তদোগেন গিরতে-র গদ্য

Spread This

তদোগেন গিরতে

চাঁদ উঠেছিল গগনে
 
ভরসন্ধ্যেয় দেখি ইংরেজিতে গজগজ করছেন—‘রিডান্ড্যান্সি, সুপারফ্লুয়াস’…ইত্যাদি প্রভৃতি। শুধোই—‘কী হল আবার?’—পানু সিংহ ভুরু টঙে তুলে বললেন—‘এই সব ভৃঙ্গিমার্কা গান শুনেচো?—“যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে”—বলি, পূর্ণিমা রাতে গগনে চাঁদ উটবে না তো কী জলহস্তীর গলকম্বল উটবে? তাও যদি গগন’কে গগনবাবু বানিয়ে একটা ইয়ের মত জায়গায় চাঁদ উটিয়ে টুইস্ট দেয়া হত!… যত্তসব’…।
 
 
–তো, ঊনসত্তর সালের উনিশে জুলাই শেষবার চাঁদ উঠেছিল। তারপর থেকে চাঁদ দেখা পড়ে, পৃথিবীর আন্নিকা থার্টি, সূর্যের আলো, অ্যালাইনমেন্ট এই সব হ্যাজাং-ব্যাজাং কারণে।
–কী হয়েছিল উনিশে জুলাই?
–উনিশে না বিশে—ওইদিন নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে নেমেছিল
–একা?
–না সঙ্গে অল্ড্রিন ছিল তো, বাজ অল্ড্রিন
–বাজ? পাখি?
–না না জাঁবাজ। আগে মরণকূপে খেলা দেখাতো তো, ভটর ভটর ইয়ামাহা মোটরসাইকেল। বোর হয়ে গেল একদিন, ভাবল– আর কতদিন কুয়োর ব্যাঙ হয়ে থাকি, এইবার তো নয়ন মেলতে হয়, কুয়োর মধ্যে ভালো থাকাকেই ব’লে ওয়েল বিয়িং, সে বাপু যাচ্ছেতাই বোরিং। জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা, একটু ঝিঝিংফিঝিং ছাড়া হয়-নাকি! ব্যাঙই যদি হব তা’লে হোয়াই নট বিগ ব্যাঙ! তুমুল মারলো লাফ! সোজ্জা অ্যাপোলো ১১। স্পেসশিপ। লুনার মডিউলের পাইলট। হটেনটট, গটেনমট।
–আর কে ছিল?
–কলিন্স
–গান গায়, সেই ফিল কলিন্স?
–না না মাইকেল। তবে এও গান গাইতো। অলড্রিন আর আর্মস্ট্রং যখন চাঁদে নামছে, বেচারা কলিন্স কম্যান্ড মডিউলে একা একা ব’সে চাঁদ ঘিরে চক্কর মারছে আর গলা কাঁপিয়ে গাইছে—‘নাকা বুম, বাঁকা পম, হোকা হোকা ঝাঁয়’—খুব দুঃখের গান। তবে অ্যাস্ট্রোনটদের তো কাঁদতে নেই, জিরো গ্রাভিটি, চোখের জল যদি ছাদে উঠে যায়! তাই মাঝে মাঝে পৃথিবীতে কম্যান্ড সেন্টারে ফোন ক’রে মেসেজ দিচ্ছে—‘হোয়েনেভার ইন ডাউট, সে ওভার অ্যান্ড আউট’…।
–তারপর কি হল?
–আর্মস্ট্রং আর অলড্রিন চাঁদে নটে শাক লাগালো। আর যতক্ষণ না সে গাছ বড় হয়ে ফুল্লকুসুমিত দ্রুমদল ট্রুমদল হচ্ছে — বসে বসে চীজ-স্যান্ডুইচ খেল। চাঁদে খুব তাড়াতাড়ি গাছ বাড়ে, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ৬ ভাগের এক ভাগ তো।
–আচ্ছা, ডার্ক সাইড অফ দ্য মুন কেন দেখা যায় না?
–ওইটা তো চাঁদের পাছু। হাগু করে তো। আমরা কি আমাদের পাছু কাউকে দেখাই? চাঁদও দেখায় না।
 
 
 
এই চাঁদ চিনারের, ওই চাঁদ চিনের। সে ক্কী অবস্থা! এই শুনেই লোকজন তিন্তিরিমিন্তিরি! চিতকুটিয়ে গুড়ুমগর্জন—‘মানছি না, মানব না; কৃত্তিম চাঁদ! কালে কালে কত কী দেখব, খোদকারি! প্রকৃতি একেই গবেংগব, তার ওপরে আবার বিষকুঠুরি’। এই লোকজনই আবার ব’লে—‘মানুষ তো প্রকৃতিই’। আমি এনাদের বিন্দুও বুঝি না, বিসর্গও না। মানে, বীভারের বাঁধ, বাবুই পাখির বাসা, কুমুরে পোকার ঘর, মৌমাছি-বোলতার চাক—এইসব দেখে এনারাই বলেন—‘দেখেছ, প্রকৃতির কী টেকনোলজি’! থাক, এ নিয়ে তর্কে গিয়ে লাভ নেই—তর্ক ভারি খারাপ, মাথার মধ্যে মীরমদন-মোহনলাল লেগে যায়– ক্লাইভ বলে—‘টর্কো কোরিবা না, কোরিলে নেস্কট বার্ঠে আম্বানিনীড়ে সাউথ-ফেসিং বাথরুমে ওয়েস্টার্ন কমোডরূপে জন্মগ্রহণ কোরিবা’— সে ভারি দুঃখের ব্যাপার, তাই অন্য কিছু ভাবি।
 
ভাবি, মৌমাছির বাচ্চা ঠিক চাক বানায়, বীভার কা পিল্লা বাঁধ, বাবুইছানা যত বাবু’ই হোক ওই একই আকারের বাসা বানাবে—একেকজনের প্যাটার্ন মোটামুটি বিরাদরির অন্যজনের মত, একই ধরণের। মানুষও তো এত কিছু বানায়। কই আমি তো কিছুই বানাতে পারি না। চাঁদ বানাতে পারি না, মোটরগাড়ি, কলের পুতুল, খোশগল্প, কবিতা, গান, সত্য, মিথ্যা, প্রাণ—কিচ্ছুটি না। খুঁজি, তা’হলে কি মৌমাছি সমাজে, বাবুই-বীভার-বোলতা সমাজেও আমার মত অকর্মণ্য কেউ কেউ জন্ম নিয়েই ফেলে? কী বলে তাদের মা-বাপ—‘ঠিকসে বনা রে –নহী তো গব্বর…’?
 
আমার ভাবতে ভালো লাগে, যে আমাদের মত সব্বার জন্য এক ফিরিপার গোঁসাই আছে। ডারউইন গোস্বামী। মাথায় টাক, সাদা ছিরিছক্কা দাড়ি। সে একদিন আমাদের লাল মখমলের বাক্সে ভরে, তার বীগল জাহাজে চড়ে ঠিক গ্যালাপাগোসে রেখে আসবে।

 

 


সাবেরিয়া
 
তবু সাবেরিয়া আঁখ মারে না। অথচ সাবেরিয়া আঁখ মারলে কী কী না হয়ে যায়! গব্বরের হাতের খৈনি থেকে চুন ঝ’রে পড়ে, কালিয়া’কে ব’লে—‘কালিয়া রে, জিয়া বোলতা হ্যায়ঁ পঢ়াই উঢ়াই কর’কে থানেদার বন জাউঁ’। থানেদার ঠাকুর সাহাব ‘ম্যজিস্টর’ হ’তে চায়। কঞ্জুষ কুণাল শরণ মানিব্যাগ উপুড় করে ভিখারি রামধনিয়ার ঝোলায়, রামধনিয়া সে দিকে চেয়েও দেখে না। মুন্নু হলবাই খুফিয়া আস্তানা থেকে ‘সুধ’, দেশি ঘি বের ক’রে ডালডার কড়াইয়ে ঢালে। কড়ার জলেবিগুলোও চনমনে কমলা বুদবুদ কাটে। ডাক্তার, উকিল ফিজ নিতে ভুলে যায়, মুন্সিপালির বাবু ঘুস। বম্বই নগরিয়াতে শেয়ার সূচক এক ধাক্কায় পাঁচশো-হাজার ওঠে, মুনমুন সেন ঘাড় হেলিয়ে ব’লে—‘দুষ্টু’। আর ওই যে স্বদেশ সেন—শীতের ভোরে হাফহাতা সোয়েটার, সাদা পাজামা,  বাগানে গাঁদাফুলের আধফোটা কুঁড়িদের হোমটাস্ক করে দেন—তিনিও থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস…—অথচ ইনিই তো এক সময় সাবেরিয়া’কে অনুযোগ—‘সাবেরিয়া রে কাহে মারো নজরিয়া’—অবশ্যি সে কী আর অসলি অনুযোগ? সে হলো গে মিঠি দুখতরি, মকখন সে বনি কটার—সাবেরিয়া জানে না নাকি? সাবেরিয়া কত্ত জানে– তিন কা পহাড়া জানে, গোবরে বিচালি জানে, দেয়ালে সুচারু ঘুঁটে, চালবাটায় জলের পরিমাণ, আলপনা, হনুমান চালিশা, নয়নে কাজল—পরধানমন্ত্রীও জানে নাকি এত কিছু! তবে কী’সের দুঃখ তার? কোথায় পাষাণভার? সাবেরিয়া আঁখ মারোঁ, আঁখ মারো লছমি হামার!
 
 
 

কত অজানারে
 
বাঙালি সাহিত্যপ্রেমীঃ দোর্মশাই দস্তয়েভস্কি, ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট একটা বই হলো? এই দেশে কত আগে কর্মফল নিয়ে কত লেখা হয়ে গেছে– ক্রাইম অ্যান্ড নারিশমেন্ট–সে হলো গিয়ে ওরিজিনাল…তা’ছাড়া দুঃখ-কষ্ট জীবনে না সইলে অভিজ্ঞতা হয় না, অভিজ্ঞতা ছাড়া মহৎ সাহিত্য হয় না মশাই। দস্তয়েভস্কি শালা বড়লোকের বাচ্চা, সারাজীবন পোলাও কালিয়া পেঁদিয়ে গেল…
আমিঃ ইয়ে, মানে উনি তো সাইবে…
বাসাঃ জানি জানি মশাই, সাইবেরিয়ায় আউশগ্রাম কনসেন্ট্রেনশান ক্যাম্পে হিটলার ভরে দিয়েছিলেন…সে আর এমন কী। তবে কী জানেন, ওই কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্পে-ফ্যাম্পে মানুষের রসবোধ হারিয়ে যেত– শরবত হয়ে ঢুকচে নকুলদানা হয়ে বেরোচ্চে–ভবদুলাল বন্দ্যো লিখেছিলেন–শুষ্কং কাষ্ঠং, ওই রকম…পড়বেনই যখন তখন আমাদের দশানন হাতি পড়ুন, দাস্ত-য়ে-কশ্তি নামে লেখেন। নাম শুনেছেন? জীবনসংগ্রাম কাকে বলে জানেন? শুনুন—রবীন্দ্রনাথ তো সোনার তরীতে বসিয়ে বললেন—‘দশানন, তীরে শান্টিং করে আয়’—একে সাঁতার জানেন না; সেই সাতসকালে গোটা ছাব্বিশ মুলোর পরোটা, এক থাবা পেঁয়াজ, দু-খুরি নবদ্বীপের দই খেয়ে ঝিমুচ্ছিলেন—তার মধ্যে মহাজনের আদেশ। চেপে তো বসলেন। তার পর মশাই, তরী আর কী সেই তরী! হাল নাই, মাস্তুল নাই, পিগমি সাইজের ডিঙ্গি, দাঁড় টানো আর টানো…—এই করতে করতে মাঝনদী মশাই, কূল দেখা যায় না, দশহাত গভীর, পেট মুচড়ে বেগ এলো, দই-এ বোধ হয় কিছু ছিল। দশানন তো পড়লেন বিপদে, নৌকোয় একা—সাইডে বসে যে নামাবেন তারও উপায় নেই ব্যালান্স হারিয়ে জলে পড়লে ডুববেন তো বটেই, তার ওপরে আড়ে বোয়ালে যদি কুস্থানে কামড়ায়, সেপটিক না হয়ে যায় কোথায়! সামলাতে না পেরে নৌকোর পাটাতেই নামালেন। সাতদিন সাত রাত নিজের দাস্তের সঙ্গে সহবাস, তীরে পৌঁছেই নাম নিলেন দাস্ত-য়ে-কশ্তি। ওই যে সামনেই গনোরিয়াপুর—ওখানেই বাস—কলকাতায় ফ্ল্যাটও আছে…
 
 
 

চুটকুলাজ
 
বাঙালি হিসেবে আমার সবচাইতে গর্বের ব্যাপার হলো, বাঙ্গালির সেন্স অফ হিউমার। মহারাণা প্রতাপও মেনে নিয়েছিলেন–সে জিনিস চিত্তৌর কেল্লাদপি দুর্ভেদ্য। বাঙ্গালির জন্য, যে কোন চুটকুলাকে প্রথমে নিউটনিয়ান লস (loss নয়) অফ গ্রাভিটির বশবর্তী হয়ে, তাগড়া তন্দুরুস্ত হয়ে উঠতে হবে, এবং একই সঙ্গে কেমিক্যাল প্রপার্টি হিসেবে ডালডাকে ডিহাইড্রোজিনেট করে রিফাইন্ড তেলে পরিণত করার ক্ষমতা আয়ত্ত করতে হবে।
এই মালটা ইংরেজিতে দাঁড়াত ভালো, বাংলায় লেম (খোঁড়া) হয়ে গেল
দ্য মোস্ট অফেন্সিভ থিং ইয়ু ক্যান টেল আ লেম জোক, ইজ টু এডভাইস ই্ট টু পুট ইটস বেস্ট ফুট ফরোয়ার্ড–since the joke has attained physicality by now, it amounts to body-shaming.
যাঁরা বনস্পতি ও রিফাইন্ড নিয়ে ধন্দে পড়লেন– পেটের চর্বি, কাতুকুতু, ও কোলেস্টেরল নিয়ে ভাবতে পারেন
‘I can calculate the motion of heavenly bodies, but not the madness of people.’–জনশ্রুতি, নিউটন এই আপ্তবাক্যর জন্ম দেন শেয়ারবাজারে বিস্তর ঝাড় খেয়ে–ফলে, একে আউটকাম অফ Newtonian loss of property–ধরা যেতে পারে।
এইযে এতগুলো ছোট ছোট লেম জোক, একত্র হয়ে এক প্রায়গোদা চেহারা ধারণ করল–এ হলো, নিউটনিয়ান ল’স অফ গ্রাভিটেশানের ফল। যা কাছাকাছি জিনিসকে একত্রে এনে নিউক্লিয়েশান-এর মাধ্যমে বড়সড় করে তুলতে পারে।
 
 
 

কলচর
 
শুদ্ধ ভাষায় বলে–‘ঘঞ্জস্য বড়্গ, বড়্গস্য বাউল’। এ হলোগে চাইনিজ ঐকিক নিয়ম–খঞ্জ যদি খোঁড়া হয়, ঘঞ্জ তবে কি? খড়্গ যদি খাঁড়া হয়, বড়্গ তবে কি? চাউল যদি চাল হয়, বাউল তবে কি? ওয়াসেফার জামান শিকিয়েছিল, সাল বোধ হয় ৯২-৯৩. চন্দরবিন্দু দু’চার পাতে নয় বেশিই পড়ল!
তা, সে বছর হরিহরণের প্রথম গজল এলবাম– এহদে মস্তি হ্যায়ঁ, লোগ কহতে হ্যায়ঁ। পৌষমেলায় শিক্ষাভবনের স্টলে আমিই এনে চালিয়েছি, তারস্বরে। কতিপয় সুবেশা মধ্যবয়স্কা এলেন, কপালে ডলারসাইজ টিপ, খোঁপায় টগর। এসেই হুজ্জোত–‘লজ্জা করে না, পৌষমেলার পবিত্র অংগন কলুষিত করতে’ (একদম এই ভাষা)! আমি তো পপাত চ। রক্ষে করলে হাবল (এই হাবল টেলিস্কোপ বানায়নি, তবে এই হাবলকে বানাতে টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হয়েছিল– দূরদর্শিতার কথা বলছি আর কী!)। হাবল তখন গাঁজায় সিক্ত, ধেনোয় কেলাসিত, শান্ত ভাবে বললো– ‘দোর বাঁড়া, শেক্সপিয়ার পড়েননি? জানলা দুদিকেই খোলা রাখতে হয়, একদিক দিয়ে মশা ঢুকবে, তবেই না অন্যদিক দিয়ে বেরোবে…’