শুভশ্রী পাল-এর গদ্য

Spread This

শুভশ্রী পাল

অ্যাসাইলাম থেকে বলছি: ১
দুপুরের খাওয়া সেরে ছাদের কাপড় তুলতে আসার অলস সময়ে ঘুঘুর ডাক ঝিম ধরায়। ছুটির দিনের এইসব সময় মারাত্মক ঘোর এঁকে দেয় মনে। ঘুমের ভিতর জেগে ওঠা সত্তারা জেগে থাকা চোখে ঘুম এঁকে দেয় অলৌকিক তুলির টানে।
সাদা রঙের ফুল আঁকা নীল জমিনের ছাপা শাড়ি আঁচল অভ্যস্ত রাঁধুনির হাতমোছা হয়ে হলুদ ছোপ পেয়ে আধভেজা সুখ পায়। দুটো ওভেনে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে জ্বলতে গিলে ফেলে আমার সুখের সংসার৷ ভাতের ফ্যান উপচে উঠলে ঢাকা ফেলে দিই হাঁড়ির৷ আরেক দিকে কড়াইতে মাংস কষার গন্ধে চারিদিক মেতে উঠলে মৃত প্রেমিক আব্দারী মুখে বাটি হাতে এসে দাঁড়ায় নুন-ঝাল-মিষ্টির তদারকি করতে। খানিক আগে সে এসে দাঁড়িয়েছিল আমার পিছনে। যখন আমি শিল-নোড়ায় মশলা বাটছিলাম। মশলা বাটার সময়ে আমার দু হাতে দু গাছা চুড়ি রিনঝিন আওয়াজ তুলে অ্যায়লান করছিল সাংসারিক সমৃদ্ধির কথা। এসব দৃশ্যে সন্তানসুলভ প্রেমিক ধ্রুবক হলেও, স্নানঘামে ভেজা মুখে লেপ্টে থাকা চুল সরিয়ে দেনেওয়ালা কুছ পল কা মেহমান জাতীয় চরিত্রের স্লাইড শো অব্যাহত। কখনও কফির চুমুকের কাল্পনিক সঙ্গী, কখনও বা ‘ভাল্লাগছে না’ বাণীর মনোটোনাস সুরের গানের শ্রোতার মুখ ভেসে আসে দৃশ্যে। এইসব সিনে থ্রি ডি ইমেজ ঠিকঠাক ভাবে ফুটে ওঠার আগেই মিলিয়ে যায় নেটওয়ার্কের অস্থিরতায়।
রান্না শেষে সব নিকানো হয়ে গেলে স্নানে যাই, শাওয়ার খুলে গেলে দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে না-বলা আপাত ভালোলাগা মুখেরা। রুপোলি নায়িকাদের থেকে শেখা ছলা-কলার অনভ্যস্ত প্র‍্যাক্টিস চলে তখন। জল ছাড়া আর কীই বা আছে এসব দৃশ্য ধুয়ে দেওয়ার মতো। সব ধুয়ে যায়। ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেলে বড় শান্ত হয়ে আসে মন-শরীর। অতঃপর বালিশ জাপ্টে তলিয়ে যাই জলের নিচে। প্রতিবার শ্বাসরুদ্ধকর সিনে ঘুম ভেঙে যায়। আবার… পরের দৃশ্যে আসে ওয়ান সিন স্ট্যান্ডের চরিত্ররা। অথচ, আমার এবারে তলিয়ে যাওয়ার কথা ছিল গঙ্গার বুকে। জন্ম-মৃত্যুর মাঝে যে টানেল সেখানে চিঠি রেখে গেছে মৃত প্রেমিক অথবা মৃত প্রিয় বন্ধু। যেসব কথা বলে ওঠা হয়নি কনশাস মাইন্ডের চোখ রাঙানিতে সেইসব কিছু বলে ফেলার জন্য আমার টানেলে প্রবেশ ম্যান্ডেটরি। টানেলের মুখ থেকে প্রতিবার ফিরে এলে বড় ক্লান্ত লাগে। ভয় হয় ডাকবাক্স হারিয়ে ফেলার। যে বন্ধু জীবৎকালে প্রতি স্বপ্নে এসে চুল ধরে টানত, অপার শান্তি খুঁজে পাওয়ার আগের ভোররাতে সে এসেছিল চুলে বিলি কেটে ঘুম পাড়াতে। বাকি কথা চিঠিতে বলার ইঙ্গিত।
অথচ আমি এখনও ঘুমের মধ্যে জলের নিচে তলিয়ে যেতে পারছি না। একটা আস্ত সত্যি সংসার আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকলেও আমি পাখির ডাকের নেশায় তলিয়ে যাচ্ছি এপারের সংসার নামক হ্যালুসিনেশনে…
অ্যাসাইলাম থেকে বলছি: ২
গত কয়েকদিন ঘুমের ভিতর জেগে ওঠা হয়নি। জেগে ওঠার জন্য যে ঘুম প্রয়োজন ছিল তা জুটিয়ে উঠতে পারিনি। প্রবল অস্থিরতায় এই ছটফটানি যেন শত্রুরও না হয়। ডাক্তার ডিপ্রেশনের ওষুধ সাজেস্ট করায় অবাক হয়েছিলাম। অস্থির মাথা বলেছিল, ডাক্তার কিচ্ছু জানে না। এ তো ডিপ্রেশন নয়। তবুও তার কথায় ওষুধ খেয়েছিলাম লক্ষ্মীছানা হয়ে। একটানা ষোলো ঘন্টা ঘুমের পর জেগে উঠে দেখলাম মনের ভিতরের পৃথিবীটা যেন বদলে গেছে। মনের কোণে যেদিন ওপেক ষ্ট্রোকের ধূসর মেঘ আঁকা থাকে, আমি আঁকুপাঁকু করে একটা হাত খুঁজে চলি। যার আঙুলের তুলি আমার ধূসর মেঘের গায়ে রামধনু এঁকে দেবে। অকারণ অভিমানের সাথে অভিযোগ গুণ করে ফেলি অজান্তেই। এই গুণফলের বোঝা এতই প্রবল যে বন্ধু নামের কাচের দেওয়াল ভেঙে ফেলে সশব্দে। সবাইকে নিরাপদ দূরত্বে পাঠিয়ে আমি ভাঙা টুকরো জড়ো করতে বসি। কড়া পড়ে যাওয়া হাতে কিছু না হলেও টমেটোর মতো মন চিরে বেরিয়ে আসা কান্না। এসব কান্নার ভৌতগঠন বড়ই অদ্ভুত। সামান্যতম জলও চলকে পড়ে না আইল্যাশ বেয়ে। গলার কাছে তারা নানা শেপের ক্রিস্টাল সাজায় শুধু। মনে পড়ে আমার সব লণ্ডভণ্ড করে ফেলা ভালোবাসা দেখে মৃত প্রেমিক বলেছিল, “তুই ফুল ম্যাড।” খানিক পজ দিয়ে বলেছিল “ভালোবাসায় যতটা পাগল, ভালোবাসা পাওয়ায় ততটাই কাঙাল।”
ভিখারিনিকে সে কোলে তুলে নিয়েছিল নীড়চ্যুত পাখির স্নেহে। আসলে সেও বুঝি পাগলই ছিল। নইলে কেই বা পাগলি ভিখারিনিকে মনে তুলে বসার জায়গা দিয়েছে ইতিহাসে! শালপাতায় স্নেহ-তাচ্ছিল্যে ভরে দু গরাস কথা-বার্তা অথবা “এই তো আছি বন্ধু” সুলভ সান্ত্বনার তরকারি, এর বেশি মহাকাল আর কিছু লেখেনি৷ মহাকালের বিরোধী চরিত্ররা একে একে আকাশের তারা হয়ে জ্বলে থাকে আমার গলায় আটকে থাকা ক্রিষ্টাল দেখবে বলে। আমি খাবি খাই। খাবি খেতে খেতে মন ধুয়ে নিই ক্লোনাজিপামের ঢেউয়ে৷ এসব দৃশ্য বাস্তবায়নের পরে,  সভ্য সমাজে থাকার খিদে মরে যায়। স্মৃতির ঝোলা তুলে ফুল ম্যাড খুঁজতে থাকে অন্তরালের পথ। অন্তরালের শূন্যতা বড় মোলায়েম। এখানের মতো এত প্রতিধ্বনি নেই, নৈঃশব্দ চুরমার করে জানান দেয় না তুমি কতটা একা…