শাশ্বতী মজুমদার-এর গল্প

Spread This

শাশ্বতী মজুমদার

মারিজুয়ানা 
 
সমুদ্রের কিনারায় এক বাতাস থাকে। যে বাতাস বইয়ে নিয়ে যায়। জীবন এক বহতা নদী। একথায় আজ আর কোন চিঁড়ে ভেজে না। তবু সেই বহতা ধারায় ভুলতে নেই তুমি কে, তুমি কোথা থেকে এসেছিলে। লজ্জা পেতে নেই তোমার অতীত এবং বর্তমানকে নিয়ে। কিন্তু সন্তরণ বন্ধ করা চলবে না।
নদী ও সমুদ্র দুটোকেই সময়ে সময়ে খেয়াল করে সাফা করতে হয় দক্ষ কর্মীদের সাহায্য নিয়ে। না হলে সাঁতরানোর পরিধি ছোট হতে থাকে। তারপর একদিন এসব আদি অনাদির খেয়াল না করেই কিংবা অভ্যাসের ভুলে জলে নামে কেউ। ভারী হয়ে ওঠা জলে নিশ্বাসের বায়ু পায় না। তলিয়ে যায়। হারিয়ে যায়। যেমন করে জিয়া বা শ্রীদেবী হারিয়ে গেল অসময়ে।
নিজের সঙ্গে অসততা ভুল। জীবনটা হয়ত একটাই। ভাবা দরকার। কী করতে চাও এ জীবন নিয়ে। তার উত্তর খোঁজাটা একান্ত জরুরি। উত্তর না এলে সমুদ্র আছে। তার সামনে গিয়ে দাঁড়াও, উত্তর আসবে। নাও আসতে পারে। তখন ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’এর মতো পিছন ঘুরলেই জীবন তোমাকে ফ্রেমে বেঁধে নেবে আবারও খাপে খাপে।
যারা সমুদ্রের থেকে দূরের শহরে বড়ো হয় তাদের মন অনেক ছোট ঘটনায় বিচলিত হয়। সূক্ষ্ম বিচারের নামে সংসারের পাঁচপেঁচিতে জড়িয়ে যায়। তাদের নির্দিষ্ট সময়ের বিরতিতে উষ্ণ পানীয় পান করা দরকার। মন তাতে জল পায়। সে তাতে অজানার ঠিকানায় ঘুরে আসতে পারে।
সে নদীর কাছাকাছি সারাদিন থাকে। কিন্তু এও সত্যি সে কোনদিন নদী দেখেনি। কারণ তার গলায় একটা প্রতিষ্ঠানের কার্ড ঝোলে প্রায় ফিঙে ডাকা ভোর থেকে। হয়ত মনেও। তাই সে কখন নদীর ওপরের ব্রিজে স্কুটি থামিয়ে চা খেতে পারেনি, কিংবা বান্ধবীকে চুমু।  সে খুব ভোরে ফোনটা বাজলে ওঠে। না বাজলেও ওঠে। উঠে সারাদিনে অনেক কাজ করে। অন্তত তার তেমনটাই মনে হয়। কিন্তু সেই সরকারি ব্যাঙ্কের ম্যানেজারটির মতোই আজ পর্যন্ত কোন কাজ সে শেষ করে হাত ধুয়ে উঠতে পারেনি। ঐ বেচারা বানচোদ লোকটা যে কিনা অন্তত বারো-পনেরোটা ফাইল খুলে রেখে আর উনিশ থেকে তেইশ জন লোককে বসিয়ে রেখেও কারও কাজটাই পুরোটা শেষ করতে পারে না। তার কাচের ঘরটা থেকে বেরিয়ে ব্যাঙ্কের মধ্যে দাঁড়িয়ে অথবা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অনেকেই তাকে বোকা চুদিয়ে বলে থাকে। যাইহোক মোদ্দা কথা হল সে চুদতে না পারলেও সেও যে একটা বোকাচোদা সেটা অনেকেই বোঝে না। অনেকেই ভাবে সে দারুণ কাজের। কিন্তু সে কেবল জানে তার একটা কাজও তাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে না, কোন বছরেই না। তার মধ্যে আবার সমস্যা আছে বিস্তর। কে.সি.নাগের অঙ্ক পিছু ছাড়ে না এ বয়সে এসেও। ধুর বাল এসব সে আবার ভাবছে কেন! এখন তো লকডাউন। তেত্রিশটা তালা দেওয়া গুদামের মতো তার সারা অস্তিত্বে লকডাউন তালা ঝুলিয়েছে। জীবনের সব লুব্রিকেন্ট ঠিক কততম বয়সে ফুরায়? জানে না সে। কিন্তু তার ফুরিয়েছে। গুগল আর্থ খুললে জল সাঁতরে সমভূমি জাগে। সমভূমি রূপ নেয় মহাদেশে, মহাদেশ রূপ বদলে কমে আসে দেশ ও চেনা পাড়ায়। তারপর ঝপ করে থামে তাদের ফ্ল্যাটের ছাদে। সব খোঁজাখুঁজি শেষ। সাড়ে আটশো স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাট থেকে বাসি জীবনের গন্ধ ওঠে ওপরের দিকে। আরও বেশি ছড়াবার আগে, উপগ্রহ গন্ধবন্দি করার আগে সে নেট বন্ধ করে ফোনটা উল্টে রাখে সিস্টার্নটার ঢাকায়।
শাওয়ার চালিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। জল ক্রমাগত নামতে থাকে মাথা থেকে মুখে, ঠোঁট থেকে স্তনে। তার তখন মাসাবা গুপ্তার কথা মনে পড়ে যায়। তাকে নাকি আশৈশব অনেক খারাপ মন্তব্য শুনতে হয়েছে তার এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিনের শরীরী গঠনকে নিয়ে। আজও যখন সে নিজের নামে দুনিয়া জোড়া ফ্যাশনের এক সর্ব পরিচিত নাম তখনও শরীরী লাঞ্ছনা তাকে তাড়া করে ফেরে। মাসাবা গুপ্তাকে তার জানানোর কোনো ইচ্ছা নেই, তবু তার কথা মনে পড়লে সে বলে ‘তোমার শরীরের সব কটা খাঁজ আমার খুব পছন্দ মাসাবা’। কালো পাথরে খোদাই করা একটা শরীরকে সে কমলা রঙের বিকিনিতে ঢুকিয়ে ডান হাতটা মাথার পেছনে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এই শেষ বছরের শরতেই। মাসাবার প্রচুর পর্যাপ্ত স্তন আর কোমরের গঠনের কথা ভাবলেই তার শরীরে উত্তেজনা দৌড়াদৌড়ি করে। তারপরেই মনে পড়ে যায় নিজের শরীরটার কথা। তার বাথরুমে একটাও আয়না নেই। তবু যেখানে সেখানে যত্রতত্র বাড়তে থাকা শরীরটা সে নিজেই হাত বুলিয়ে অনুভব করতে পারে প্রবলভাবে। বেশি গুঁড়ো জিরে রান্নায় মিশলে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে যেমন রান্নাটা নষ্ট করে দেয়, এই ভুল জায়গায় মেদগুলোও তেমন। স্তন আর কোমর এলাহি ছড়ালেও মাসাবার কাটিংটা নকল করা  হয় না তার। বরং তার নিজেকে দক্ষিণী নরম পানুর নায়িকার মতো লাগে। যারা কিছুই না করে কেবল নিজের ঠোঁট বিভিন্ন ভঙ্গিতে কামড়ে আর পাড়া জাগানো আওয়াজ তুলে দর্শনার্থীদের ঝরিয়ে দিতে পারে। সে অবশ্য তাও পারছে না। তার যাবতীয় পিচ্ছিলতার অভাব ঘটেছে।
তার সঙ্গে উটকো ঝঞ্ঝাট বছরটাকে লুটে নেওয়া এই মারী। সত্যিই মেরে দিল মাইরি! তাকে, তার অস্তিত্বকে, তার বেঁচে থাকাটাকে এমন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, যা সে মোটেও চায়নি। তার লাইফ লঙ্গ হার্ডলের অভাব ছিল না…। আসলে সে কোন চ্যালেঞ্জেই এখন উত্তেজিত হয় না। কারণ সে মালাইকা অরোরা নয়। মালাইকা অরোরা তার ছেচল্লিশ বছর বয়স আর পঁয়ত্রিশ বছরের বয়ফ্রেন্ডের কারণে খুব খবরে থাকে। সে তার থেকে বয়সে ছোট ছেলেদের পছন্দ করে না। মনে হয় মায়ের পাশে ছোট্ট বাছুরটা দাঁড়িয়ে আছে। আর না হলে মনে হয় অন্য গ্রহ থেকে নেমেছে। বুড়োগুলোকে মনে হয় ঢ্যামনার বাচ্চা, বৌ দিচ্ছে না বলে রাতবিরেতে ছুঁক ছুঁক করছে।  সে লক্ষ্য করছে আজকাল তার আর কোন পুরুষ মানুষকেই ভালো লাগে না। হতে পারে সে আর পারবে না বলে। হতেই পারে…।
আসলে সে এখন কিছুই পারে না। যেমন সে কলেজে যেতে পারে না। ঘরে বসে সপ্তাহে তিনদিন দুটো করে ক্লাস নেয়, একটা নির্জীব আর একদল সজীব দেয়ালকে আগেপিছে বসিয়ে। মাঝেমাঝে বিরক্তিতে মনে হয় স্ক্রিন ফাটিয়ে হাতটা গলিয়ে ঠাটিয়ে একটা চড় মারে ছেলেমেয়েগুলোকে। কিন্তু এটাও সে পারে না। শুয়োরের বাচ্চাগুলো মাইনে দেবে না বলে চ্যাঁচাতে পারে মিডিয়া দেখলে, কিন্তু ক্লাসে অনলাইন হয়ে পাছা উল্টে ঘুমায়, একটা প্রশ্নেরও জবাব দেয় না। মনে হয় নিজেকে ওদের বাপের ভাড়া করা রাখেল। সকাল সকাল সেজেগুজে মুজরো করতে বসেছে সে। তার চেনা আড্ডাগুলোও সে মারতে পারে না। ওসব ফোনে চলে না। ওর জন্য স্টাফরুমের পরিবেশটা চাই। সেইসব গল্পেরা যা ছ’তলা বাড়িটার ৬/২২ নম্বর ঘরে বন্দী হয়ে ধুলো হয়ে গেল এতদিনে। মনে হয় সেসব গত জন্মের কথা। যাদের সঙ্গে সে এখন নিরাপদে থাকতে গৃহবন্দি তাদের সঙ্গে এসব চলে না। আড্ডা জমে না।  তারা জানেই না ল্যাকমি বা ম্যাকের এখন নতুন কী অফার চলছে, সে চোখে কী শ্যাডো ইদানীং লাগায়, চোখের কোলের আঁধার কী দিয়ে ঢাকাটা এখন ফ্যাশন। জানেই না ওয়েব সিরিজ দেখলে জানা যায় খুন করা, গালি দেওয়া এবং সেক্স করা কত সোজা। এরা জানেই না কোন শনিবারে কোন রেস্তোরাঁয় কী স্পেশাল মেনু হয়, কোথায় বুফে লাঞ্চে অফার থাকে। এদের একজন শেয়ার বাজারের বুল ফাইটে আর ছোট দুজন জাস্টিন বিবার আর হ্যারি পটারের ম্যাজিক বিশ্বে সারাদিন ডুবে থাকে। শুভঙ্করের মোবাইল বাজলে সে ভয় পায়, একরাশ বিরক্তি এসে গ্রাস করে। শুভঙ্করের সব কটা বাক্য বিরতি, বিরাম সহ রপ্ত হয়ে গেছে এতদিনে তার। একই কথা শুনতে শুনতে এই একশো সাতাশতম দিনে এসে তার কানের পর্দা বড়ো ক্লান্ত।
এদের তিনজনের কাছে ঘরে থাকাটা দারুণ প্যাশনের। তার কাছে বিরক্তির চূড়ান্ত। নাঃ, এরা চারজনেই এত আলাদা যে হয় না। একদমই হচ্ছে না। চলছে না। প্রতিস্থাপনের খেলায় সে সম্পূর্ণ শূন্য পেয়ে চলেছে রোজ রোজ, সপ্তাহে সপ্তাহে। রত্নাবলী রায় বা গোপাল দাস কারও পরামর্শই কাজে আসছে না। সে চেষ্টা কিন্তু কম করেনি। ছেলে দুটোর চুল কেটে ছবি তুলে ডি.পি বানিয়েছে, ডালগোনা কফি বানিয়ে ভালো দেখতে না হওয়ায় নেট থেকে ছবি নামিয়ে ফেসবুকের পাতায় ‘এখানে কিছু লিখুন’ পোস্ট নামিয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকরা হাঁটছে দেখে ‘দ্য মোজো’ একটা ফাটাফাটি পথ হাঁটল, সেও তাতে টপ ভুজঙ্গ হয়ে আবারও ‘এখানে কিছু লিখুন’-এ একপাতা লিখেছে। তাতে জনতা ক্ষেপেও গেছিল তার ওপর। চেনাচেনা ছোটবেলার বন্ধুরা বলল ‘ল্যাংড়া আম বাজারে উঠেছে তাই নিয়ে পোস্ট দে, এসব নিয়ে তুই ভাবছিস কেন?’ প্রথম প্রথম গ্যাস মুছতে, বাসন মাজতে, গাছের পরিচর্যা করতে, ব্যাগ নামিয়ে সব্জি কিনতে, ছাত্রছাত্রীদের জন্য মেটিরিয়াল বানাতে দিব্যি লাগছিল। এখন ঘুম থেকে উঠতেই সে একরাশ বিষণ্ণতায় ডুবে যায়। উফ্‌, সেই একই কাজ, একই তিনটে মুখের সারি, একই রুটিন, একই চুদুর বুদুর জীবন!
জীবন মানে জি-বাংলা নয়। জীবনটা ঝোল হয়ে গেছে তার। কবির থাপর বলেছিল জীবনটাকে ঝোল বানানো যাবে না। সেও চায়নি। কিন্তু দেশ বলেছে ঘরে থাকো, সুস্থ থাকো। অতএব তার সবদিক থেকেই  মারা গেছে। শাওয়ারটা বন্ধ করে সে। সাবানটা তুলে নেয়। সেটাও ছোট হয়ে গেছে। ছোট সাবানে সে স্নান করতে চায় না। কিন্তু শেয়ার বাজার আর কেন্দ্র রাজ্যে জোর বাওয়াল চলছে শুভঙ্করের ফোনাফুনিতে। আর বাকি দুজনের চলছে অনলাইনে ক্লাস। অতএব ছোট সাবানটাই গায়ে বোলায় সে। জ্বালাটা এখনও আছে। চেনা যাতায়াত অচেনা অজানা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। রাতে খেলা জমেনি কালও। সেই ছিল কারণ। জ্বালাটা কেবল রয়ে গেছে। বঙ্গ জীবনের অঙ্গ বোরোলীনও সঙ্গ দিচ্ছে না। পিচ্ছিলতা কততম বয়সে ফুরায়? উত্তর আসে না। সাবানটা হাত পিছলে নর্দমায় চলে যায়।
 
ঋণঃ হিন্দি সিনেমা, ইনস্টাগ্রাম, পেজ থ্রি জার্নাল