ধারাবাহিক উপন্যাস রামমোহন-সৌপ্তিক চক্রবর্তী

Spread This
Souptik Chakraborty

সৌপ্তিক চক্রবর্তী

রামমোহন
 
চার
 
রামমোহনের বাড়ির উল্টোদিকে সেনবাড়ি। পেল্লায় দোতলা বাড়িটা হলদে রঙের। সেনবাবুর জামাকাপড়ের ব্যবসা। বড় রাস্তার ওপারে সুপার মার্কেটে মস্ত দোকান। নাম অন্নপূর্ণা বস্ত্রালয়। সেনবাবুর এক ছেলে, এক মেয়ে। নান্টু-দা আর পারুল। সেনবাবুকে বড়লোকই বলা চলে। পাড়ার পুজোয় মোটা টাকা চাঁদা দেন।
রামমোহনের দোকান থেকে সেনবাড়ির মস্ত লোহার গেট আর গাড়িবারান্দাটা দেখা যায়। প্রতিদিনের মতো সকালে রামমোহন দোকান খুলে বসেছিল। দেখল একটা লাল হন্ডা গাড়ি এসে সেনবাড়ির গেটে দাঁড়াল। দুবার হর্ন দিতেই পুরোনো কাজের লোক নিত্যদা বেরিয়ে এসে গেট খুলে দিল। গাড়ি ভেতরে ঢুকে গাড়িবারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। পারুল তার ছেলেকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতর চলে গেল। পারুল প্রায়ই বাপের বাড়ি আসে। সেনবাবু নিজে দেখেশুনে বেশ বড় ঘরেই তার বিয়ে দিয়েছেন।
রামমোহন দোকানের বাইরে এসে একটা বিড়ি ধরাল। হন্ডা গাড়িটার দিকে তাকিয়ে বিড়িটা টানতে টানতে কেমন আনমনা হয়ে পড়ল।
ছোটবেলায় রামমোহন পারুলকে ভালোবাসত। তবে বলতে পারত না। এই নিয়ে বন্ধুবান্ধবের অনেক টিটকিরি তাকে হজম করতে হত। কি আর করবে। সে বরাবরই একটু মুখচোরা। একদিন সব্যদার বাড়ির একতলার ঘরে বসে এরকমই টিটকিরি শুনতে শুনতে সে ক্যারম খেলছিল। হঠাৎই সব্যদা বলে ওঠে: ‘আচ্ছা, তুই মুখে বলতে পারিস না তা না হয় হল। কিন্তু চিঠি লিখে তো জানাতে পারিস। আইডিয়াটা তার  বেশ মনে ধরে। সে তখন ইলেভেনে পড়ে আর পারুল এইটে।
এর কিছুদিন পরই ছিল সরস্বতী পুজো। রামমোহন ঠিক করে ওইদিনই সে চিঠি দেবে পারুলকে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। তিন-চার বার লিখে ও ছিঁড়ে ফেলে শেষমেশ একটা সাত আট লাইনের চিঠি লিখে ফেলে। দুপুরবেলা বাড়িতে পুজোর ভোগ খেয়ে নতুন কেনা গাঢ় নীল পাঞ্জাবির পকেটে চিঠিটা পুরে বেরিয়ে পড়ে। সোজা চলে যায় গার্লস হাইস্কুলের সামনে। এই স্কুলেই পারুল পড়ে। রামমোহন বাড়ি থেকে দেখেওছে পারুলকে স্কুলে যেতে।  বাসন্তী রঙের শাড়িতে পারুলকে দেখে আজ তার  যেন চোখই সরছিল না।

রামমোহন দুরুদুরু বুকে পায়চারি করতে থাকে স্কুলের সামনে। দুপুর বলে লোকজন কম। ভালোই হয়েছে। একটু পর নিশ্চয়ই পারুল পুজোর ভোগ খেয়ে বাড়ি ফিরবে। সেই সুযোগটাই নিতে হবে তাকে। কিছুক্ষণ পায়চারি করে রামমোহন স্কুলের উল্টোদিকে ল্যাম্পপোস্টটার নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। উফ! সময় যেন কাটছেই না। সে ঘন ঘন আঙুল মটকাতে থাকে। চিঠিটা ঠিক মতো দিয়ে উঠতে পারবে তো? পারুল চিঠিটা নেবে তো? পড়বে তো? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে থাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আপনা থেকেই পকেটে হাত চলে যায়। না, চিঠিটা ঠিকই আছে।

রামমোহনকে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। দুই সহপাঠী সহ হাসির ফোয়ারা তুলে পারুল বেরিয়ে এল স্কুল থেকে।
-পারুল, একটু শুনবে? রামমোহন ডাকে। দূর থেকে মোটর বাইকের ভটভট শব্দ শোনা যায়।
– কি মোহনদা? পারুল এগিয়ে আসে। তার সহপাঠীরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে, খিলখিল করে হাসে, আড়চোখে তাদের দিকে দেখে।
-এইটা তোমায় দিতে… মানে। নার্ভাসভাবে রামমোহন চিঠিটা বার করে পারুলের দিকে এগিয়ে দেয়।
– কি এটা? পারুল চোখ সরু করে মিটিমিটি হাসি নিয়ে প্রশ্ন করে।
রামমোহনের আর উত্তর দেওয়া হয় না। সশব্দে একটা মোটরবাইক এসে তার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়।
– এই তুই কি বলছিলি রে আমার বোনকে? দেখি, এটা কি? বলেই নান্টুদা ছোঁ মেরে তার  হাত থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নেয়। রামমোহন লুকোতে গিয়েও পারে না। ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে। চিঠিটা খুলে চোখ বুলিয়েই ‘এইসব বাঁদরামি করছিস বলেই নান্টুদা ঠাস করে তার  গালে এক চড় কষায়।
পথচলতি দু-একজন ‘কি হয়েছে রে? বলে এগিয়ে আসে। নান্টুদা তাদের চিঠিটা দেখায়। একজন ফিচেল হাসি হাসে। নগেন কাকা বলেন ‘ বাঁদর হয়ে গেছে ছেলেটা। বলব তোর বাবাকে? রামমোহন লজ্জায় যেন মাটিতে মিশে যায়। চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। নান্টুদা ততক্ষণে মোটরবাইক স্ট্যান্ড করে নেমে পড়েছে। হয়তো তাকে আরো দু-ঘা দিত। এমন সময় হঠাৎই সব্যদা কোত্থেকে চলে আসে। কি হয়েছে শুনে ‘ও আর এইসব করবে না বলে নান্টুদাকে আশ্বস্ত করে রামমোহনকে টেনে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
সেদিন বাড়ি ফিরে রামমোহন নিজের ঘরে গুম হয়ে বসে থাকে বাকি দিনটা। রাতে কিছু খায়ও না। লজ্জায় দুঃখে সে চুপ মেরে গিয়েছিল। রাতের দিকে তার  খুব কান্না পায়। সে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। তারপর চোখ মুছতে মুছতে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে যে সে আর কখনো কাউকে কোনো চিঠি লিখবে না।
এরপর থেকে রাস্তায় মুখোমুখি হলে সে চোখ নামিয়ে নিত।
এই ঘটনার অনেকদিন পর যখন পারুলের বিয়ে হয় তখন সেনবাবু তাকে আর তার মাকে নেমন্তন্ন করেছিলেন। রামমোহন যায়নি। তার মা নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করে মিষ্টি খেয়ে এসেছিলেন। পরে গগাইদের মুখে শুনেছিল ক্যাটারিং নাকি দারুণ হয়েছিল। গলদা চিংড়ি খাইয়েছিল।
কলেজে বিদিশাকে ভালো লাগলেও সেকথা রামমোহন তাকে জানায়নি। পরের দিকে বিদিশা কেমিস্ট্রির নির্বাণের সাথে প্রেম করত।
বিড়িটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফেলে দিয়ে পা দিয়ে ঘষে নিভিয়ে রামমোহন দোকানের ভেতর ঢুকে পড়ল।
পাঁচ
সকালবেলা দোকানে বসে রামমোহন তার ছোট্ট নোটবুকটায় মাস খরচের হিসেব লিখছিল। তিন-চারমাস অন্তর একবার করে হিসেবটা করে রাখে।
                                                   মাসিক খরচ
দৈনিক হাত খরচ- ৩৩।- x ৩০=           ১০০০।-
সাপ্তাহিক খরচ-
                        মদ= ৪০০ x ৪=          ১৬০০।-
                        মাংস= ১০০ x ৪=         ৪০০।-
                        মাছ= ১৫০ x ৪=          ৬০০।-
                        ডিম= ৭০ x ৪=           ২৮০।-
                        সব্জি= ৭০x৪=             ২৮০।-
মাসকাবারি খরচ-
                        ভোলামুদি=        ১৫০০।- ১৬০০।-
                        ফুল্লরাদি=                         ৮০০।-
                        মোবাইল বিল=                  ৪০০।-
                         বর্তমান পত্রিকা=               ৩২।-
                         সেলুন=                            ১০০।-
                        ইলেকট্রিক বিল=
                         অন্যান্য=
হিসেবটা শেষ করা হল না। ‘মোহন, এটা একটু জেরক্স করে দে তো শুনে তাকিয়ে দেখল মিন্টুদার বাবা। হাতে নাতনির আধার কার্ড। এই কবছরে ভদ্রলোকের চেহারাটা যেন একদম দুরমুশ হয়ে গেছে। কার্ডটা নিয়ে রামমোহন মেশিনের দিকে চলে যায়।
রামমোহনের বাড়ির দুটো বাড়ির পরেই মিন্টুদার বাড়ি। বছর ছয়-সাত আগে মিন্টুদা সুইসাইড করে। সন্ধে নাগাদ মিন্টুদার মায়ের ‘ওরে, কি হল রে? বলে বিকট চিৎকার শুনে রামমোহন হুড়মুড়িয়ে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আশেপাশের লোকজন দুড়দাড় করে মিন্টুদার বাড়ি ঢুকে পড়ে। রামমোহন শুনতে পায় ভেতর থেকে কে যেন চিৎকার করে বলে ওঠে ‘বিষ খেয়েছে। শিগগির অ্যাম্বুলেন্স ডাক।‘ অ্যাম্বুলেন্সে করে হসপিটাল নিয়ে যেতে যেতেই সব শেষ।
মিন্টুদা চিটফান্ডের কারবার করত। রামমোহনকে কয়েকবার বলেওছিল ইনভেস্ট করতে। রামমোহন রাজি হয়নি। এসব বিষয় সে বিশেষ বোঝে না। তাছাড়া কোনো শর্টকার্ট বা ফাটকাতে সে বিশ্বাসও করে না।
পাড়ায় স্টেটব্যাংকের ব্রাঞ্চ আছে। সেখানে রামমোহনের অ্যাকাউন্ট। বাবা- মার  সূত্রে পাওয়া টাকা সে ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট করে দিয়েছে। ক্রেডিট কার্ড তার  নেই। আজকাল অনেকে সঙ্গে ক্যাশ রাখে না তাই লাট্টু-দা তার অ্যাকাউন্টটা পেটিএমে লিংক করে দিয়েছে। সে নিজে পেটিএম থেকে কাউকে পেমেন্ট করে না। শুধুমাত্র কাস্টমারের সুবিধা ভেবেই করা। অনেকেই পেটিএমে পে করে তাকে।
জেরক্স করিয়ে নিয়ে মিন্টুদার বাবা চলে গেলেন। রামমোহন ইচ্ছে করেই তাঁকে আর  ‘কেমন আছেন? জিজ্ঞেস করল না।
ছয়
স্ক্যানিং-এর কাজটা শেষ করতে না করতেই রামমোহনের মোবাইল বেজে ওঠে। মামার ফোন। বাবা! মামা হঠাৎ এতদিন পর সকাল সকাল ফোন করল। কি ব্যাপার। কারোর শরীর টরীর খারাপ হল না তো। এইসব ভাবতে ভাবতে অরিজিনালটা কাস্টমারকে ফেরত দিয়ে টাকাটা নিতে নিতেই রামমোহন ফোন ধরল। ‘হ্যালো, মামা, বল। ওপাশ থেকে মামা বলে, ‘ শোন, পল্টুর বিয়ে, আগামী বৃহস্পতিবার রিসেপশন, চলে আসিস। কার্ড পাঠাচ্ছি হোয়াটসঅ্যাপে। ‘বাহ খুব ভালো খবর। নিশ্চয়ই যাব। বলে ওঠে রামমোহন। ‘রাখলাম বলে মামা ফোন কেটে দেয়। হোয়াটসঅ্যাপে ইংলিশে লেখা ‘শতদ্রু ওয়েডস প্রিয়াঙ্কা ই- কার্ড চলে এল কিছুক্ষণেই।
পল্টু রামমোহনের মামাতো ভাই। বিদেশে থাকে। ইঞ্জিনিয়ার। রামমোহন প্রথমে ভাবল ধুর! সে যাবে না। মামাদের সব বড়-বড় ব্যাপার। সে তো নিতান্তই ছাপোষা। কিছু একটা বলে দেবে বানিয়ে। তারপর ভাবল না, না যাওয়াটা খারাপ দেখায়। একটুক্ষণ থেকেই চলে আসবে না হয়।
নেমন্তন্ন করেছে মানে কিছু না কিছু তো গিফট নিয়ে যেতে হবে। এই ভেবে রামমোহন সুপার মার্কেটের মোমেন্টস গিফট হাউজ থেকে সাড়ে চারশো টাকা দিয়ে কিনে ফেলল একটা ফটোফ্রেম। রঙিন মার্বেলপেপারে প্যাক করে সোনালি ফিতে বেঁধে স্টিকার মারল তাতে। তার ওপর গোটা গোটা হরফে লিখল: শুভেচ্ছায়, মোহনদা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে দোকান বন্ধ করে রামমোহন যায় লোকনাথ সেলুনে। বিয়েবাড়ি বলে কথা চুলটা ছাঁটিয়ে যাওয়াই ভালো। কার্তিক তাকে দেখে বলে ‘কি ব্যাপার? এমাসে আবার এলে? ‘এই একটা বিয়েবাড়ি আছে রে। রামমোহন বলে। বিয়েবাড়ি শুনে কার্তিক চুল ছাঁটার পাশাপাশি তার  দাড়ি-গোঁফও ট্রিম করে দেয়। বাড়ি ফিরে স্নান-খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিয়ে যথারীতি রামমোহন বিকেলে দোকান খোলে। সাতটার একটু আগে দোকান বন্ধ করে সে গুনগুন করতে করতে পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া বুরুশ দিয়ে ঘষে ঘষে কিটোটা পরিষ্কার করতে থাকে। অনেকদিন পর কোনো বিয়েবাড়িতে যাবে এটা ভেবে বেশ খুশি খুশি লাগে তার। লাস্ট সেই বুল্টাইয়ের বোন টুসির বিয়েতে গিয়েছিল। বছর তিনেক আগে। সব্যদা ক্যাটারিং করেছিল।
ইস্তিরি করে তুলে রাখা দুটো পাঞ্জাবির মধ্যে থেকে সবুজটা পরে গিফটপ্যাক সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তায় প্রবল জ্যাম। কি এক মিছিল বেরিয়েছে। রামমোহন বাসে বসে ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে যায়। অবশেষে পঁয়ত্রিশ মিনিটের রাস্তা প্রায় দেড়ঘন্টা কাবার করে বাস তাকে নামিয়ে দেয়।
বিয়েবাড়ির এলাহি জাঁকজমক দেখে রামমোহনের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। চারিদিকে লোকজন সব জমকালো পোশাকে সেজেগুজে হাতে কোল্ডড্রিংকস কিংবা কফির কাপ নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। সেখানে সে নিতান্তই সাদামাটা। একরঙা পাঞ্জাবি, সস্তা জিন্স আর পুরনো কিটোয় বড়োই বেমানান। মস্ত লনের দুধারে সাজানো নানান লোভনীয় সব পদ। ম ম করছে জিভে জল আনা গন্ধ। উর্দি পরা ওয়েটাররা ট্রেতে করে স্ন্যাক্স আর ড্রিংকস নিয়ে ঘুরে ঘুরে সার্ভ করছে। একজন এসে তার  সামনেও দাঁড়ায় মাংসের কাবাব নিয়ে। রামমোহন কাঠিতে গেঁথে একটা মুখে দেয়। আঃ জবাব নেই। বাটারের টুকরো যেন। জিভে ফেলতেই গলে গেল। সে ভাবে আগে দেখাটা সেরে নিয়ে গিফটটা দিয়ে আরো কয়েক পিস খাবে এই কাবাব।

লনের একদম পেছন দিকে এক বিশাল ডায়াসের ওপর নবদম্পতির সিংহাসন। রামমোহন পাশ কাটিয়ে সেদিকে এগোয়। ডায়াসের কাছাকাছি গিয়ে মামাকে দেখে। মামাও দেখেছে তাকে। ‘এসেছিস? আয়, আয় বলে ডায়াসে নিয়ে উঠে পল্টুর কাছে গিয়ে বলে ‘এই দ্যাখ মোহনদা এসেছে। পল্টু দামি ব্লেজার পরে সেজেগুজে নতুন বউকে পাশে নিয়ে বন্ধুদের সাথে গ্রুফি তোলায় ব্যস্ত।  বাবার কথায় একবার হালকা রামমোহনকে দেখে নিয়ে আলগা হেসে ‘ভালো তো বলে আবার ছবি তোলায় মেতে যায়। এদিকে ‘ও জগুদা, একটু শুনুন তো বলে কে যেন একটা তার  মামাকেও ডেকে নিয়ে চলে যায়। রামমোহন বেশ অপ্রস্তুত বোধ করে। তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই পল্টুরা দাঁত কেলিয়ে দামি মোবাইলে ছবি তুলতে থাকে। আর সেগুলোই ‘দেখি দেখি করে দেখতে দেখতে নিজেদের মধ্যে খিল্লি করতে থাকে। রামমোহন বেশ অপমানিত বোধ করে। নতুন বউয়ের সাথে তাকে পরিচয় করানোর প্রয়োজনই বোধ করে না পল্টু! সে কি এতটাই ফ্যালনা নাকি। এর মধ্যে স্যুট-টাই পরা একজন হোমরা চোমরা গোছের লোক ডায়াসের দিকে এগিয়ে আসে আর তাকে দেখেই পল্টু ছবি তোলা ছেড়ে ‘এসো এসো, রবিদা বলে বিগলিত হয়ে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। এই ফাঁকে রামমোহন খুব চেষ্টা করে একটু হাসি ফুটিয়ে নতুন বউয়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে ‘আমি পল্টুর পিসতুতো দাদা বলে গিফটের প্যাকেটটা হাতে গুঁজে দিয়ে নেমে আসে ডায়াস থেকে। গটমট করে গেটের দিকে এগোয়। উর্দিপরা ওয়েটার আবার আসে কাবাবের ট্রে নিয়ে। মুখোমুখি পড়ে গেলেও রামমোহন কাবাব নেয় না। পাশ কাটিয়ে সোজা গেটের বাইরে বেরিয়ে আসে।

বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একটা বাস পায়। বাসের পেছনের সিটে বসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার প্রথমে খুব দুঃখ হয়। এতটা অপমানিত হবে ভাবলে সে আসতই না। বেকার চুল-দাড়ি ছাঁটানো হল। কাচা পাঞ্জাবিটা বের করে পরা হল। এতটা রাস্তা আসা হল। বাড়িতে রান্নাও নেই কিছু। তারপর তার দুঃখটা বদলে গেল রাগে। পল্টুটা মানুষকে সামান্য সম্মানটুকু দিতে জানে না। হতে পারে সে বড়লোক। বিদেশে থাকে। না হয় রামমোহন তেমন কেউ নয়। কিন্তু সে তো অপোগণ্ডও নয়। বরং নিজের সামান্য ক্ষমতায় যেটুকু পারে সেটুকু করে সৎভাবে রোজগার করে। শুধু হ্যাংলার মত গিলতেও সে যায়নি। মামা নেমন্তন্ন করেছিল তাই সৌজন্য রাখতেই গিয়েছিল। অসভ্য কোথাকার! মনে মনে রামমোহন এইসব বলতে থাকে।

বনহুগলি বনহুগলি বলে কন্ডাক্টর চেঁচিয়ে ওঠে। রামমোহনের চটকা ভাঙে। একটু পরই নামতে হবে তাকে।
বাড়ি ফিরে রামমোহন একটু চালে-ডালে বসিয়ে দেয়। গান চালিয়ে চুপচাপ রাম খায়- বিড়ি টানে তারপর খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ে। রাগ আর দুঃখ দুই মিলে মনটা খুব ভারী হয়েছিল তার।
সেরাতে রামমোহন স্বপ্ন দেখে। দেখে এক মস্ত বড় জামাকাপড়ের দোকানে ঢুকে পড়েছে সে। চারিদিকে ব্র্যান্ডেড দামি দামি সব জামাকাপড় সাজানো। একদিকে হ্যাঙারে ঝুলছে নানান রঙের-মাপের-বাহারের সব ব্লেজার। সে সেদিকে এগিয়ে যায়। সুবেশ সেলস বয় এসে দাঁড়ায় তার সামনে। মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে, ‘ব্লেজার দেখবেন স্যার? রামমোহন গম্ভীর ভাবে হ্যাঁ বলে। তারপর একটার পর একটা ব্লেজার পরে ট্রায়াল দিতে থাকে। কিন্তু কি আশ্চর্য! কোনওটাই তার গায়ে ফিট করে না। শেষমেশ কাঁচুমাচু মুখে রামমোহন বেরিয়ে আসে দোকান থেকে। দোকানের বাইরে রাস্তায় পা দিতেই হুশ করে একটা লাল হন্ডা গাড়ি তার সামনে দিয়ে চলে যায়। আর রাস্তায় জমে থাকা কাদাজল ছিটকে এসে তার টি শার্ট-জিন্স ভিজিয়ে দেয়। রাগে দুঃখে সে কি করবে ভেবে পায় না। হাত দুটো মুঠো করে ফ্যালফ্যাল করে শুধু এদিক ওদিক তাকাতে থাকে।