অমৃতপ হালদার-এর গদ্য

Spread This

অমৃতপ হালদার

একটি অঙ্ক ও জলছবি
একটা খোলা মাঠ। তারপাশ দিয়ে মধ্য কোলকাতার বাড়ি ডিঙানো গলি। অনেক বুড়ো, মাঝবয়েসি দোতলা, তিনতলাকে এক বারোতলা ঝকঝকে ফ্ল্যাটবাড়ি মুখ বেঁকিয়ে দেখে। ওরা খেলছিল। বলটা এসে ছিটকে পড়ে পায়ের সামনে।
– ‘কাকু বলটা একটু দিন না’
সম্বোধন শুনে চমকে উঠি। বলটা এক শটে ফিরিয়ে দিলাম মাঠে। বয়স হলেও মুন্সিয়ানা কমেনি। যা কিছু প্রাত্যহিক তা কোথাও না কোথাও পড়ে থাকে আমাদের মাঝে।
গলিটার মোড়ে ব্যস্ততার সাথে পায়চারি করছে এক যুবক। ভালো করে ঠাহর করলে বুঝতে পারলাম গেঞ্জি কারখানার বিলে। কারো জন্য অপেক্ষা করছে বোধহয়। জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে এলো এমন এক নাম যে অজানা কোন কারণে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছে জীবন থেকে। বারবার প্রশ্ন করতে চেয়েছি, করেওছি। যতটুকু যোগাযোগ ছিল ইমেলে। আস্তে আস্তে সব থেমে আসে। নেমে আসে শূন্যতা। একটা মেঘ অনেকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। হলুদ বাড়ির ছাদ আর রংচটা সিমেন্টের বাড়ি দুটোর মাঝে আটকে। সিনেমা হলে এতোক্ষণে ফ্ল্যাশব্যাকে সেই সব দৃশ্যগুলো দেখিয়ে নিতো। সেই কোচিংক্লাস, ফেরার রাস্তা, সরস্বতী পুজো আর দোলের বিকেলের দিনগুলো। বাস্তবে সে উপায় নেই। উপায় নেই ফিরিয়ে দেওয়ার অজুহাতের গল্পগুলোকে ছোঁয়ার। অচেনা মুঘল শিবিরের মতো বিয়ের বাসর। চারপাশের মানুষগুলোর মুখগুলো খুবই সন্দেহজনক। একা রানাপ্রতাপের মতো দূর থেকে সিঁদুরদান দেখে ফিরে আসা। বীর আর বীরগাথা। এসব কিছু দেখালো না। ফ্ল্যাশব্যাকে এও দেখালো না তারপরেও সম্পর্কের মুছে না যাওয়া। পরকীয়ার কোন চেষ্টা করা হয়নি। কারণ যেটা পড়েছিল সেটাই প্রেম। বারবার স্বাক্ষরে ভুল হয়ে যেতো কেন এমন হয়। বস্তু অধিকারের সংস্থান হয় কিছু বিবাহে। সেই ভদ্রলোকটির সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। তার জিনিস যদি তার মতো করে না চলে তবে তো সত্যিই বিপদ। বিছানায় অনেক হিসেব মেলানোর চেষ্টা করে কিছু বোকা। স্তনে মুখ দিয়ে অনেকটা মুখের ভেতর নেবার চেষ্টায় আর কোমরের ধাক্কার জোর বাড়ালে শরীরের পরিমিতি মেলে। অনুভবের সমাকলন আর অবকলনে খেই পাওয়া যায় না। শুধু এই একটা কারণে এতোকাল হেসে গেছি আঙুলের ডগায় চোখের জলটা মুক্তোর মতো রেখে। তারপর একদিন চলে গেলে। অপসৃয়মান। বছরে একটা ইমেল আসতো জন্মদিনে আর একটা উত্তর ফিরতো জন্মদিনে। অসংখ্য চিন্তাস্রোত কণাকারে দৃশ্য তৈরি করে। তীব্র হর্নের শব্দে তাকিয়ে দেখি গলি থেকে রাজপথের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছি। অশ্রাব্য গালি দিয়ে এক অবাঙালি বড়লোক পাশ কাটিয়ে নিয়ে যায় মার্সিডিজ গাড়ি।
পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি বিলে তখনও দাঁড়িয়ে। ওপারের ফুটপাথ থেকে রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের নায়ক। ফুটপাতে একটা ঝোপ। পাতার আড়ালে দেখতে থাকি। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সেই মানুষটা এলো। গভীর আলোচনা চলতে লাগলো বিলের সাথে। কিছুতেই বুঝতে পারিনা কি এই অসম্ভব অসম যোগাযোগ। আর বিদেশ থেকে ফিরলোই বা কবে। স্বামী,সন্তানই বা কোথায়। রাস্তা পেরিয়ে এলাম দ্রুত পায়ে। নাম ধরে ডাকলাম। চমকে উঠলে। সিনেমায় এরকম সময়ে বজ্রপাত হয়। এখন খটখটে রোদ। মুখের শ্রী নেই বল্লেই চলে, শরীরেও ভাঙন স্পষ্ট। প্রায় ছবছর পর দেখলাম। এড়িয়ে চলে যাবার প্রাণপণ প্রচেষ্টা করেছিলে। আরো চারপাঁচটা ছেলে চলে এলো কোথা থেকে। তারা সব বিলের ই বন্ধু। শক্তি প্রয়োগ করতে গেল। থামিয়ে দিলে তাদের। অবশেষে এতোগুলো দিন পর অন্তত পরিচয় স্বীকার করে নিলে। কথা বলতে বলতে রওনা দিয়েছিলাম সাথে।
বাসে ভিড় বেড়ে গেল। কত কথা হয়ে চলেছে। প্রচুর খিদে পেলে আর সামনে অনেক খাবার থাকলে ভালো করে খাওয়া যায় না। যতটুকু বুঝলাম এই বিলেদের মতো মানুষগুলোকে নিয়ে কিছু একটা বড় কাজ হচ্ছে কোথাও। সেখানেই যাওয়া হচ্ছে এখন। কিন্তু নিরাপদ ভবিষ্যতের লোভ দেখিয়েছিল যে ভদ্রলোক তিনি কই, সন্তানের খবরটাও জানতে হবে। বাস এসে থামে। বাস থেকে নামার সময় কি একটা কথা বলতে গিয়ে গালে ঠোঁট ছুঁয়ে গেলো। এ সাহস হয়নি কোনদিন। আজ যেন পূর্ণ করে যেতে চায় ঈশ্বর। কোন এক অজানা অচেনা স্টেশন। প্ল্যাটফর্ম থেকে ঝুঁকে ট্রেনের দুটো সমান্তরাল লাইন দেখা যায়। এরা কোনদিন মিশে যাবে না। তবু অনেক দূরে তাকালে মিশে গেছে মনে হয়। ভ্রম সৃষ্টি হয়। ভ্রম ভেঙে যাবার আগে অবধি মনে হয়।
– “আমারও একটা টিকিট কাটিস। আমি যাবো।”
– “আজ কিন্তু ফেরা হবে না। বাড়িতে চিন্তা করবে না? “
হ্যাঁ তা করবে। এই এতকাল ভেতরের মানুষটা সামলে রাখা শ্রেষ্ঠ বন্ধুটি, যাকে স্ত্রী বলি সেতো চিন্তা করবে। রোজ বাড়ি ফেরার সময়ের হিসেব নেওয়া সন্তান চিন্তা করবে। রাতে ঘুমোনোর আগে গল্প শোনে যে। অদ্ভুত টানাপোড়েনের মধ্যে ঠিক করি প্রশ্নগুলো করে নিই তবে। আজ ফিরে যেতে হবে। আবার একদিন আসবো নয় সবাইকে বলে সময় চেয়ে নিয়ে। দ্বিঘাত সমীকরণ তো এভাবেই মেলাতে হবে।
চুপ করে বসে আছি। ভোররাতে ঘুম ভেঙে গেছে। দৃশ্যগুলো ভেবে নিচ্ছি দ্রুত। ঘাড়ের কাছে গেঞ্জিটা ঘামে ভেজা। দুপাশে ঘুমন্ত স্ত্রী আর পুত্র। বাথরুম থেকে ফিরে এসে আরেকবার ঘুমোতে হবে। যদি এভাবেই অঙ্কগুলো মিলে যায় কখনো।