Souptik Chakraborty

সৌপ্তিক চক্রবর্তী-র ধারাবাহিক উপন্যাস

Spread This
Souptik Chakraborty

সৌপ্তিক চক্রবর্তী

রামমোহন
 
এক
 
আসলে তার ডাকনাম মোহন। অনেকদিন আগে ঘাটশিলা বেড়াতে গিয়ে পাড়ার বন্ধুরা সবাই ঠিক করেছিল হুইস্কি খাবে আর সে বলে উঠেছিল ‘ভাই, আমার জন্য কিন্তু রাম’। শুনে সব্যদা হেসে বলেছিল ‘বেশ মোহনের জন্য রামই তুলিস। ও হল আমাদের রামমোহন’। ব্যাস, সেই থেকে পাড়ার বন্ধুবান্ধবের কাছে সে হয়ে গেল রামমোহন। তার তখন ফার্স্ট ইয়ার। সবে মদ খেতে শিখেছে।
 
আস্তে আস্তে বন্ধুবান্ধবের দেখাদেখি পাড়ার ছোটরাও বলতে শুরু করল রামমোহন-দা। আজকাল তো তাকে রামমোহন-কাকুও শুনতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার রামমোহনের বদলে বলে ‘রাম্মোন’। পাড়ার বয়স্করা অবশ্য তাকে মোহন বলেই ডাকে। এ নিয়ে রামমোহনের কোনও ক্ষোভ বা আপত্তি নেই কারণ নামকরণের পেছনে যে বৃত্তান্তই থাক না কেন নামটা তো আর মন্দ নয় বরং এক মনীষীর নাম।
 
রামমোহনের বয়স সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ। মাঝারি হাইট। রোগাটে গড়ন। শ্যামলা রঙ। চুল-দাঁড়ি-গোঁফ ছোট করে ছাঁটা। চোখে পাড়ারই তারানাথ অপটিক্যালস থেকে বানানো অর্ডিনারি ফ্রেমের চশমা। সস্তা জিন্স আর গোলগলা টি শার্ট পরে। পায়ে সস্তা কিটো। আংটি- মাদুলি- তাগা- তাবিজ কিছু পরে না।
 
রামমোহনের নেশা বলতে সারাদিনে বার কয়েক লিকার চা, দু বান্ডিল বিড়ি আর একদিন অন্তর অল্প রাম।  হপ্তায় একটা ওল্ড মঙ্কের বোতল কেনে তাতেই চলে যায়। রাম ছাড়া অন্য কোনো মদ সে খায় না।
 
পাড়ার ঠিক মাঝামাঝি রামমোহনের বাড়ি। ছোট একতলা বাড়িটা বানিয়েছিলেন তার বাবা। তিনি ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক। নৈহাটির একটা কলেজে পড়াতেন। রামমোহন যখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে তখন তিনি মারা যান। তার মা-ও মারা গেছেন আজ প্রায় সাত বছর হল।
 
বাড়ির সামনের দিকে গ্যারাজে রামমোহনের জেরক্সের দোকান। পুরনো অ্যাম্বাসাডর গাড়িটা তার বাবা মারা যাওয়ার পরপরই তারা বিক্রি করে দেয়। গ্যারাজের পাশে লোহার সদর গেট। গেট খুলে ঢুকে একটা ছোট্ট চাতাল। সেখানে রামমোহন টবে কয়েকটা ফুলগাছ লাগিয়েছে। চাতাল পেরিয়ে দুটো সিঁড়ি দিয়ে উঠে ভেতরে ঢোকার দরজা। দরজা খুলে একটা ছোট প্যাসেজ। তার ডানহাতে ছাদে ওঠার সিঁড়ি আর বাঁহাতে ঘুরে হল। হলের একদিকে কিচেন আর বাথরুম। অন্যদিকে দুটো বেডরুম। একটা বড় আর একটা ছোট। হলে আসবাব বলতে ভারী কাঠের একটা গোল ডাইনিং টেবল, তাকে ঘিরে চারটে কাঠের চেয়ার, একটা পুরনো সোফা, তার সামনে একটা কাঠের সেন্টার টেবল আর এককোণে একটা পাল্লা দেওয়া শোকেস। শোকেসের ওপরের দুটো তাকে তার বাবার বই, মাঝের দুটোতে নানা জায়গা থেকে কেনা বাহারি শোপিস আর একেবারে নিচেরটায় সাজানো ক্রকারি। এখন রামমোহন বড় বেডরুমটাতেই শোয়। সেখানে আছে তার বাবা-মার বিয়েতে পাওয়া সেগুন কাঠের খাট আর আয়না লাগানো আলমারি। এককোণে বাবার সেক্রেটারিয়েট টেবল আর গদিআঁটা চেয়ার। দেওয়ালে তার বাবা-মার কমবয়সে একসাথে তোলা একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। ছোট ঘরটায় আছে রামমোহনের পুরনো সিঙ্গল খাট, একটা কাঠের চেয়ার আর পুরনো বইভর্তি মাঝারি হাইটের একটা বুকর‍্যাক। বেশ ধুলো পড়েছে বইগুলোতে। পুরনো  পড়ার টেবলটাকে নিয়ে গেছে দোকানে। যা যা ছিল তার সবই আছে। কোনোকিছুই রামমোহন বেচেনি। শুধু পুরনো টিভিটা দিয়ে দিয়েছে ঠিকে কাজের লোক ফুল্লরাদিকে। টিভি সে কোনোদিনই দেখত না। হলের পেছন দিকে দেওয়াল জোড়া জানলা। জানলার একধারে দেওয়ালের কোণে একটা বেসিন। তার ওপরে একটা ডিম্বাকার আয়না। ছিটেছিটে জলের ছোপ ধরেছে তাতে।
 
স্থানীয় কেশবচন্দ্র কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স বাঁচিয়ে রামমোহন বি.এ. পাশ করে। চাকরিতে তার তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। গ্যারাজটা খালি পড়ে ছিল ও দোকানটা করে নিয়েছে। জেরক্স-স্ক্যানিং-প্রিন্টিং করা ছাড়াও রামমোহন খাতা- পেন- পেনসিল- ইরেজার- গাম- স্টিকার- ব্রাউন পেপার- রং পেনসিল- ড্রইং বুক এসবও বেচে। পাড়ায় গার্লস হাইস্কুল আছে তাই ব্যবসা মন্দ হয় না। জেরক্স মেশিন ছাড়া দোকানে আছে দুটো হাতলওলা প্লাস্টিকের চেয়ার, একটা স্ট্যান্ড ফ্যান, কাঠের র‍্যাকে রাখা রকমারি বিক্রির জিনিস আর পাড়ার লাট্টুদার অ্যাসেম্বল করা একটা পুরনো ডেস্কটপ।
 
টাকা পয়সার খুব একটা চিন্তা তার  নেই। বাবার জমানো টাকা সেই তো পেয়েছে। বিয়ে করেনি। একলার সংসার। যা রোজগারপাতি হয় তাতে তার দিব্যি চলে যায়।
 
রামমোহন সহজ সরল লোক। কোনো কুটকাচালিতে সে থাকে না। তাই পাড়ার সকলেই তাকে ভালোবাসে। রোজই তার দোকানে চেনাশুনা লোকজন আসে। সে সকলের সাথেই হেসে কুশল বিনিময় করে। কেউ কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গল্প- টল্পও করে যায়।
 
রামমোহনের একটা বড়ো সুবিধা হল যে সে রান্নাবান্না ভালোই পারে। চা- অমলেট- ভাতের পাশাপাশি ডাল-ভাজা-সব্জি আর মাছ- মাংস- ডিমের ঝোলও বানাতে পারে। চাল-ডাল-নুন- তেল-চিনি- মশলা- ডিম- পাপড় ও মাসকাবারি আর যা কিছু তার জন্য আছে ভোলার মুদির দোকান। রোজ সকালে ভ্যানরিকশা নিয়ে পাড়ায় আসে কানাই আর শ্রীপদ। কানাই বেচে সবজি আর শ্রীপদ মাছ। মাছ বলতে রামমোহন কেনে তেলাপিয়া আর চারাপোনা। হপ্তায় এই চারশো কি পাঁচশো করে। আনাজপাতিও তেমন বেশি কিছু না। পেঁয়াজ- রসুন- আদা- লঙ্কা- ট্মেটো আর আলু- বেগুন- পটল। রবিবার সকালে বড় রাস্তার ওপারে মন্টুর চিকেন শপ থেকে কেনে ছশো মত ব্রয়লার আর কোনো এক ফাঁকে কাছের কাউন্টার থেকে তুলে নেয় হপ্তার খোরাকি রামটুকু। ব্যাস।
 
মাসে একবার পাড়ার লোকনাথ সেলুনে কার্তিকের কাছে চুল- দাঁড়ি- গোঁফ ছাঁটে আর শখ করে মহামায়া মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে মাঝে মধ্যে সিঙারা-নিমকি খায়। মিষ্টিতে তার তেমন রুচি নেই।
 
দুই
 
রামমোহনের ঠাকুরদারা ছিলেন তিন ভাই-এক বোন। দেশভাগের পরপরই তাঁরা সপরিবারে রাজশাহী ছেড়ে চলে আসেন কলকাতায়। বড় ভাই ছিলেন উকিল। ছোটভাই যান ব্যবসায়। মেজ অর্থাৎ রামমোহনের ঠাকুরদা বেশ কিছুদিন অপেক্ষা ও ঘোরাঘুরি করার পর তার  পুরনো ব্যাঙ্কের চাকরিতেই পুনর্বহাল হন। বেলঘড়িয়া ব্রাঞ্চে। ওখানেই একটা বাড়ির একতলা ভাড়া নিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন। ওই বাড়িতেই জন্ম হয় তাঁদের একমাত্র সন্তান রামমোহনের বাবার। তার ঠাকুমাকে রামমোহন চোখেই দেখেনি আর ঠাকুরদা যখন মারা যান তখন তার বয়স সাত। এর বছর দুয়েক পরই তার বাবা এপাড়ায় জমি কিনে বাড়ি করে তাকে আর তার মাকে নিয়ে চলে আসেন। বাবার দিকের জ্ঞাতিগুষ্টির সাথে রামমোহনের তেমন যোগাযোগ কোনওদিন ছিল না। ওই ছোটবেলায় কিছু অনুষ্ঠান বাড়িতেই যা দেখা- টেখা হয়েছে।
 
তার মায়ের দিকের আত্মীয় বলতে মামা-মামী-মামাতো ভাই আর স্মৃতিলোপ পাওয়া শয্যাশায়ী দিদিমা। মামা-মামী-দিদিমা থাকেন তাঁদের পৈতৃক বাড়ি মানিকতলায়। মামাতো ভাই পল্টু বিদেশে। তবে তার মা মারা যাওয়ার পর থেকে মামা-মামীর সাথে আর বিশেষ দেখা সাক্ষাৎ নেই। বিজয়ার পর পর রামমোহন ফোন করে প্রণাম জানায় খালি।
 
রামমোহনের বাবা মা তাকে বিন্দুমাত্র সেবা শুশ্রুষা করার সুযোগ দেন নি। তাকে শুধু মুখাগ্নি আর শ্রাদ্ধ শান্তি করতে হয়েছিল। তার বাবা মারা যান কলেজেই। ক্লাস নিয়ে ফ্যাকাল্টি রুমে ফিরেই অসুস্থ বোধ করেন। ধপ্ করে বসে পড়েন চেয়ারে। তারপর বাঁ হাত বুকে চেপে ঝুঁকে পড়েন সামনের টেবলের ওপর। পড়েই যেতেন চেয়ার থেকে। এক সহকর্মী ধরে নেন। তক্ষুনি প্রিন্সিপালের গাড়ি করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এমার্জেন্সি ওয়ার্ডের ডাক্তার পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করে। খবর পেয়ে তার মাকে নিয়ে রামমোহন যখন হাসপাতালে পৌঁছয় ততক্ষণে তার  বাবার নিষ্প্রাণ দেহ সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। স্বামীর মৃতদেহের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার মা এক আর্ত চীৎকার দিয়েই অজ্ঞান হয়ে যান। আর রামমোহন সেই প্রথম ও শেষবারের মতো পরিণত বয়সে জনসমক্ষে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে।
 
রামমোহনের বাবার মরদেহ নিয়ে পাড়ায় ছোটখাটো মিছিল বেরিয়েছিল। মৃতদেহের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটা লাল রঙের কাপড়। তার  ওপর সাদা দিয়ে আঁকা কাস্তে-হাতুড়ি। তার মাকে নিয়ে রামমোহন ছিল সামনের সারিতে। স্লোগান উঠেছিল: কমরেড অলক চ্যাটার্জী অমর রহে। তার মা নিশ্চুপ থাকলেও নিজের অজান্তেই কখন যেন রামমোহন বলে উঠেছিল: অমর রহে, অমর রহে। সেই প্রথম ও শেষবারের মতো রামমোহন মিছিলে হেঁটেছিল। স্লোগানে গলা মিলিয়ে ছিল।
 
তার মা চলে যান একদম নিঃশব্দে। ভোররাতে ঘুমের মধ্যে। সাধারণত সকালে চা-টা রামমোহনকে তার মা-ই করে দিতেন। সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রামমোহন তার  মায়ের কোনো সাড়াশব্দ পায়নি। ভেবেছিল শরীর টরীর খারাপ হয়ত। শুয়ে আছে, থাক। সে নিজেই দু-কাপ চা করে মায়ের ঘরে গিয়ে দুবার ‘মা মা’ করে ডাকল। কোনো সাড়া না পেয়ে সে ঠেলা দিয়ে ডাকল। আর গায়ে হাত দিতেই সে চমকে উঠল। বরফের মতো ঠান্ডা তার মায়ের শরীর। কিছুক্ষণ থম্ মেরে থেকে কল দিল পাড়ার আশু ডাক্তারকে। পরপরই ফুল্লরাদি চলে এল। এসেই হাউমাউ জুড়ে দিল। তার চিৎকারে একে একে জড়ো হল প্রতিবেশী কেউ কেউ। সবশেষে এলেন আশু ডাক্তার। নাড়ি টিপে দেখে জানিয়ে দিলেন অনেক আগেই সব শেষ। কিচ্ছু করার নেই আর।
 
সব যে শেষ সেটা রামমোহন তার মায়ের গায়ে হাত দিয়েই বুঝেছিল। সে মুঠি-চোয়াল শক্ত করে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। প্রতিবেশীদের সান্ত্বনা বাক্য তার কানেও পৌঁছল না। সেদিন থেকে সে পুরোপুরি একা হয়ে গেল। তার দুচোখের কোনে চিকচিক করছিল জল।
 
তিন
 
রোজ সকালে আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে এক কাপ লিকার চা আর দুটো ডিম সেদ্ধ খেয়ে ঠিক ন-টায় রামমোহন দোকান খোলে। একটা নাগাদ বন্ধ করে স্নান খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নেয়। তারপর উঠে এককাপ লিকার চা খেয়ে আবার চারটেয় দোকান খোলে। দোকানে কাজের ফাঁকে পড়ে সাপ্তাহিক বর্তমান। সন্ধে সাতটায় সেদিনের মতো দোকান বন্ধ করে চলে আসে পাড়ার মোড়ে লেবুদার চায়ের দোকানে। এক গেলাস লিকার চা আর দুটো নোনতা বিস্কুট নিয়ে ঘণ্টাখানেক আড্ডা দেয়। লেবুদার দোকানের আড্ডায় থাকে পাড়ার জুনিয়ররা। কলেজ পড়ুয়া শঙ্খ, প্রদীপ্ত, বিতান, শীর্ষ- এরা। জুনিয়ররা তার সামনে বিড়ি-সিগারেট খেলে রামমোহন কিছু মাইন্ড করে না। নানান বিষয়ে আড্ডা হয়। খেলাধুলা- রাজনীতি নিয়ে হাল্কা তর্ক- বিতর্কও হয়। রামমোহন বিশেষ মন্তব্য করে না। মিটিমিটি হাসে আর চা-বিড়ি খায়। তারপর বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ি ফিরে কোনো কোনো দিন রান্না করে। একা লোক তাই রোজ রান্না করার প্রয়োজন পড়ে না। একবার রাঁধলেই তিন-চারবেলার খাবার তৈরী। আর ফ্রিজ তো আছেই। রান্নাবান্না সেরে হলে হলদেটে ডিমলাইটটা জ্বেলে সোফায় বসে চুপচাপ বিড়ি টানে আর মোবাইলে ইউটিউব থেকে হেমন্ত-মান্না-কিশোরের গাওয়া বাংলা-হিন্দী গান শোনে। যেদিন রাম খায় সেদিন একটু পাঁপড় সেঁকে নেয়। তারপর রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে। এই তার রোজকার রুটিন।
 
রবিবার রামমোহন দোকান খোলে না। সাড়ে আটটায় ফুল্লরাদির বেল শুনে বিছানা ছাড়ে। যথারীতি ফ্রেশ হয়ে চা-ডিম সেদ্ধ খায়। তারপর ফুল্লরাদি কাজ সেরে চলে গেলে ছোট্ট থলিটা নিয়ে চলে যায় মন্টুর চিকেন শপে। বাড়ি ফিরে যত্ন করে মাংসটা রাঁধে। তারপর স্নানটান সেরে জমিয়ে মুরগি-ভাত খেয়ে একচোট ভাতঘুম দেয়। বিকেল সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ উঠে এককাপ লিকার চা খেয়ে হাঁটতে বেরোয়। হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় পাড়ার পেছনে ঝিলপাড় অব্দি। এই ঝিলপাড়ে ছোটোবেলায় বাবার হাত ধরে সে বেড়াতে আসত ছুটির দিনে। ঝিলপাড় থেকে দেখা যায় এক্সপ্রেস হাইওয়ে। আগে ছিল রেলের ঢালু জমি। রামমোহনরা বলত ঘ্যাষের-মাঠ। ঝিলপাড়ে একটা বেঞ্চে কিছুক্ষণ বসে বসে বিড়ি টানে। আগে এখানে একটা রাধাচূড়া গাছ ছিল। পাকা বাজার হওয়ায় সেটা কেটে ফেলা হয়েছে। সন্ধের মুখে রামমোহন উঠে পড়ে। হেঁটে হেঁটে পাড়ায় ফিরে আসে।
 
পাড়ায় ফিরে যায় সব্যদার বাড়ি। সব্যদার বাড়ির একতলার ঘরে বসে তাসের আড্ডা। সব্যদা- গগাই- বুল্টাই আর রামমোহন। ওরা সবাই জড়ো হলে সব্যদা তাদের কাজের লোক অনিমাদিকে দিয়ে চপ-মুড়ি আনায়। চপ-মুড়ি আর লিকার চা নিয়ে জমে ওঠে তাসের আসর। বেশ কয়েক হাত খেলে রাত নটা নাগাদ রামমোহন বাড়ি ফিরে আসে। এই আড্ডা তাদের বহুদিনের। তারা সবাই ছোটবেলার বন্ধু। গগাই-বুল্টাই তারই বয়সী। সব্যদা তাদের থেকে বছর চারেকের বড়। গগাই ব্যাঙ্কে চাকরি করে। বুল্টাই একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। সব্যদার ক্যাটারিং-এর ব্যাবসা। রামমোহনের মতোই ব্যাচেলর। গগাই-বুল্টাই হল যাকে বলে ফ্যামিলি ম্যান।
 
রবিবার রাতে বাড়ি ফিরে রোজকার মতোই রাম-বিড়ি-পুরনো বাংলা-হিন্দি গান আর তারপর খাওয়া  দাওয়া সেরে ঘুম। এককথায় একদম সাদামাটা জীবন তার। সহজভাবে দিন কেটে যায়। কোনো ঝক্কিও নেই। কোনো তরঙ্গও নেই।
 
(ক্রমশ)