকমই নড়াচড়ার ভঙ্গি অবিকল। কিন্তু বাসবের চোখ এর বেশি কিছু খোঁজার আর প্রয়োজন বোধ করে না। মা এলেও বা এখন কি! এত তাড়াতাড়ি মার সঙ্গে যাবার মোটে ইচ্ছা নাই বাসবের। কাজেই মাকে পাঁচিলের প্রান্তে রেখে সে ঘরের দিকে মুখ ফিরায়। ঘর পাকা, কিন্তু ছাতে টালি। আকাশের ছাতি এখন টসটইস্যা রসে, এত রস এত জল কি টালির ছাতে রোখে? বাইরে জল ঝরে ভিতরে চুঁয়ায় এলে পাকা মেঝে জল জমায় রাখে। ঘরের মেঝেতেই এখানে ওখানে ঘাস মাথা তোলে, বটের চারা, জোড়ের চারা নাছোড় হয়ে পঁদে লেগে থাকে। ছাতে দুটা পেলাস্টিক রেখেছে ও, কালো আর নীল। কিষ্ট বলে বুলু। এই নামে বাসবের এক মাসি নাই ছিল! হরিসাডির পিছনের দিকে যে পুখর, তার শ্যাওলা উঠে আসে পাড়ের অনাদি চক্কোত্তির মেটে দেয়াল ধরে। বারবার নিকিয়ে পোষ্কার করতে হত। সে ছিল মাসির শ্বশুর ঘর। তা সে কতকাল আগের কথা! মাসি কবে মরে হেজে গেইছে, বাসবেরই বয়েস হতে চলল তার থেকে বেশি। কথাটা যদিও কেউ কানে তোলে না! গতমাসে পরাণ হালদারের বেটার বিয়েতে রান্না করতে ডেকেছিল বাসবকে। তো সে গিয়ে দেখে জটা আর গেঁড়েও এসেছে। হুঁহ! ইয়ারাও আবার রাঁধুনি! বাসব গলায় আটকে থাকা তুলসীতলার হাওয়া পাক দিতে থাকলে সে চেয়ারে বসে বসেই নরম মাটিতে দলা কফ ছুঁড়ে ফেলে। তা হালদারের বর বেটা এসে তদারক করে করে যাচ্ছিল রান্নার। একটানা ঘণ্টা তিনেক খেতে হাঁপ ধরেছে কোমরে তখন বাসবের। সে হালদারের বেটাকে ইশারায় কাছে ডাকে, সে এলে কড়াই থেকে চোখ না সরায়েই বলে, “এক ট টুল ঠুল কিছু নাই আছে খোকা? মাজা ট টনটইনাছে খুব……রান্না তো রাত তকখ চইলবেক, এই বয়সে অসুবিধা হয়……।” হালদার পো বয়েস শুনে আঁতকে ওঠে। “বলো কী গো খুড়ো, অ্যাঁ? তোমায় দেখে তো ষাট পঁইষট্টির জোয়ান মদ্দ লাগে!” বলতে বলতে সে নিজেও হেসে ফেলে। মনটা ভরে গেছিল বাসবের। যাই বলো, হালদারের পো টি মানুষ খাসা! তা দেছিলও তো চেয়ারের ব্যবস্থা করে হালদারের বেটা। কিন্তু কথাটা হল কি, সে পরের চেয়ার, তেমন সুখ নাই! আর এই চেয়ার হল গে বাসবের আপনার! চেয়ারের দিকে তাকায় থাকে বাসব। চেয়ারখানা ভালো, বসে গাঁড়ে মধু ফুটে যেন! তুলে নে আসার পর কত কী বলেছিল মাগি! মাজা যত ভাঙছে তত জিভে ধার বাড়ছে। এমন একখানা চেয়ারের শখ বাসবের বহু বচ্ছর! এককালে এমন চেয়ারে বসে বাবুরা রান্নার তদারক করত। এখন সবাই বসে। যারা খরিদ করতে পারে। বসে তো নয়, বাসবের মনে নেয় চেয়ারোই যেন বসায় রাখে। গাঁয়ের দক্ষিণে বিধুবাবুর বিরাট বাড়ি। বিধুবাবু কেবলস্‌-এ চাকরি করে বাড়ি তুলেছিল দোতলা। তার রোয়াব তখন ছিল দেখবার পারা! তা সে মরলে পরে ছিলা বউ নে বাড়ি বেচে কলকাতা চলে গেছে। সেই বাড়ি বাসবের বয়েসিই হবে মনে নেয়! ঘুটঘুট্টা বন তখন গাঁয়ের পাছুতে। তো সে বনের মাঝে বাড়ি করে বুড়া নাম রেখেছিল বনবাস। কই হে গ দশরথ! হনুমান কি তুমার লাতি ছেইল… লাকি? তো সে হনুমান বনবাস ছেড়ে চলে গেলে রামরাজ্যে…আহ! বড় পিঁপুড়ি! নতুন মাটি ফেলা হইছে তো! ওদেরও ভিনভিনানি গেছে বেড়ে। জলের সময় মাটি ভিজা, বাসা ভিজা ঝুপসি! তা বাসবের চেয়ারখান শুকনা থাকে বলে তাতে খানিক মাটি তুলে ফেলেছিল এক রাত্তিরেই! বাসব খেয়াল করে নাই সকালে। আর বাপোঃ! কী নাচনটাই দেখাতে হল মাগিকে ভোর ভৌরে! আবার মুখ চেপে দাঁত কেলাছিল বাঞ্চোত! বিহানের আলো হাতে ধরে চেয়ারে খড়ি তুলতে তুলতে বাসবের মনে নিচ্ছিল যেন দেয় ঘষে ওর দাঁতে দু প্যাকেট লছমন রেখা! হ! তা চেয়ার খানা ঘর ছাড়বার সময় একরকম ফেলেই দিচ্ছিল বিধুবাবুর ছিলা, বাসব চেয়েচিন্তে নে আসে। মাগির তখন কী মুখ, কী মুখ! “লাও, ভিখমাঙ্গা খাইলভরা লে আইনলেক কুরোসি! তা হ্যাঁ হে কিষ্টর বাপ, বলি তুমার কি সেই মাজা, যে বড়লোকের নরম পঁদের পারা যনখান টতে ঢাইলবে তনখান টতে ঘুষুড়ি দে সেঁধাইঞ্জাবেক? জিরজিরা হাড়েঠোড়ে পঁদ লে বুড়ার শখ কম লয়!” বাসব ফাঁপরের না পায় কুল না পায় খন্দতল! অল্প মিয়ানো স্বরে সে বলে, “আহ্‌! থাম না মাগি! তিওয়ারিরা হাইসবেক শুইনলে! ঘাটে উইঠতে চললি তুর আক্কেল হইল নাই কুনো! অ্যাঁ! রাম রাম রাম!” মুখ ঝামটা দে বুড়ি বলেছিল, “উঁউঁউঁউঁ! মরণ! ভিখ মাইঙ্গে সেই মুখে রামনাম কইরথে নাই আটকায়, উর আবার পড়োশির চিন্তা! শুনো, তুমি কুরোসি কি ডালে ডালে লিয়েঁ আইসিছ নাকি? পথে নামো নাই? লকে দেখে নাই? রাঁধুনি বামুনের পিঠে পর গজাইঞ্ছে, দেখে নাই লকে? ঘিসকার মা আইসে ঘরদুয়ার ট থেইকে বইলি গেল, ও অলকা, তুমার বরের দেইখলম পিঠে লতুন পর গো! বুড়া বয়সে কী দিছ গো রোজ খাইতে? বলি, আমার আর দিবার মুরোদ কী ঘিসকার মা, রাবণ গুষ্ঠির জইন্যে খাইটতে খাইটতে গতর কয়লা হইঙ্গেল, ইয়াদের কি আর সাধ মিটে! মুখে নড়া জথদিন না গুঁইজছে তথদিন এই! আমি ভাবি বুঝি কুনো মাগির পিছে মুখ মাইরছে বুড়া, ইয়াঁগিইইই! তারপর ঐ কুলি থেইকে সাঁচা দেখি বুড়ার পিঠে পর! দুইটা ঘরের কাজ কইরথে বুক ধড়ফড়, মদ মাইরে সারাদিন বইস্‌ থাকে, আর কুথাকার ভাঙ্গা এক ট পেলাস্টিকের কুরোসি পিঠে করে লে আইসছে আধা মিল দূর থিকে! শালা, মরণও হয় না আমার!” বাসবের তখন কয়দিন কাজ নাই, কাজ নাই তো মদও নাই, সোজা হিসাব, আর মদ না থাইকলে প্যাটের বেবাক থলি চুপসায়েপ থাকে। লোকে বলে বুকে বল নাই, আরে বল কি আর বুকে থাকে? নিচের শুঁড়টি থমকায় গেলে শরীরের যত বল বাসা বান্ধে গে ঐ প্যাটের ভিতর! তারও অবিশ্যি জ্বালা কম না! বুকে শুধু বাজা আর বাজা! এই ধড়ফড় তো এই ম্যাদামারা! মাঝে মাঝে মনে নেয় বুক আর পেট- এই দুটা না থাকলেই বাসবের সুবিধা হত। লুঙ্গির দিক নিভে আসার পরে এই দুইটার জ্বালা সইতে সইতে বাসবের হাল বেহাল! তা মদের সাহস না থাকায় সেইদিন মাগির সাথে কথা বাড়ায় নাই সে। মাগির গতরের জোর এখন বাসবের থেকে বেশি, অন্তরে মদ পড়লে তাও খুব একটা টের পাওয়া যায় না, সুদু পরদিন ফুলে ওঠা দাগগুলা বাজে গেদে। মাগিকেও দু এক থাবড়া দেওয়ার, নিদেন চুলের মুঠিটা ধরার সাহস টুক থাকে আর কি! আনখাই মুখে লেগে মার খাওয়ার কোনো যুতসই কারণ জোগাড় করতে না পেরে এবং চেয়ারের মজাটা ক্যাসেট করে তেতো না লাগাতে চাওয়ার বেবাক ইচ্ছায় বাসব যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চুপচাপ সরে পড়ে!
বাসবের ছেঁড়া গেঞ্জি আর লুঙ্গির ভিতরে মালিকের মস্ত দোতলা বাড়ির ছায়া শুকিয়ে আসে। সেই যেবার তাদের ঘরগুলান ভেঙ্গে দিল মালিক, তখন অবশ্য চেয়ার আসে নাই, কিষ্টর কাছে গে বুড়া বুড়ি হাড় নাই, কাঠি সব্বোস্ব করে জুড়াতে হয়েছিল, তখন কি কম ভুগতে হয়েছে একটু শান্তিতে বসে রেডিও শোনার জন্য, অল্প বিড়িতে টান দিবার জন্য? রেডিওটা বাসব শখ করে যখন কিনে তখন আর কিষ্টর মা কোথায়! তার দাদু ভোলানাথের সঙ্গেও বাসবের আলাপ হয় নাই, সম্বন্ধ তো দূরের বাত! তা সেই রেডিও শুনতে শুনতে অবসরে বাসব বিড়িতে বসত আনে, মদের নেশাটাকে খিঁচে খিঁচে লম্বা করে বিনুনি বাঁধতে থাকে বিগতের। ঘটনা তার জীবনে বড় কম না। ঘটনার অভাববোধও তাই বাড়াবাড়ি রকমের। বলতে গেলে রাঁধুনির পেশায় সারাজীবন প্রায় গোটা বঙ্গই ঘুরে ফেলেছে সে। পয়সার দিকে ছোঁকছোঁকটা তখন ছিল না। এখন কাজ কমার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অথর্ব শরীরের পেটের খোঁদলে আপন সন্তানের পারা লালনে পালনে সেটা উঠেছে বেড়ে। কেমন খোঁচা দিছে দেইখছো? আয়হ্ই শালা! তুকে পুষি তুর বাপকে পুষি প্যাটে, আর তুমি হারামি গুঁতা দাও বুকে ওই এক ট চাকতির জইন্য? লিব না যা! বুঝে কর গা! চেয়ারের গা বেয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস গড়িয়ে গেলে বাসবের পায়ের তলায় বর্ষার সদ্য গজানো রোঁয়া ঘাসেরা শিউরে শিউরে ওঠে। ভাগ্য ভাগ্য! নইলে গোয়ালার বাড়িতেও ভাড়া থাকতে হয়? না, গোয়ালাদের বাড়িতে ভাড়া থাকার ব্যাপার মনে খাপ খাওয়াতে পারে নাই সে। মালিকের বুড়া বাপ শালা মহা হারামি! এদের জাতটাই তাই! ছোটবেটা ভূতা চাকরি করা মেয়েছিলা বিয়া করে এখন ডাবরমোড়ে পুরানো এল আই সি অফিসের কাছকে নতুন বাড়ি কইরিছে ক্যানে! বিরাট ঘর! আর এদিককার জায়গা জমিন পুরা ভোগ করে বড় ছিলা শিবা! সে আবার ঐ কমলাফিতার পুলিশ, বিহার রোডে চাঁদা তুলে তুলে পয়সা আর মেজাজের তার কমতি নাই! কিন্তু মালিক ক্ষমতাবান হলে প্রজাদের খাড়খুড়ি এক দুইটা সুবিধা মিলে, এই যা! বাসব মালিককে সমঝায় চলে। তাছাড়া এত সস্তায় আজকের বাজারে ঘর আর পেত কোথায় বাসব? তেওয়ারিরা ভাড়া বসায় না। ওদের যা রাবণ গুষ্ঠি! তার ওপর চক্কোত্তি বামুন কনৌজির ঘরে গে উঠলে যা ছ্যাঃ ছ্যাঃ টা হবে, তা সে টের পায় ভালোই। তেওয়ারিরাও কি পায় না? পাওয়ার কথা তাদেরই তো বেশি। ঘরের মেয়ে বৌদের ব্যাপারেও ওরা একটু বেশিই কড়া। তো মাটির ঘর ভেঙ্গে রাস্তার উপর পাকা ঘর উঠালো মালিক, আর মাটির গাঁথনির ঘরগুলান তুলল নতুনেই পাকা করে পিছনের জঙ্গলের ধারে। কিষ্ট থাকে এক ছিলা এক মেয়ে বউ নে। সে হুলুস্থুল ব্যাপার! জলের মসম আসার আগে তক্‌খ সেই খানে, ভাঙ্গা ভাঙ্গা ঘাস উঠা সবুজ আঙ্গিনার এক কোণে খাটিয়া পেতে আশমানি ছাতের তলে শুত বাপ বেটায় তারা। অলকা নাতি নাতনি আর বউকে নে শুত ভিতরে! কয়টা দিন কেটেছে বড় কষ্টে। তবে নাই নাই করে তখনও রোজগার ছিল, এখন লকডাউন না কিসের বালি বাল গোটা রোজগার গুড়ের পরতে পরতে। গাঁয়ে তখনও রাঁধুনি লাগে। কয় ঘর কায়েত বদ্যি তো বাঁধা। এছাড়াও গোয়ালাদের বাড়ি, সরাকদের বাড়ি, তিওয়ারিদের বাড়ি, ইদানীং বাউরি বাড়িতেও। কিন্তু আগের পারা না! লাল নীল জামা পরা ছোকরাগ্যালা সবখানটথেই! সাজু আর গজা, দুই ভাইয়ের রমরমা ব্যাবসা। সম্পিতা ক্যাটারার। তারা কারিগর আনে দূর দূর থেকে। গাঁয়ের লোক সেখানে বড় একটা কাজ পায় না। তা গাঁয়ের লোকের রোয়াবটাও বেশি। চট করে বাগে আনা যায় না। সেই কারিগরদের  সঙ্গে কার বাপের ক্ষমতা পাল্লা দেয়! তবে পয়সা এখন বিহারিদের! বাড়ি দিছে সব এত বড়, বাসবের দম কোঁৎ মেরে সেই হারামজাদা বুকের কাছকেই ঘুরঘুর করতে থাকে। কিন্তু বিহারিদের বাড়ি বাসব কাজ ধরে না। খাঁটি হিন্দু হলেও জাতটা বড় নোংরা! ঘরদুয়ারে রাতের বেলা ছরছর করে পেচ্ছাব করতে দেখেছে বাসব ওর বাড়ির উলটা দিকে নতুন বসা বিহারিটাকে। আরাম নাই এসব বাড়িতে কাজ ধরে। এর থেকে খানদানি মোল্লা বাড়িতে কাজ নেওয়া ভালো। কিন্তু খানদানি মুসলমান এদিকে আর কোথায়! যা আছে, সব ছোটজাতের লোক।
নতুন ঘর তোলার দিন কয় বাদে ঠ্যালায় করে ঘরের সব্বোস্ব বাস্কো পেঁটরা নিয়ে ঘরে ফিরে বাসব। অ্যাদ্দিন রেডিও শুনত বাউরি পাড়ার মোড়ের কুলিতে। কিন্তু সেইখানে জোরে আওয়াজ ছাড়া যায় না, তা ছাড়া থেকে থেকে বাসের আওয়াজ নেশা কেটে পেরিয়ে যেতে থাকলে বাসবের সাদা গোঁফ বিরক্তির ঢেউয়ে কুঁচকে এতটুকু হয়ে যায়। বাউরিরা গা ঘেঁষা আজকাল বড়। বাসবের পোষায় না। চেয়ারটা পেয়ে তার বড় সুবিধা হয়েছে, তা সে কথা মাগি বুঝলে তো! নতুন ঘরের পাশে নতুন পায়খানা কলঘর! তার পাশে চেয়ার পেতে বাসব এখন বসে থাকে সর্বক্ষণ। জোরে রেডিও চললে সেই আওয়াজ মালিকের উঁচা দিয়ালের হুই দিকে তেওয়ারিদের বাড়ির ঘুলঘুলি দে নিশ্চয় ভিতরে ঢুকে পড়ে! পড়বেই! রাস্তার উলটা দিকে দিদিমণির বাড়িতে তার রেডিও জোরে চললেই হাসির শব্দ পেত প্রথম প্রথম কয়দিন বাসব। অতটা দূর! তার আরাম বোধ হয়! অতটা দূরে যদি আওয়াজ যেতে পারে তবে তেওয়ারিদের বাড়ি তো এইটুকু! হবেক লাই? আজকের জিনিস? আজ কদ্দিন হয়ে গেল শুধু ব্যাটারি বদলেছে বাসব। বিমলের বড় ছিলা দোকান দিছে তো ইলেকটিকের। তার কাছকেই কেনে। চলে বহুদিন! টিভি কেনার পয়সাও হয় নাই, জরুরতও নাই! আর রাখবেই বা কুথায় বলো! হ! হত যদি ঘর বাবু তেওয়ারির পারা, এইও নোয়ার কবাট, মাছি তক্‌খ গলতে পারে না, তাইলে হত! সে কপাল কি আর দিছে রে ভাই ভগবান! এই জায়গায় এসে বাসবের চিন্তা একটা গিঁট জড়িয়ে দুলতে থাকলে তার চোখের অনেক ভিতরে চাকতিটা চকচকায় ওঠে। কেমন পিঠা পিঠা রোদ পড়েছে পায়াখানার ঘুলঘুলির হাত দেড়েক উপর! নতুন পায়াখানার খানকি জুলুশে বাসবের চোখের বাইরেটাও ঝিলিক দেয়। যদিও চারঘর ভাড়াটিয়াই ব্যভার করে, তবু নতুন! অ্যাদ্দিন রেলপাড়ের খালি দিকটাও এখন বিহারিদের ঘরে ভরে গেছে এই কদিনে। বাসবের চোখ চিকচিক করে বটে, কিন্তু পেট খালি হয় না! কাজ নাই। মনে শান্তি নাই। এই যে ঘোষালের বাড়ির বড় কাজটা, ছয়মাস আগের থেকে বায়না দেওয়া ছিল গো! বন্ধের চক্করে সব গেল! নমো নমো করে সারল ঘোষাল। অতবড় কাজ, কিছু না হলেও ছমাস খাওয়ার মতো ব্যবস্থা হয়ে যেত! তবে এইসবের মধ্যেও খানিক শান্তি। আজ এক হাঁড়ি যোগাড় করা করা গেছে। দুপুরে রঞ্জিতকে ফোন করেছিল বাসব। রঞ্জিত না ধরে কে একটা বিহারি খানিকক্ষণ খুব চেঁচাল, বাসবের মনে হল দা দিয়ে কেউ পাকা বাঁশ চাঁচ্ছে, তারপর আপুনি কাটল। বুড়া নজরে ঠাওর হয় না, সে অলকাকে ডাকে, “শুইঞ্ছ! অ অ অ অ কিষ্টর মা, শুইঞ্ছ!” পাঁচ ছবার ডাকাডাকির পর মালিকের উঠানের দিক থেকে মাগির বেরোবার সময় হল! এতোও সইতে হয় বয়েস হলে! বাসবের মাঝে মাঝে অসহায় বোধ হয়! “কী?” অলকার প্রশ্নে বাসব কষ্ট করে হলেও একটু হাসে, “অল্প রঞ্জিতকে লাগাইন্দাও বউ, চোখ দুটা গেইঞ্ছে!” অলকা হাত থেকে ফোনটা নিয়ে মুখ ঝামটা দেয়, “উউউউউঁ! বুড়ার তেরে সোহাগ দেখো! যে ডাক, শুইনেই বুঝি, শালার পোর মতলব এট্টা কিছু না থাইকলে অমন মিনমিন কইরথ! পঞ্চান্ন বছর ঘর হৈল হে, সেই বারো বচ্ছর বয়েস ট থেইকে চিনি! হাড় কে হাড় তোমার পাঁদের রকম তক্‌খ আমার চিনা, হুঁ! হেই লাও!” বলে বটে কিন্তু আদতে করুণাই হয় অলকার। বেচারা কাজের অভাবে একদম জবুথবু হয়ে পড়েছে, তার উপর মাস দুয়েক মদ নাই, পুলিশের ঠ্যাঙ্গা খেয়েছে আনতে গিয়ে দুইবার। তো সেই তখন রঞ্জিতের সঙ্গে কথা হল, রঞ্জিত আজ রাতে বাকিতে এক হাঁড়ি তাড়ি দিয়ে যাবে বলেছে। খাসা মাল! বাসব অপেক্ষায় চেয়ারে আরো ভালোভাবে ঠেস দেয়।
পিঠা পিঠা রোদ বাগানের বড় আমগাছটার পাতার ফাঁক গলে ঠিকরানো থেকে ঝুলে ঝুলে গলে এলে তার রঙ হয় আলোচালধোয়া। সেই গলতে থাকা ওমের সাক্ষাতে তার বিপরীতে জালহীন মাকড়সা ভেসে ভেসে উপরের দিকে উঠতে থাকে। জোর বাতাসে সেই জালহীনতা বাঁকিয়ে দিলে মাকড়সাটা গিয়ে পড়ে তিওয়ারিদের বাড়ির উঁচু দেওয়ালের গায়। আবার ওঠে। পিঠের ওপর দে তা দেখতে গে মাকড়সার পেটের রঙ আর নিজের পিঠের রঙ বাসব এক করে ফেলে বারবার। নাহ্‌, চোখ দুইটাতে বাকি কিছু নাই। চোখ কচলাতে কচলাতে আলো চাল ক্রমে ময়লা হয়ে ওঠে ও একসময় বাসবের চোখের সামনে দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলা পা কাটা লাশের পারা একটা বেকার দিন সর্বত্র রক্তের ছোপ রেখে যেতে চায়। পারে কই? বাসব তার চেয়ারটায় আরেকটু শক্ত হয়ে পাশ ফিরে বসে। পা নামায় না। এইবার তার ছেঁড়া ফাটা গেঞ্জির বুনন ঢেকে যাওয়ার সময়, লুঙ্গির নিচে যে আবালচোদা প্যাঁকাটি তার মুখে ঝামা দেয়, এখন যাকে বড্ড পর পর লাগে, বাড়তি দাগা দেওয়া সেই বাঁড়াসমেত বিচি ঢেকে যাওয়ার সময়। পয়সার অভাব ট ঢাকা নেহাত তার সাধ্যে কুলায় না তাই এঁটুলির মতো লেগে থাকে পেটে, বুকে, চোখে। পয়সাটা তার বড় দরকার। অথচ ভগবানের বিচার দেখ, কাঁড়ি কাঁড়ি জুটেছে এই তেওয়ারিদের, সরাকদের! এত থাকে তার আবার হাত উপুড়ি পয়সায় কাজ কী! কে বোঝায় উপরের লোকটিকে। এইরকম একখান চেয়ার বোধহয় তারও আছে! সব বড় মানুষেরই থাকে যখন! ধীরে ধীরে রঞ্জিত আসে, রঞ্জিত যায়। টাকা আরো বাকি থাকে। দিদিমণির বাড়ির রেশনকার্ডটা ছিল বলে আধ পেটা হলেও জুটছে, নইলে পেট চালাবার উপায় ছিল ট কী? কিষ্টর হাতে প্রায় কিছুই বাঁচে না, চপ বিক্রিতে আর কটা টাকা! দোকানও তো বন্ধ রইল এত গুলা মাস। তা ছেলে তার বাগান থেকে সবজি সস্তায় কিনে এনে এই কদিন বসছিল বাজারে বাইরে, বড় রাস্তার পাশে। বাজার কমিটি সেখান থেকে সবাইকে খেদায় দিলে তারা তখন গিয়ে বসল সামডি রোডের উপর। এইদিকটা বাজারের আওতায় আসে না। লোকালয় ঘেঁষা বলে এই করোনার সময় লোকে রাস্তার পাশ থেকেই বাজার করল বিস্তর, বাজারে যাওয়ার ঝুঁকি তারা নিতে চাইল না। তা দিয়ে কোনোরকম কাটে। এখন আবার চপের দোকান খুলেছে। বাসবের বাইরে বিরানোর নিষেধ করে দে গেছে কিষ্ট, কিন্তু অলকা ঘরে থাকে না। দুবেলা পাড়া না বেড়ালে, ঢলে ঢলে গপ্পো না করলে তার আশ মিটে না। তা করুক। ঘরে থাকলেই চেঁচাবে। মাঝে মধ্যে বাসবের মনে হয়, এই গোঁসার কি কুনও কারণই নাই? বাসবের না পারা ট এই গোঁসার অনেক গভীরে ছাইচাপা তুষের পারা স্পষ্ট দেখে বাসব। মুখ তার আরো ঝুলে যায়। শালা এই সব দেখা যায় বড় পরিষ্কার, চিকমিকা চিজ ট এত ঝাপসা ঠেকে ক্যানে? এই বয়েসে বাগানে ঘাটে শরীর খাটাবার উপায় নাই বাসবের। মাথার ভিতরটা ঝাঁ ঝাঁ করতে থাকে বাকি টাকার কথা মনে পড়লে। কিন্তু তাড়িটা দরকার। এই জোলো আকাম সন্ধ্যায় পেয়াঁজের ঝাঁঝ মাখা লঙ্কা চারানো মুরগির ছাঁট দে তাড়িটা তরিবৎ। পয়সার খোঁজ আরো ভালো করে করার জন্যেই নেশার আরামটা দরকার। বাসব জিনিসপত্র নিয়ে আবার চেয়ারে চড়ে বসে। মাটিতে রাখা হাড়ি থেকে গ্লাসে করে মাল তোলে আর পয়সার আক্ষেপটা চাঙ্গা হয় প্রতি ঢোঁকে! চাটটায় হারামিটা ঝাল দেছে বেশি! উল্লল্লল্‌স! নাল টানলে তা নাক দিয়ে গড়িয়ে বেরিয়ে আসে খানিক। আর এই অলকার কথায় ধরো! এদ্দিনে মাগি তাকে দুই দুইটা ছেলে দেছে। ছেলে কি বড় কম কথা? কত পয়মন্তের ভাগ্য নাঙা, হ! সেই গেলা বইলথে গেলে মহাভারত ট হইঞ্জাবেক, লয়? সেদিকে বাসব যায় না, দুর্যোধনের পারা বেটা যেমন আছে, অভিমন্যুর পারাও তো আছে। আহা! তিন লম্বর বেটা টো সাপের ছোবলে……ঘর বাসবের আঙ্গিনার থেকে বরাবরই নিচু। মালিকের উঁচু বাঁধানো দাওয়ায় সাপ উঠে না, কিন্তু তার ঘরকে ঢুকে পড়ত মাঝে মধ্যেই। ঘুমের মধ্যে নেমে নুনু রেললাইন যাবে বলে উঠে দাঁড়িয়েছে আর চবাং করে দেছে। একরাতে সব শেষ। বাঁচানো যায় নাই। বাকি দুইটার মধ্যে ছোটো ট সেই কুথায় করোলবাগ না কুথায় গেল কাজ করতে! আজ বছর পনেরোর উপর হল, তার খবর নাই। তবে কিষ্ট হিরার জাত। বাপকে দেখে, মায়ের খবর ট নেয়। তা এত সুখ দিল যে কিষ্টর মা, তাকেই বা দিল কী বাসব? কত কী দেওয়ার খোয়াব ছিল! না, দিতে কিছুই পারে নাই বাসব, আদতে তার ঔকাত নাই। পয়সাটা কি এমনি এমনি দরকাররে বাপু! আধাপেটা খেয়ে, না খেয়ে খেয়ে পেটের একপাশে ব্যথা হয় আজকাল। গোটা জীবনটাই তো গেল একরকম! ডাক্তারেরা এত কিছু করছে, পেটটা কেটে ফেলাই দিবার উপায় বার কতে পারছে না? এখন আর পেট কতটুকু সবার? পেট ছিল বাসবের ইয়ার…
তেওয়ারিদের বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে একটা ছায়া অতি ধীর পায়ে ছাতের দিকে উঠতে থাকে। এই সময়টা মালের মৌতাত তার আশে পাশের বাতাসে স্পষ্ট। বিকাশ তেওয়ারি বাড়ির জামাই। থাকে সে দিল্লিতে। লকডাউনের দুদিন আগে বৌকে বাপের ঘরে দিতে এসে সেই যে ফাঁসছে, আর বিরাতে পারে নাই এখন অবধি। এখানে এসে অবধি সন্ধ্যার দিকে তার এই খেলা। বেশ সময় কাটে। তেওয়ারিদের ছাতের এই দিকটা থেকে শিবা ঘোষের উঠান দেখা যায় স্পষ্ট। আকাশে যদিও মেঘ, অন্ধকারে তার গুমোট অস্তিত্ব মাথাচাড়া দেয় বারবার। শিবা ঘোষের টালির ঘরের দিকটায় কুনও ইলেক্ট্রিক নাই। বাহুল্য বোধে লাগায় নাই সে। বিকাশ তার পকেট থেকে একখান সরু টর্চ বার করে। এই ধরনের টর্চে আলো ছড়ায় না। মাটি কামড়িয়ে গোল চাকতি হয়ে থাকে। এই টর্চ এই সব মুফস্‌সলের দিকে এখনও সেভাবে চলতি নাই, গাঁয়ের দিকে তো নাইওই! বিকাশ বাসবকে লক্ষ্য করে ঠার। এইদিকে পুরাপুরি আন্ধার থাকায় সে আন্ধারের জোর নাই। ধক করে চোখে ধাক্কা মারার খানিকক্ষণের মধ্যেই তা পাতলা হয়ে আসে। সেই পাতলা মেঘ জড়ানো আন্ধারের নিচে দেখা যায় বাসবের চেয়ার। বাসবের তখন হাঁড়ি শেষ হয়ে এসছে প্রায়। চোখের দৃষ্টি তলানিতে ঠেকে খর হয়ে উঠেছে। লোক ট কে দেখে আমোদ পায় বিকাশ। সারাদিন চেয়ারের উপর। হয় ঘরে, নয় আঙ্গিনায়। এখন তাড়ি খাচ্ছে মনে নেয়। লোকটা হাঁ করে অমন আকাশের দিকে তাকিয়ে কী ভাবে বিকাশের ঈষৎ লঘু মাথা তার ভার নিতে চায় না। সে টর্চটা খেলিয়ে মারে বাসব আঙ্গিনার যন কোণে বসছে তার উলটা দিকে। ধীরে ধীরে তার মাথার আমোদ আঙ্গুলে নেমে এলে আলোটা মাটির ওপর দৌড়াদৌড়ি করতে শুরু করে। বাসবের আজ মেজাজ আলাদাই। চিন্তা ফাঁপা হয়ে এলে জট খোলে, ইচ্ছা বাড়ে খুব। আজ চোখের সামনে চিকমিকা চিজটার নাচন শুরু হয়ার সময় সে একটু চড়া মেজাজে ছিল। অন্যদিন বুড়া বসে বসে শুধু জুল জুল করে তাকায় থাকে চাকতির দিকে। আজ তার কী মনে হয় সে পা টিপে টিপে উঠে যায় চাকতিটার দিকে। কিন্তু চেয়ার ট ছাড়ে না। দুই হাত দে চেয়ার ট টেইনে লাগায় রাখে গাঁড়ের সঙ্গে। ছাতের উপর থেকে সামনের দিকে অল্প ঝুঁকে চলা সেই চেয়ার সমেত অবয়বটাকে বিকাশের লাগে ময়ূরের পারা অবিকল। অন্ধকারের স্তূপ জমা হয়ে হয়ে যেন অবয়বটা দানা বাঁধছে। দিল্লিতে এখানে সেখানে ময়ূর দেখে দেখে বিকাশের চোখ অভ্যস্ত। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে এই বিচিত্র বুনো জায়গায় এত বড় একটা কালো ময়ূর দেখতে দেখতে বিকাশ তার লঘু মস্তিষ্কের লঘুতম অংশটিতে সামায় যায়। ময়ূরটা চাকতির দিকে ঠোঁট বাড়ালে বিকাশের লঘু আঙ্গুলের সামান্য ধাক্কায় সেটা সরে সরে যেতে থাকে সম্পূর্ণ উলটা দিকের কোণে। ময়ূরটা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে সেই দিকে যেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে চাকতির বেগের সঙে পাল্লা দে ময়ূরের বেগ বাড়তে থাকে। এই সময় প্রচণ্ড জোরে একটা বাজ পড়লে বিকাশের মনে হয় খানিকক্ষণের জন্য যেন ময়ূরের কঙ্কাল ফুটে উঠেছিল। কী জঘন্য, বাঁকা চোরা, কী অশ্লীল! এখন তাকে আবার দৌড়াতে দেখা যায়। এই সময় এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে প্রচণ্ড জোরে জল নামে। সেই অবিশ্রান্ত জলে চরাচর ঝাপসা হয়ে এলে বিকাশ পরিষ্কার দেখে ময়ূরটা পেখম মেলেছে। কালো পেখমে সোনালি হাজার চোখ জলের সর্বস্ব শুষে নিয়ে উঠে আসতে থাকে বিকাশের চোখে। নেশার টলোমলো পা দুটা ময়ূর টকে অবিরত নাচায় নাচায়ে তোলে। সেই জল গড়িয়ে আঁধার আরো ঘন হয়ে নামতে থাকলে তাতে ব্যাং ঝিঁঝিঁ ইত্যাদি বাড়তির ডাকের ঘনত্ব চট করে এদিক ওদিক একবার দেখে নে জায়গাটাকে তড়িঘড়ি মুড়ে ফেলতে থাকে অপার্থিব চাদরে। বিকাশের মস্তিষ্ক লঘু, তাই ময়ূরের সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে সে টের পায় না, আঙ্গিনার পিছনে বন ঘেঁষা টালির ঘরে অলকা একা, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে। সেই নিশ্চিন্ততা অবধি তার কোনো আলোই পৌঁছয় না…তার আঙুলবন্দি কোনো আলোরই আদতে সে ক্ষমতা নাই…