শামিম আহমেদ-এর প্রবন্ধ

Spread This

শামিম আহমেদ

দুঃখনাশিনী দুর্গা
 
 
‘দুর্গা’ কথাটি ‘দুর্গ’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। দুর্গ বলতে আমরা বুঝি এমন জায়গা যেখানে সহজে শত্রুরা প্রবেশ করতে পারে না। সেই হেতু দুর্গ অনেকখানি নিরাপদ জায়গা। এই ‘দুর্গ’ কথাটি এসেছে ‘গম্’ ধাতু থেকে। ‘গম্’ ধাতুর অর্থ গতি, গমন, প্রাপ্তি, জ্ঞান, অতিক্রম। সেই জন্য ‘দুর্গ’ কথার প্রাথমিক মানে হল অশক্যগমন বা অসাধ্যগমন। সেখানে সহজে ঢোকা সম্ভব নয়। এই সব কথা আমরা প্রসিদ্ধি থেকে জানি। এই ক্ষেত্রে শব্দের অবয়বশক্তি থেকে যে অর্থ আমরা পাই, তা প্রসিদ্ধি থেকে প্রাপ্ত অর্থের অনুরূপ। এমনই এক অপরাজেয় দৈত্য ছিলেন দুর্গ, যাকে নাশ করেছিলেন এক দেবী। সেই দেবীই দুর্গা। দুর্গা হলেন দুঃখে প্রাপ্যা। এই দুঃখ, কষ্ট, জরা মানুষের প্রধান শত্রু, সে অপরাজেয়ও বটে। তাকে জয় করতে পারেন যিনি সেই মহাবিঘ্নাদিনাশিনী দেবী হলেন দুর্গা। দ-কারে তিনি দৈত্য ধ্বংস করেন, উ-কারে নাশ করেন বিঘ্ন, র-কারে তিনি রোগজরা থেকে মুক্তি দেন, গ-কারে হয় পাপনাশ এবং আ-কারে নাশ হয় ভয়শত্রু। কখনও তিনি নববর্ষা কুমারী, কখনও নীলী, আবার অপরাজিতা। দৈত্য কে? সে অসুরপ্রকৃতি জন—কৃষ্ণ নাহি মানে, তাতে ‘দৈত্য’ করি মানি। চৈতন্য না মানিলে তৈছে ‘দৈত্য’ তারে জানি। এই কথা চৈতন্যচরিতামৃতে আছে।
দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।
উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।।
রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।
ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।।
(পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৪ থেকে উদ্ধৃত)
এই জগতে নানা প্রকারের দুঃখ। সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের সাম্যাবস্থা হল প্রকৃতি। রজোগুণ বড়ই চঞ্চল, তার এক পরিণাম হল দুঃখ। এই দুঃখের আবার তিনটি ভাগ—আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক। ইন্দ্রিয়, মন ও দেহ থেকে উৎপন্ন দুঃখ হল আধ্যাত্মিক; ভূত থেকে জাত—মানুষ, পশুপাখি, সরীসৃপ থেকে উৎপন্ন দুঃখ হল আধিভৌতিক; আধিদৈবিক দুঃখ হল অধিদেবভব—দেবযোনী প্রভৃতি থেকে সংঘটিত। এই দুঃখ হল সকল বন্ধনের মূল। তা থেকে জীব মুক্তি পেতে চায়। এই যন্ত্রণার রাজ্যই দুর্গ নামক অসুর বা দৈত্য, তাকে যিনি বিনাশ করেন তিনি মুক্তি বা দুর্গা।

এই দুর্গারূপী মুক্তি নিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শন অনাদিকাল থেকে চর্চা করে এসেছে। তাই মুক্তি বা দুর্গা এক নন, তিনি বহু—কখনও তিনি নির্বাণ, কখনও তাঁর নাম নিঃশ্রেয়স, কখনও তিনি মোক্ষ নামক পরম পুরুষার্থ। বিভিন্ন মানুষ নানা প্রকারে বিঘ্ন নাশ করার চেষ্টা করেন। বিঘ্ন বা দুঃখযন্ত্রণানাশের নানা পথ—তাই দুর্গা কোনও একক শক্তি নন, তিনি সকলের মিলিত শক্তি। অশুভ-র বিরুদ্ধে শুভ, অবিদ্যা নামক অন্ধকারের বিপক্ষে জ্ঞানরূপী আলো, অধর্ম বা নীতিহীনতার বিরুদ্ধে ধর্ম বা নৈতিকতা, ঘৃণার প্রত্যুত্তরে ভালবাসা, দাঙ্গার জবাবে শান্তি—তিনি নানা রূপে বিরাজমান। এই দুর্গার প্রতীকীরূপ তাই বহুভূজা—সেই সব হাতে থাকে নানা অস্ত্র। কখনও তিনি অষ্টাদশভুজা, ষোড়শভুজা কিংবা দশভুজা, বা অষ্টভুজা অথবা চতুর্ভুজা। দেবী দুর্গার নানা মূর্তি দেখা যায়। তবে দশভুজা রূপটিই বেশি জনপ্রিয়। অনেকটা দশের লাঠির মতো। আঠারোটি হাতের পিছনে আছে প্রতীকী অর্থ। আঠারো পর্বে যেমন মহাভারত, আবার আঠারো দিনে সংঘটিত হয়েছিল মহারণ। এমন এক মহাকাব্যে দেবী দুর্গার কোন পরিচয় পাওয়া যায়?

বনপর্বে দেখি, অজ্ঞাতবাসের সময় পাণ্ডবরা নানা স্থান পর্যটন করে একদিন দ্রৌপদীসহ এসে পৌঁছলেন মৎস্য নগরে। প্রথম পাণ্ডব যুধিষ্ঠির মনে মনে দুর্গার স্তুতি করছিলেন। আর বার বার তাঁকে ত্রিভুবনেশ্বরী বলে সম্বোধন করছিলেন। এই ত্রিভুবন আসলে তিন প্রকার দুঃখ, যার ঈশ্বরী বা নাশিকাশক্তি হলেন দুর্গা। অজ্ঞাতবাস বড় কঠিন সময়। খাওয়াদাওয়ার অসুবিধার পাশাপাশি রয়েছে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। ধরা পড়ে গেলে আবার বারো বছর অজ্ঞাতবাস। তাছাড়া বনে জঙ্গলে দুর্গম জায়গায় নানা রকমের কষ্ট, কখনও কাঁটার আঘাত, আবার কখনও বিষধর সর্পের ভয় কিংবা বনের হিংস্র পশু ধেয়ে আসার ভীতি। শরীর এবং মনের কষ্ট তো আছেই। এক কথায় ত্রিবিধ দুঃখে পাণ্ডবরা বিধ্বস্ত। এমন সময়ে দেবী দুর্গা যিনি দুর্গতিনাশিনী বলে পরিচিত, তাঁকে ডাকা ছাড়া পথ নেই। যুধিষ্ঠির যখন দেবীবন্দনা করছিলেন, তখন তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হল, দেবী দুর্গা যশোদাগর্ভসম্ভূতা এবং নন্দগোপকূল-জাতা।

অত্যাচারী রাজা কংস একদিন দৈববাণী শুনতে পান, দেবকীর অষ্টম সন্তান তাঁকে হত্যা করবেন। তখন তিনি সাবধান হয়ে দেবকী ও তাঁর স্বামী বসুদেবকে কারাগারে বন্দি করেন। বন্দি অবস্থায় তাঁদের ছয়টি সন্তান হয়, প্রত্যেকটি শিশুকে কংস হত্যা করেন। সপ্তম সন্তান বলরাম দেবকীর গর্ভ থেকে প্রতিস্থাপিত হলেন রোহিণীদেবীর গর্ভে। রোহিণী বসুদেবের দ্বিতীয় স্ত্রী, তিনি থাকেন গোকুলে। ভাদ্রমাসের পূর্ণিমায় বলরামের আবির্ভাব। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণাষ্টমী তিথিতে, গভীর রাতে কৃষ্ণ নামক অষ্টম পুত্র জন্মলাভ করেন দেবকীর গর্ভে। পিতা বসুদেব সদ্যোজাত শিশু কৃষ্ণকে গোকুলে গোপরাজ নন্দের ঘরে গোপনে প্রেরণ করেন। সেই রাতে নন্দের স্ত্রী যশোদার কন্যা যোগমায়া জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আসলে দেবী মহাশক্তি। বসুদেব কৃষ্ণকে যশোদার ঘরে রেখে ওই সদ্যোজাত কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে মথুরায় প্রত্যাবর্তন করেন। যোগমায়া কংস কর্তৃক শিলাতলে বিনিক্ষিপ্তা হয়ে আকাশে অন্তর্হিতা হয়েছিলেন। এই দেবী দিব্যমাল্যবিভূষিতা, দিব্যাম্বরধরা ও খড়্গখেটকধারিণী। তাঁর বর্ণ বালার্কসদৃশ, তাঁর আনন পূর্ণচন্দ্রনিভ এবং তিনি চতুর্ভুজা ও চতুর্ব্বক্ত্রা। তিনি কৃষ্ণবর্ণা ও অষ্টভুজারূপেও পূজিতা। তাঁর ওই অষ্ট হস্তে থাকে বর, অভয়, পানপাত্র, পঙ্কজ, ঘন্টা, পাশ, ধনু ও মহাচক্র। তাঁর দিব্য কুণ্ডল, মাথায় উৎকৃষ্ট কেশবন্ধ এবং তার উপর দিব্য মুকুট। বেণী কটিসূত্র অবধি লম্বিত। দেবী মহিষাসুরমর্দ্দিনী এবং বিন্ধ্যবাসিনী। যুধিষ্ঠিরের স্তবে তুষ্টা দেবী দুর্গা তাঁকে নির্বিঘ্নে অজ্ঞাতবাসের বর দান করে অন্তর্হিতা হন। মহাভারতের বিরাটপর্বে আছে—দুর্গাত্তারয়সে দুর্গে তত্ত্বং দুর্গা স্মৃতা জনৈঃ (৬/২০)। সকল প্রকার দুর্গতি থেকে উদ্ধার করেন বলে উপাসকরা দেবীকে দুর্গা-নামে স্তুতি করে থাকেন।
কুরুক্ষেত্রে মহারণের শুরুতে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সখা অর্জুনকে বললেন, হে অর্জুন! তুমি দেবী দুর্গার স্তব করো। অর্জুন রথ থেকে নেমে পড়লেন। তার পর কৃতাঞ্জলি হয়ে দেবীর স্তুতিগান করলেন। সেই স্তুতিতে তৃতীয় পাণ্ডব বললেন, দেবী দুর্গা যোগীদের পরম সিদ্ধিদাত্রী, ব্রহ্মস্বরূপিণী, সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়ের হেতু, জরামৃত্যুরহিতা, ভদ্রকালী, বিজয়া, কল্যাণপ্রসূ, মুক্তিস্বরূপা, সাবিত্রী, কালরূপিণী, মোহিনী, কান্তিমতী, পরমা সম্পৎ, শ্রী, হ্রী ও জননী। এই স্তুতিতে যে সব শব্দ পাওয়া যাচ্ছে তার বেশির ভাগ শব্দ পরম ব্রহ্মের বাচক। জগতের আদি মহাশক্তি তিনি। অর্জুনের পূজায় প্রসন্না দেবী তাঁকে শত্রুজয়ের বর প্রদান করলেন। এই কাহিনী ভীষ্মপর্বে রয়েছে।
দেবী দুর্গা মহাদেবের পত্নী। অনুশাসনপর্বে উমামহেশ্বর-সংবাদে এই সিদ্ধান্ত রয়েছে—দেব্যা প্রণোদিতো দেবঃ কারুণ্যার্দ্রীকৃতেক্ষণঃ। শল্যপর্বে তিনিই শৈলপুত্রী—শৈলপুত্র্যা সহাসীনম্। হিমালয়ের কন্যারূপে দেহধারণ করেছিলেন বলে তিনি শৈলপুত্রী।
এই সব কথা পড়ে, বিশেষত দর্শন ও সংস্কৃতির নানা শাখা অবলোকন করে বোঝা যায়, দেবী দুর্গা একক কোনও শক্তি নন। তিনি এই জগতের নানা শক্তির সমাহার। তাই ভক্তরা তাঁকে শক্তির দেবী হিসাবে পূজা করেন। এই শক্তি শুভ। বৈদিক সাহিত্যেও দুর্গার নানা উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সেই সব তত্ত্বকথা আধিবিদ্যক। সাধারণ মানুষ সেই বৈদিক সাহিত্যের সহজ রূপ পুরাণে দেবীর সম্যক পরিচয় পেতে পারেন। দুর্গার সবিশেষ আলোচনা ও পূজাবিধি রয়েছে ভারতীয় তন্ত্র ও পুরাণে। যে সমস্ত পুরাণ ও উপপুরাণে শক্তির দেবী দুর্গা সম্পর্কে আলোচনা আছে, সেগুলি হল: মৎস্যপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, দেবীপুরাণ, কালিকাপুরাণ ও দেবী-ভাগবত। তিনি জয়দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, গন্ধেশ্বরী, বনদুর্গা, চণ্ডী, নারায়ণী প্রভৃতি নামে ও রূপে পূজিতা হন। তিনি যে একক শক্তি নন, সকলের মিলিত শক্তি তা পুরাণ পাঠ করলে বোঝা যায়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ কৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে। মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরকে নিবৃত্ত করার জন্য ব্রহ্মা দ্বিতীয় বার দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামক এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে মহাদেব সঙ্কটে পড়লে তৃতীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র যে পূজার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল চতুর্থ দুর্গাপূজা। তার পর থেকে নানা রকম যন্ত্রণা, সঙ্কট, দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন শক্তির আরাধনার প্রচলন হয়। এই শক্তির সম্মিলিত রূপই দেবী দুর্গা। মজার ব্যাপার, শক্তির এই রূপকে শিবের নারী-অংশ বলা হচ্ছে যার পূজা করছেন ব্রহ্মা ও বিষ্ণু। মহাদেবও সঙ্কটমোচনের জন্য তাঁর শরণ নেন। দেবীকে কেন্দ্র করে শৈব-বৈষ্ণবদের যেমন একটি সমন্বয় ঘটেছে, তেমনি ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরেরও এক ও অদ্বিতীয়া আরাধ্যা হয়ে উঠেছেন দুনিয়া জাহানের শক্তিরূপিনী নানা প্রকৃতি।
 
দুর্গাপূজা—কার্তিক ও অসুর
 
 
ভারতীয় পুরাণে মূল দেবতা তেত্রিশ জন বা তেত্রিশ কোটি—ত্রয়স্ত্রিংশত ইত্যেতে দেবাঃ। তাণ্ড্যব্রাহ্মণে ও বৃহদারণ্যক-উপনিষদে অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, প্রজাপতি এবং ইন্দ্র—এই তেত্রিশ জন দেবতা। মহাভারতে নীলকন্ঠের টীকাতেও তাই দেখা যায়। রামায়ণে ইন্দ্র ও প্রজাপতির জায়গায় অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে গ্রহণ করা হয়েছে। তেত্রিশ কোটি দেবতা, কোনও দেবী সেখানে নেই।
ভারতীয় শাস্ত্র বলে, মানুষ দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে চায়। মোক্ষলাভ তার অন্তিম পুরুষার্থ। এই জগতে রয়েছে ত্রিবিধ দুঃখ—আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক। এই দুঃখ-শোক থেকে মুক্তির জন্য তাই ইহলোকবাসী রামচন্দ্র দুর্গার উপাসনা করেন। সকল প্রকার দুর্গতি থেকে উদ্ধার করেন বলে উপাসকগণ ভগবতীকে দুর্গা-নামে উপাসনা করে থাকেন—দুর্গাত্তারয়সে দুর্গে তত্ত্বং দুর্গা স্মৃতা জনৈঃ। অপরাজেয় অসুর দুর্গকে নাশ করেছিলেন বলে দেবী হলেন দুর্গা।  কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শুরুতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দুর্গার স্তুতি করতে বলেন। সেই স্তুতিতে কীর্তিত বহু শব্দ পরম ব্রহ্মের বাচক।
বঙ্গদেশে যে দুর্গাপূজা হয় তার ক্যানভাস কিঞ্চিৎ অভিনব ও বিস্তৃত। সেখানে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করছেন। তাঁর পাশে রয়েছেন সিদ্ধিদাতা গণেশ, ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী, বাক্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতী যিনি দণ্ডনীতি বা পলিটিক্সের সৃষ্টি করেছিলেন—সসৃজে দণ্ডনীতিং সা ত্রিষু লোকেষু বিশ্রুতা। আর রয়েছেন কার্তিক। মাথার উপর বাবা মহাদেব। এক কোণে গণেশের কলাবউ—যদিও গণেশের দুই স্ত্রী ঋদ্ধি ও সিদ্ধি যাঁরা পূর্বে কুবেরের সহগামিনী ছিলেন। আর রয়েছে বাহন—সিংহ, মোষ, ইঁদুর, পেঁচা, হাঁস, ময়ূর।
গণেশ ছিলেন শূদ্রদের দেবতা, এমন আখ্যান পাওয়া যায়। এক বার শূদ্র ও নারীদের মিছিল দেখে ভয় পেয়েছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। তিনি দেবী দুর্গার শরণ নিলে বিঘ্নেশ্বর গণেশকে সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীকালে ভারতীয় পুরাণের বহু পথ পেরিয়ে সেই গণেশ হয়ে ওঠেন বিঘ্ননাশক। শাস্ত্রে তাই তিনি দ্বিদেহক, তিনি প্রণম্য। দেবতা ‘শ্রী’ হলেন সম্পদ, তিনি লক্ষ্মী—শুভ আদর্শ। সরস্বতী বিদ্যার দেবী। চার বিদ্যা—আন্বীক্ষিকী (যুক্তিশাস্ত্র), ত্রয়ী (তিন বেদ), বার্তা (অর্থবিদ্যা) ও দণ্ডনীতি (রাজনীতি)। তাঁর কাছেও প্রণত হন ভক্তকুল। মহাদেব বা শিব হলেন প্রযতি, তিনি জগতের হিত কামনা করেন। কিন্তু কার্তিক কে? তাঁকে কেন প্রণাম করতে গিয়ে হোঁচট খান ভক্তরা?
আসলে কার্তিক একটি প্রত্যয়। তাঁর পিতা কে, এ নিয়ে বহু ধন্দ আছে। কোথাও তিনি মহাদেবের পুত্র, তাই পার্বতীরও সন্তান। আবার কোথাও অগ্নির পুত্র, তাঁর নাম স্কন্দ। কখনও তাঁর মাতা গঙ্গা বা স্বাহা; কখনও হিমালয়, কাঞ্চনকুণ্ড কিংবা ছয় কৃত্তিকা। বেশ জটিল বিষয়।
ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ বলে, কার্তিক মহাদেবের তেজে গ্রহণ করেন। পার্বতীর সঙ্গে বিহারকালে মহাদেবের বীর্য পৃথিবীতে পতিত হয়। তিনি সেই তেজ ধারণ করতে না পেরে অগ্নিতে নিক্ষেপ করেন। অগ্নিও তা সহ্য করতে না পেরে তা গঙ্গায় ফেলে দেন। তার পর ভাসতে ভাসতে শরবনে কার্তিকের জন্ম। কৃত্তিকারা তাকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে নিজেদের স্তনদুগ্ধে লালন পালন করেন। সারস্বতোপাখ্যানেও এমন উল্লেখ আছে। তবে সেখানে শরবনে কার্তিকের জন্ম নয়। গঙ্গা মহাদেবের বীর্যের তেজ সহ্য করতে না পেরে তা হিমালয়ে পরিত্যাগ করেন, সেখানেই কার্তিকের জন্ম।
অগ্নি সপ্ত ঋষির পত্নীদের দেখে কামাতুর হয়ে পড়েন। দক্ষকন্যা স্বাহা অগ্নিকে কামনা করতেন। তিনি একে একে ঋষিপত্নীদের রূপ ধারণ করে অগ্নির সঙ্গে মিলিত হন। এক এক বার স্বাহা অগ্নির শুক্র নিয়ে কাঞ্চনকুণ্ডে নিক্ষেপ করেন। এই ভাবে ছ বার। স্বাহা বশিষ্ঠপত্নী অরুন্ধতীর রূপ ধারণ করতে সক্ষম হননি। এই সম্মিলিত শুক্র থেকে স্কন্দ অর্থাৎ কার্তিকেয়র জন্ম। তাঁর ছ খানা মাথা।
আবার আর একটি আখ্যান থেকে জানা যায়, কার্তিকের জন্ম তারকাসুরকে বধ করার নিমিত্ত। দেবতারা তারকাসুররের দাপটে ভয়ে কুঁকড়ে থাকতেন। তাই কার্তিকের আবির্ভাব। কার্তিক দুই অর্থে দেবসেনাপতি। তিনি দেবতাদের সেনাপতি আবার প্রজাপতির কন্যা দেবসেনার পতি। তারকাসুরকে বধ করার পর পার্বতী কার্তিককে বসুন্ধরা ভোগ করার আশীর্বাদ দেন। কার্তিক তখন দেবতাদের পত্নীদের সঙ্গে সঙ্গম করতে শুরু করেন। এতে করে দেবতারা ক্রুদ্ধ হয়ে দুর্গাকে নালিশ জানালে দেবী দুর্গা পুত্রকে নিরস্ত করেন। কার্তিক যে কোনও স্ত্রীলোকে উপগত হতে গেলেই সেই নারীতে দুর্গার প্রতিমূর্তি দেখেন এবং অজাচারের ভয়ে পালিয়ে আসেন। এই ভাবে কার্তিককে ব্রহ্মচারী বা কুমার বানিয়ে দেওয়া হয়। দক্ষিণ ভারতে কার্তিকের নাম মুরুগান, সেখানে তাঁর প্রেমিকা ও স্ত্রী হলেন বল্লী। সে আখ্যান ভিন্ন। শিবপুরাণে আছে, শিবের ঔরসে উমার গর্ভে কার্তিকের জন্ম, যেখান থেকে কালিদাস কুমারসম্ভব মহাকাব্য রচনা করেছিলেন।
মহাভারতে আছে, স্কন্দ বা কার্তিকেয় হলেন সহস্রশীর্ষ, অনন্তরূপ, ঋতস্য কর্তা ও সনাতনানামপি শাশ্বত—যে শব্দগুলি পরমব্রহ্মেরই বাচক। স্কন্দ শুধু তারকাসুরকে নয়, মহিষাসুরকেও বধ করেছিলেন।
অথচ আমরা দেবী দুর্গার পদতলে মহিষাসুরকে দেখি। কালিকাপুরাণে কাত্যায়ন মুনির শাপে নারী দুর্গার হাতে মহিষ নিহত হন। কার্তিক নয়, তাঁকে বধ করছেন দেবী দুর্গাই। এক্ষেত্রে মহাভারত নয়, কালিকাপুরাণকে মানেন আপামর বাঙালি। মণ্ডপে তাই মহিষাসুরকে দুর্গা বধ করছেন, এই চিত্রে দেখা যায়–পাশে মিটিমিটি হাসছেন মহাভারতে মহিষাসুরবধকারী কার্তিক। কে এই মহিষরূপী অসুর?
‘অসুর’ শব্দটি অত্যন্ত ভারি ও সমৃদ্ধ। সাধারণত সুরবিরোধী বা দেববিরোধীদের অসুর বলা হয়। দেবাসুরের যুদ্ধে দেখা যায়, অসুররা মৃতকে বাঁচিয়ে তুলতে পারতেন। তাঁদের সেই মন্ত্র শিখিয়েছিলেন দেবযানীর পিতা শুক্রাচার্য। দেবগুরু বৃহস্পতিপুত্র কচের সঙ্গে দেবযানীর বিবাহ হয় না, ক্ষত্রিয়রাজা যযাতি ব্রাহ্মণকন্যা দেবযানীর পাণিগ্রহণ করেন। দেবযানীর সঙ্গে যযাতির অনুগমন করেন অসুররাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠাও। শর্মিষ্ঠার সন্তান থেকে যাদব, পৌরব-কৌরবদের উৎপত্তি। অসুর মানেই খারাপ, এমন সাধারণীকরণ না করাই ভাল। ঋগ্বেদে ‘অসুর’ শব্দের অর্থ প্রাণবান, বলবান এবং ক্ষেপ্তা। জেন্দাবেস্তায় ‘অহুর’ হল The Life giver and the Omniscient, God। ঋগ্বেদও বলছেন, অসুরঃ সর্ব্বেষাং প্রাণদঃ (১.৩৫.৭)।
আমরা জানি, মহিষ হল পশু। কিন্তু মহিষের অন্তর্গত যে ধাতু ‘মহ্’, তার অর্থ হল পূজা। রম্ভ মহিষের পিতা। মহাভারতে আছে, অনুহ্রাদ বা অনুহ্লাদ হলেন মহিষের পিতা। অনুহ্রাদ হিরণ্যকশিপুর তৃতীয় পুত্র। দেবীভাগবত অনুযায়ী, মহাদেবের বরে রম্ভ নামক অসুরের এক ত্রিলোক-জয়ী পুত্র জন্মান। তিনিই দুর্দান্ত মহিষাসুর। দেবতাদের তাড়িয়ে স্বর্গ অধিকার করেন। তখন দেবতারা বিষ্ণুর শরণ নেন। বিষ্ণু জানান, এই দুর্দান্ত মহিষকে কোনও পুরুষ হত্যা করতে পারবেন না। দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে এক দেবীর উৎপত্তি হয়। সেই দেবীকে বিবাহ করার জন্য মহিষ দূত পাঠান। দূতকে তিরস্কার করে দেবী মহিষের বিরুদ্ধে অভিযান করেন এবং তাঁকে হত্যা করেন। কালিকাপুরাণে অবশ্য ভিন্ন কথা আছে। মহিষ দেবীর পূজা করতে আরম্ভ করেন। একদিন দেবী তাঁর কাছে আবির্ভুত হলে মহিষ বলেন, তিনি যেন সর্বযজ্ঞে পূজিত হন এবং দেবীর পদসেবা করার অধিকার পান। দেবী উত্তরে জানান, সমস্ত যজ্ঞভাগ দেবতাদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়েছে, আর কিছুই অবশিষ্ট পড়ে নেই; তবে তুমি আমার পদসেবায় নিযুক্ত থাকবে এবং যেখানে আমার পূজা হবে, সেখানে তুমিও পূজা পাবে।
ছান্দোগ্য উপনিষদে প্রজাপতি ও ইন্দ্রবিরোচন সংবাদে আছে, প্রজাপতির কাছে দেবগণের প্রতিনিধি হয়ে ইন্দ্র এবং অসুরদের হয়ে বিরোচন গেলেন আত্মা বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে। সমস্ত কিছু শুনে দুজনেই যখন প্রস্থান করছেন, প্রজাপতি মনে মনে বললেন, আত্মাকে উপলব্ধি না করেই দুজনে চলে গেল। এদের মধ্যে যে একেই উপনিষদ বা গুহ্যজ্ঞান বলে গ্রহণ করবে সে দেব হোক বা অসুর, বিনাশপ্রাপ্ত হবে। সেই বিরোচনের উত্তরসূরী হলেন মহিষাসুর আর দেবগণের সম্মিলিত তেজের নাম দুর্গা।
তাই দেবী দুর্গার পাশাপাশি অসুরও পূজা পান। কেউ কেউ বলেন, মহিষাসুর কোনও অশুভ শক্তি নন, তিনি পরাজিত মাত্র। বিপথগামী দেবতাদের শিক্ষা দিতেই নাকি ভক্ত ও নিষ্ঠাবান মহিষাসুরকে বেছে নিয়েছিলেন দেবী। তাই মহিষাসুর আজও জীবিত ও প্রাণবন্ত। দেবী দুর্গার পূজার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও স্মরণীয়, সহিষ্ণুতার দেশ বাংলা তথা ভারতে।