মধুছন্দা মিত্র ঘোষ-এর গদ্য

Spread This

মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

এসো হে আরোগ্য …

অসামান্য শ্রাবণ এখন। বৃষ্টি ধারাপাত। অতঃপর নবীন উদারতায় কিছু টলটলে জলবিন্দু গড়িয়ে নামছে জানলার শার্সিতে। জলে ধোওয়া মেঘলা দুপুর বা বিকেলে, বাড়িতে বসে কফির কাপে আয়েশ করে চুমুক দিতে যে কি ভালো লাগে। জানলার শার্সির ওপারে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখতে যতটা ভালো লাগে, মনের গতিপ্রকৃতিও কেমন টাল খেয়ে যায়। আবহাওয়ার ধারাপাত মোতাবেক এই সময়টায় আষাঢ় – শ্রাবণ বর্ষালিপি মেনে আকাশে বজ্রগর্ভ মেঘেদের আনাগোনা শুরু হয়ে যাবার কথা। হচ্ছেও। কোনো কোনো দিন বিকেলের দিকে বা সন্ধ্যের দিকে ঝড় আসছে, হালকা অথবা ভারী বৃষ্টিপাত। কখনও ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত। দিনে দুপুরেও টিপটিপ টিপটিপ। তবে এই অস্থির সময়ে একবারও কাব্যি করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না, “আবার শ্রাবণ হয়ে এলে ফিরে / মেঘ আঁচলে নিলে ঘিরে”। কখন যে বৈশাখ এসে গেছিল, গ্রীষ্মের পারদ চড়তে শুরু করে দিয়েছিল। তালেগোলে ভুলেই গেছিলাম এবার সেইভাবে বৈশাখকে স্বাগত জানাতে। শুধু টের পেয়েছিলাম এটা গ্রীষ্ম। তারপর তো জ্যৈষ্ঠ গেল। আষাঢ় গেল। শ্রাবণ এল।

এদিকে কাটিয়ে যাচ্ছি, টানা সাড়ে তিন মাসের অচলাবস্থা, সময়টা নেহাত কম নয়। হদ্দ বোকার মতো প্রথমদিকে কতকিছুই না করে ফেললাম। হাততালি দিলাম, থালা-বাসন পেটালাম, বাজি ফাটালাম, মোম জ্বালালাম, অকাল দেওয়ালি করে ফেললাম। আবার ঘর অন্ধকার রেখে বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনাকে থোড়াই কেয়ার করে গলা মিলিয়েছি ‘গো করোনা গো’। অতিমারির জন্য এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা। এখন ওসব বর্ষাবিলাসের কথা মনে করাও পাপ। এ এক অদ্ভুত সময়। এক অদ্ভুত সংক্রমণের সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছি আমরা। ফলত গৃহবন্দী যাপন। টিভি চ্যানেল, খবরের কাগজে নিত্যদিন এক নতুন উদ্ভূত অসুখে আক্রান্তের গ্রাফ। নিত্যদিন গ্রাফের ঊর্ধ্বমুখী বৃত্তান্ত মনে ভয় আতঙ্ক আর অবসাদ এনে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এমন কঠিনতর পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়তে হয়নি আগে। মুখ ঢাকা মানুষের আনাগোনা দেখতে থাকি।

 ঘরবন্দী আবহের মাঝেই কখন বসন্ত ফিকে হয়ে ফুরিয়ে গেছে। গ্রীষ্ম ফুটতে শুরু করে দিয়েছিল। এই কঠিন পরিস্থিতিতে যুঝতে যুঝতে কখন যেন চৈত্র শেষ করে বৈশাখ এসেছিল, বৈশাখ পার করে আষাঢ়, শ্রাবণ। বর্ষাও পায়ে পায়ে চলে এসেছে ঠিকমত। শ্রাবণ ঘাই মারছে। এখন আষাঢ় – শ্রাবণ মেঘের গায়ে বেদনার ধুলো। শ্রাবণ আমন্ত্রণে রিমঝিম মায়ায় সেজে ওঠা আর হয় না। কতই না কলধ্বনি বৃষ্টির। প্রতিটি শব্দকেই আলাদা করে চিনে নিতে হয়। রিনরিন ধারাবাহিক পুলকে টুকে রাখি আগামী অনাগত বিষাদকথা। বৃষ্টি কুচি লুকিয়ে নিই শাড়ির ভাঁজে।

 এই অস্থির আবহে, রোজ অলসভাবে ভোর হচ্ছে, বেলা বাড়ছে, অপরাহ্ণ কখন সায়াহ্ন হয়ে উঠছে। কখনও ধূসর কালো মেঘে ঘনিয়ে আসছে চরাচর। বৃষ্টিবাতাস ও বৃষ্টিমেঘের জমাট ছবি নিয়ে। কোন কোন দিন বৃষ্টি পরবর্তী আকাশ জুড়ে কি চমৎকার এক মায়াবী গোধূলি আলোয় ছয়লাপ থাকে দিকবিদিক। ফেসবুক ভর্তি রমরম করে সেই চূড়ান্ত গোধূলি আকাশের নানান পোস্ট। এতো ভয়াবহভাবে পরিস্থিতি কাটানোর মাঝেও সেই নিজস্ব ছন্দ-সুষমায় আঁকা গোধূলি রঙের আকাশটাকে মোবাইল ক্যামেরার লেন্সে সযত্নে তুলে রেখে দেওয়াতেও যেন এই অসহায় দিনে একফোঁটা নির্ভেজাল আনন্দ। আলোকচিত্রীর কাছেও এমনতর আকাশের ছবির সংগ্রহ রাখাটাও বেশ অভিজাত হয়ে ওঠে। ফেসবুকের দেওয়ালে আপলোড করে দিলেই হলো। আসলে অনেকটা পথ চলতে চলতে আমরাও জিরেন নিয়ে নিই কিছু সময়ের জন্য। অহর্নিশ খবর, খবরের সত্যতা যাচাই করি না আর। বড়ো ভয় হয়। বিষাদ চেপে ধরে।

আমাদের সেই সাবেক আবেগ আতিশয্যের হাতছানি এবার নেই। নেই মানে নেই। এবার কিন্তু এই লকডাউন আবহে একবারের জন্যও মন চায়নি বিবিধ রসনাবিলাসের দিকে ঝুঁকতে। আমরা কীরকম অভ্যস্ত হয়ে যেতে চলেছি এই কঠিন সময়ের সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে রেস্তোরাঁবাজি, স্ট্রিট ফুডের প্রতি অতি নির্ভরশীলতাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে। কই ? এখন আর তেমন মন আনচান করছে না তো ? ছবি দেখে ডালগোনা কফি বানাতে চেষ্টা করছি বটে, আবার অতি সাধারণ মুড়িমাখাও বিকেলের চায়ের সঙ্গে চালিয়ে নিচ্ছি। হ্যাঁ চালিয়ে নিচ্ছি মানে অভ্যাসে পরিণত করে নিচ্ছি। ফেসবুকে হরেক রকমারি খেলার আমন্ত্রণ জুটছে। তবু আমাদের গৃহবন্দী অলস দুপুর, ধৈর্যহীন বিকেল, একঘেয়েমি সন্ধ্যে, নির্জনতর রাত নিয়েই এখন অনিশ্চয় যাপনকথা। স্পর্শ করি একেকটা বর্ষা ভেজা দিন, রাত। মুঠোয় ভবিতব্য।

বৃষ্টি মজলিশে উলুকঝুলুক মন তৈরি হয়ে থাকে। বৃষ্টিতে চুপ্পুস্‌ হয়ে যে ভিজবো, এবছর তার কি আর জো আছে ? একটু জ্বর সর্দি কাশি বাঁধিয়ে বসলেই তো বিপত্তি। একটু যে ভিজবো, এই অস্থিরতা অনিশ্চয়তার প্রশ্নে সেখানেও দাঁড়ি টানা। তবু লোকাচার ভুলে, অতিমারির ভয়াবহতা ভুলে আমি মনে মনেই বৃষ্টি মাখি, ভুলিয়ে দিই জলের অভিমান। শ্রাবণদিনেই তো ঝালিয়ে নেওয়া হৃদয়ের আনাচ কানাচ। নিঃসঙ্গ চাতকের মতো কখনও স্বরচিত হয়ে যাই। একলা হয়ে যাই খুব। মাপজোক করা গতিময় জীবন থেকে কিছু অসামান্য ফুরসত ছিঁড়ে মেতে থাকা যেত এই সেদিন পর্যন্ত। এখন অতি সুরক্ষার প্রশ্নে ক্রমশ হাঁপিয়ে উঠি। ধীরে ধীরে একটা সময়ে মনে হল এ লড়াই অল্পদিনের নয়। এই বিপন্নতার মধ্যেও স্বপ্ন পুঁতে রাখি। এসো হে আরোগ্য। প্রশ্বাস ভরে নিই এক বুক বৃষ্টিভেজা সোঁদা গন্ধ। একলা হতে হতে, আরও বেশি বেশি একলা হতে হতে মন গেয়ে ওঠে ‘আজ যেমন করে গাইছে আকাশ/ তেমনি করে গাও গো’। এই জলরঙকে আবার কেমন নিবিড় মনে হয়, রূপকথার মতো।