ভাস্কর বাগচী-ভ্রমণ

Spread This

ভাস্কর বাগচী

মরু শহর বাড়মের ও মন্দিরময় কিরাডু 

জয়সলমীরে সোনার কেল্লা দেখে ফিরে আসার পথে তাজিয়া টাওয়ারের পাশে প্রাইভেট গাড়ির স্ট্যান্ডে আলাপ হল রাজপুত যুবক দীনেশ পারমার ভাটির সাথে । দীনেশের দু’কানে হীরের দুল ওর ভাটি রাজপুতের স্বকীয় পরিচয় বহন করে চলেছে । ওর সাথে চুক্তি হল দীনেশের নতুন গাড়িতে আমরা জয়সলমীর থেকে মরুগ্রাম  খুরিতে রাত্রিবাস করে উড ফসিল পার্ক হয়ে পৌঁছব প্রাচুর্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরা ঐতিহাসিক গরিমা মণ্ডিত বাড়মের শহরে । জয়সলমীর থেকে বাড়মের যাওয়ার রাস্তায় খুরির পথেই পড়ে উড ফসিল পার্ক । এই পার্কেই জানা গেল মরুভূমি তৈরির ইতিহাস । ১৮ কোটি বছরের পুরনো জীবাশ্ম রয়েছে এখানে । গবেষণায় জানা গেছে এককালে থর মরুভূমি  ছিল জলের তলায় । জয়সলমীর থেকে কালো চকচকে পীচের রাস্তা মরু ভুমির বুক চিরে সোজা চলে গেছে পাকিস্তানের দিকে মুনাব্বাড় পর্যন্ত । সীমান্ত শহর মুনাব্বাড় জয়সলমীর থেকে ২৮০ কিমি ।  পথের দুধারে শুধু সোনালি বালির ধূ ধূ প্রান্তর । মরুগ্রাম খুরি জয়সলমীর থেকে ৪৫ কিমি । খুরি থেকে বাড়মের শহরের দূরত্ব ১৫০ কিমি । বাড়মের রাজস্থানের জেলা শহর । শহরের দুপাশে পাথরের পাহাড় আর ছোট ছোট টিলা । শহরের ডানদিকে আদিগন্ত বালিয়াড়ি বা বালির পাহাড়  । বাঁ দিকে ধূ ধূ সমতল বালুকা প্রান্তরের মাঝে কাঁটা গাছের ঝোপ । ইন্দিরা গান্ধী ক্যানেলের সৌজন্যে পূর্ব রাজস্থানের সুজলাং সুফলাং দৃশ্য এখানে যেমন দেখা যায় তেমনই সাথে আছে বাড়মেরের অপূর্ব মরুময়তা । উৎসবের প্রাচুর্যে ভরা এই শহর হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে । দীনেশ আমাদের হোটেলে ছেড়ে বিদায় জানিয়ে ফিরে গেল । দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা একটি বিক্রম ( বড় অটো ) ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে । অটোর ড্রাইভার মুন্নালাল স্থানীয় লোক । বেশ আমুদে । ও প্রথমেই আমাদের নিয়ে গেল  পাহাড়ের ওপরে যোগমায়া মন্দিরে । পাহাড়ের ওপর থেকে পাখির চোখে বাড়মের শহরটাকে দেখতে দারুণ লাগে । বালিয়াড়ি আর সবুজের সমারোহে শহর টাকে বেশ বৈচিত্র্যময় মনে হল । মরু অঞ্চল হলেও এখানে মাত্র ৩০-৪০ ফুট মাটির নিচেই জল পাওয়া যায় বিস্ময়কর ভাবে । মুন্নালাল বলছিল মাত্র পাঁচ বছর আগেও ওরা যে চাষযোগ্য  জমি  ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে আজ তার দাম দশ লক্ষ টাকা । এর কারণ এ অঞ্চলে মাটির নিচে লুকিয়ে আছে খনিজ তেল যা এই জেলার অর্থনীতিকে এক লহমায় বদলে  দিয়েছে । ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেল আজ থেকে প্রায় আটশো  বছর আগে জনপ্রিয় রাজা বাহাড় রাও এই শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তাঁর প্রতিষ্ঠিত কেল্লার নাম ছিল বাহাড়মের যা আজকের বাড়মের । প্রাচীন সেই দুর্গের কিছুই আর আজ অবশিষ্ট নেই । বাড়মের আগে দেশীয় রাজ্য যোধপুরের অন্তর্গত ছিল । ১৯৪৯ সালে যোধপুর ভারতের অন্তর্গত হলে শহরের নামেই বাড়মের জেলা গঠিত হয় । বর্তমান বাড়মেরের খ্যাতি তার মন্দির , লোকশিল্প , লোক নৃত্য ও লোক সঙ্গীতের জন্য । রাজস্থানি  শিল্পে বাড়মের তৈরি করেছে তার নিজস্ব ঘরানা । এখানকার চামড়ার তৈরি উট , কাঠ খোদাই এর কাজ , মৃৎ শিল্প কার্পেট ও রং বাহারি রাজস্থানি পোশাক এক কথায় অসাধারণ । দামও জয়শলমীর বা যোধপুরের তুলনায় অনেক কম । রঙের বৈচিত্র্য ও বিশেষত্বে বাড়মের অনন্য । এখানকার ঘাগরা , চোলি  ও ওড়নায় গাঢ় লাল ও গাঢ় নীল রঙের প্রাধান্য । মুন্নালাল এর পরে আমাদের নিয়ে গেল শহরের পশ্চিম প্রান্তে পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা প্রাচীন জৈন মন্দিরে । মন্দির একটি নয় , চারটি । প্রবেশ দ্বারের পাশেই একটি মন্দির । তারপর সিঁড়ি দিয়ে বেশ খানিকটা উঠলেই মন্দির চত্বর । এখানে আছে তিনটি মন্দির । চারটি মন্দিরই সাতশো বছরের পুরনো । মন্দিরের গায়ে একটি শিলালিপি আছে যা মুন্নালাল আমাদের দেখাল । ওর মুখেই শুনলাম এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা  বাড়মেরের তৎকালীন প্রভাবশালী রাজা কুলশ্রী সামন্ত সিঙ্ঘদেব । এরপর ধীরে ধীরে নতুন জৈন মন্দির , বালার্ক মন্দির , শিবজী আখড়া দেখে আমরা চললাম বালিয়াড়ির পথে । তবে বাড়মেরের সবথেকে সুন্দর জায়গাটি হল শিব জী আখড়া থেকে এক কিমি দূরে মরু পাহাড়ের ওপরে বালিয়াড়ি । এখানে এসে সবাই মুন্নালালকে শাবাশি দিচ্ছিল এই সুন্দর জায়গায় নিয়ে আসার জন্য । দিগন্ত বিস্তৃত এই মরু পাহাড় দূরে মিশে গেছে আকাশের সাথে । প্রায় হাঁসফাঁস করতে করতে অনেক পরিশ্রম করে বালির পাহাড়ের মাথায় চড়লাম আমরা সকলে । এই মরু শহরে সূর্যাস্ত হয় প্রায় সাতটায় । পাহাড়ে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে কাঁটা গাছ। কিছুদূরে কিছু বড় গাছে নানা ফুল ফুটেছে অজস্র । কমলা , নীল আর খয়েরি রঙের ফুলের সমারোহ অবাক করে দিল । বালির টিলায় বসে ফটো তুলতে তুলতে সূর্য ঢলে পড়ল পশ্চিমাকাশে । মরু পাহাড়ে রক্তিম সূর্যের  লোহিত দিগন্তে অস্ত যাওয়া সত্যি অসাধারণ । চারিদিকে ছড়িয়ে আছে সোনালি আভা । মনে হচ্ছে আমরা ক’জন কোনও সোনার স্তুপে বসে আছি । এ দৃশ্য মনের ফ্রেমে বন্দী হল চিরকালের জন্য । ক্লান্ত , শ্রান্ত আমাদের মুন্নালাল পৌঁছে দিল হোটেলের সাময়িক আস্তানায় । আর হয়তো কোনোদিন ওর সাথে দেখা হবে না । ওর অমায়িক ব্যবহার মনে থাকবে অনেকদিন । কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁরা তাঁদের সহজ সরল   ব্যবহারে সহজেই মানুষের কাছে আপন হয়ে ওঠেন। মুন্নালাল ও তার ব্যতিক্রম নয় ।

পরের দিন সকালে বাসস্ট্যান্ডে একটি বোলেরো ঠিক করা হল  । গন্তব্য প্রায় ৩৫ কিমি দূরের কিরাডু । ড্রাইভারের নাম বীরু  সিং । বাড়মের  থেকে একটা সুন্দর চওড়া পিচ ঢালা রাস্তা চলে গেছে ১২৫ কিমি দূরের সীমান্ত শহর মুনাব্বাড়ের দিকে । ওপারে পাকিস্তান । এ পথেই পড়ে হাথমা মোড় । মোড় থেকে দক্ষিণে ২ কিমি   ন্যারোগেজ লাইনের ছোট্ট স্টেশন । স্টেশনের নামটাও বড় সুন্দর । খারিন স্টেশন । আর উত্তর দিকে এক কিমি গেলেই কিরাডু গ্রাম । সেখান থেকে ৪ কিমি দূরে পাহাড়ের কোলে প্রত্নস্থল । এখানেই নির্জন পাহাড়ের পাদদেশে নান্দনিক শিল্প সুষমায় কিরাডু মন্দির দেখে মুগ্ধ হলাম । পাঁচটি মন্দিরের মধ্যে একটি বিষ্ণু মন্দির । অন্য চারটি হল শিব মন্দির । বীরু আমাদের পুরাতত্ত্ব বিভাগের চৌকিদারের কাছে নিয়ে গেল । প্রবেশ মুল্য নেই কিন্তু ক্যামেরার জন্য চার্জ দিতে হয় । বীরুর কাছ থেকে যা  তথ্য পেলাম তাতে জানা গেল এখানকার সোমেশ্বর মন্দিরটিই খ্যাতির শীর্ষে। পারমার রাজবংশের সোমেশ্বর এখানকার রাজা ছিলেন । তার আমলেই তৈরি হয়েছিল এই মন্দির । পারমার দের পরে আসে চৌহান রাজবংশ । এদের আমলেও ভাস্কর্য ও স্থাপত্যে উন্নতির শিখরে বিরাজ করতো কিরাডু । গুর্জর  প্রদেশের সোলাঙ্কি রাজবংশ এদের অধীনে ছিলেন । একারণেই এখানকার শিল্প ভাস্কর্যে গুজরাট ও মাড়ওয়ারের প্রভাব লক্ষ্য যায় । তুর্কী আক্রমণে মন্দির গুলি পরবর্তী কালে ধ্বংস হয় ও গ্রামগুলি পরিত্যক্ত হয় । অতবড় অঞ্চলে কেয়ারটেকার ছাড়া কোনও জনপ্রাণী চোখে পড়ল না । ফেরার পথে বীরুকে এই ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার   শরিক হলাম ।

বীরু জানালো রাজস্থানের মরুভূমি-ঘেঁষা শহর বারমের থেকে ৩৫ কিমি দূরে অবস্থিত কিরাডু মন্দির কিন্তু তার আশ্চর্য স্থাপত্যের জন্য যতটা না বিখ্যাত, তার থেকেও বেশি মাত্রায় তার খ্যাতি অন্য এক ব্যাপারে। ‘বিখ্যাত’ না বলে ‘কুখ্যাত’ বলাই ভাল। সোলাঙ্কি রীতির স্থাপত্যের এই মন্দিরে রাত্রিযাপনের কথা নাকি কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না।

একে মরু-ঘেঁষা ভূপ্রকৃতি, তার উপরে শুকনো হাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। দিনের বেলাতেই কিরাডু কেমন যেন গা-ছমছমে। মন্দিরে প্রবেশের সদর দরজা জং ধরে বহুকালই বন্ধ। মন্দির কমপ্লেক্সে প্রবেশ করতে গেলে একটা ছোট দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। কিংবদন্তি অনুসারে কিরাডুর আদি নাম ‘কিরাডকোট’ বা ‘কিরাদকোট’। ষষ্ঠ শতকে কিরাদ-বংশীয় রাজপুতরা এখানে রাজত্ব করতেন। কিরাদ-জনপদ এককালে খুবই সমৃদ্ধ ছিল। বাসিন্দারা সকলেই ছিলেন শিবভক্ত। মন্দিরের অধিষ্ঠাতা দেবতা মূলত শিব।

 কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, ১২ শতকে পারমার রাজবংশের সোমেশ্বর নামে এক রাজা এখানে রাজত্ব করতেন। তাঁর আমলেই ভারতে তুর্কি অভিযান ঘটে। কিরাডু এই আক্রমণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সোমেশ্বর এর পর থেকে বিদেশি আক্রমণের ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন। এবং তিনি এক সন্ন্যাসীর শরণাপন্ন হন। সন্ন্যাসীর সঙ্গে এক শিষ্য ছিলেন। তিনি সেই শিষ্যকে কিরাডুতে রেখে যান। ক্রমে কিরাডু তুর্কি আক্রমণের ক্ষতগুলিকে অতিক্রম করে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু কিরাডুর মানুষ ওই শিষ্যের কথা বেমালুম ভুলে যায়।

    একসময়ে এই শিষ্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক কুম্ভকারের স্ত্রী ছাড়া আর কেউ তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায়নি। এমন সময়ে সন্ন্যাসী ফিরে আসেন। এবং তিনি তাঁর শিষ্যের প্রতি কিরাডুবাসীর অবহেলা দেখতে পান। ক্রুদ্ধ সন্ন্যাসী এই মর্মে অভিশাপ দেন যে, এই মানবিকতাহীন জনপদের সর্বনাশ হবে। তাঁর অভিশাপেই নাকি গোটা কিরাডু পাথরে পরিণত হয়। কেবল সেই কুম্ভকার-পত্নী জীবিত থাকেন। সন্ন্যাসী তাঁকে সন্ধের আগে কিরাডু ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেন। এবং যাওয়ার পথে পিছনে তাকাতে নিষেধ করেন। সেই মহিলা সন্ন্যাসীর আজ্ঞা পালন করেন। কিন্তু জনপদের সীমান্তে পৌঁছে কৌতূহলবশত পিছনে ফিরে তাকান। দেখতে পান, গ্রামবাসীরা সকলেই পাথর হয়ে গিয়েছে। এই তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনিও পাথরে পরিণত হন।

                এই কাহিনির কোনও বাস্তব প্রমাণ অবশ্যই নেই। কিন্তু লোকবিশ্বাসের এতটাই গভীরে এই কাহিনি শিকড় গেড়ে রয়েছে যে, একে প্রায় ইতিহাসের মর্যাদা দেন স্থানীয় মানুষ। তাঁদের ধারণা, সূর্যাস্তের পরে আজও ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে সন্ন্যাসীর অভিশাপ। পাথরের মূর্তিরা ক্রমে প্রাণ ফিরে পায়, মরুভূমির শুকনো হাওয়ায় ভাসতে থাকে পাথরের দীর্ঘশ্বাস। প্রেতলোক আর ইহজগতের সীমানা আবছা হয়ে যায় কিরাডুতে। নেমে আসে ছায়ামূর্তির দল।

আজও সন্ধের পরে কিরাডুর অসাধারণ মন্দিরগুলি জনশূন্যই থাকে।   রমণীয় প্রকৃতির বুকে এই অপার্থিব সৌন্দর্যের শরিক হতে পেরে ধন্য হলাম । বীরুকে ধন্যবাদ দিলাম গাইডের ভুমিকা পালন করার জন্য । নির্জনতার শেষ স্টেশন শিল্প সৌন্দর্যের প্রত্নভূমি   কিরাডু দেখে ফিরে এলাম বাড়মেরের কোলাহল মুখর জনারণ্যে – ভ্রু সন্ধির টিপের মতো লাল সূর্য টা তখন ঢলে পড়েছে গেরুয়া পশ্চিমাকাশে ।