প্রতিভা সরকার-এর প্রবন্ধ

Spread This

প্রতিভা সরকার

লাশের সম্মান

না চাইলেও মাঝে মাঝে মর্মান্তিক কিছু ঘটনার সাক্ষী হয়ে যেতেই হয়। সশরীরে অথবা ভিডিওর কল্যাণে ছবি হয়ে চোখে আটকে থাকে তারা। খবরের কাগজ বা সোশাল মিডিয়ায় বর্ণিত ঘটনাগুলিও কিছু কম ধাক্কা দেয় না। অনেকদিন ধরে তারা আমাদের অনুসরণ করতে থাকে, আমরা না চাইলেও। যেমন গড়িয়া শ্মশানে বেওয়ারিশ লাশকে পচা কুকুর বেড়ালের মতো ঘাড়ে চিমটে দিয়ে টেনে নিয়ে ভ্যানে তুলে ফেলার দৃশ্য। ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল ভিডিওটা। দেখে শিউরে ওঠেনি এমন মানুষ কম। অল্পবয়েসী ছিল সে, মৃতদেহটির ছিরিছাঁদ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কোনো কারণে, হয়ত বা দুর্ঘটনায় বা আত্মহত্যায় প্রাণ হারিয়েছে। অথবা হতে পারে তার সমাপ্তিতে হাত ছিল কোনো নির্মম ঘাতকের। সরকারিসূত্রেই বলা হয়েছে মৃতদেহগুলি কোভিডের শিকার নয়। শুধু পরিচয়হীন। কেউ তাদের সঙ্গে পরিচয় বা আত্মীয়তা স্বীকার করেনি। আমাদের দেশের মর্গগুলিতে প্রায়সময়েই দুর্গন্ধ মেখে শুয়ে থাকে এইরকম হারিয়ে যাওয়া একদা জীবিতরা। কিন্তু যে অশ্রদ্ধা, যে অবহেলা দেখা গেছে গড়িয়া শ্মশানে তা খুবই পীড়াদায়ক, মনুষ্যত্বের পরিপন্থী।

সোশাল মিডিয়ার চর্চা থেকে উঠে এল এর পেছনের কারণগুলো। এতো কম পারিশ্রমিক দেওয়া হয় এই কাজে যে যারা বেওয়ারিশ দেহের সদগতির ভার পায়, তারা কাজটি করে নমো নমো করে। চিমটে দিয়ে ঘাড় চিপকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাবার দৃশ্যও তাইই বলে। জানা গেল এইরকম একটি লাশের সদগতি করবার জন্য কলকাতাইয়া মর্গের ডোম সরকারের কাছ থেকে পাবে ১২৫ টাকা কর্পোরেশন থেকে ২০০ টাকা। এই টাকাতে তাকে একটি দুর্গন্ধযুক্ত, মাংস খসে পড়া গলিত লাশের সৎকার করতে হবে। ফলে যা হবার তাইই হয়।

কলকাতার বাইরেও একই দৃশ্য। উত্তরবঙ্গ মেডিকাল কলেজের সব পরিচয়হীন লাশই নাকি অল্প গর্ত করেই বালাসোন নদীর তীরে বালি চাপা দেওয়া হয়। শেয়াল কুকুর অল্প আয়াসেই তা খুঁডে তোলে এবং কাছের গ্রামগুলিতে ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে দেয়।

এ তো গেল মর্গ কর্মচারীদের কথা। তাদের অপ্রাপ্তি, তাদের কাজের ধরণ। কিন্তু মৃতদেহকে তুচ্ছ করবার এই ব্যাধি সর্বত্র আছে।

এই তো সেদিন উত্তর প্রদেশে রক্ষীবিহীন একটি রেল গেট তীব্রগতিতে পার হচ্ছিল একটি বাচ্চাভর্তি স্কুল ভ্যান । ড্রাইভার কাকুর কানে নাকি ছিল মোবাইল , ফলে ছুটে আসা রেলগাড়ির গর্জন বা বাচ্চাদের ভয়ার্ত আর্তনাদ কোনটাই তার মগজে ধাক্কা দেবার আগে ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা । বেশীর ভাগ বাচ্চাই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় । ঘটনাস্থলে মুখ্যমন্ত্রী আসেন। সন্তানহারাদের  আকুল কান্না ও স্থানীয়দের প্রতিবাদ তার ক্রোধ উৎপন্ন করে ,তিনি গাড়ীর বনেটের ওপর দাঁড়িয়ে হাতের মাইকে তীব্র চিৎকার করেন, নোটংকী মত কিজিয়ে ।

এরপর যা ঘটে তা বড় ভয়ানক । পোষ্ট মর্টেমের পর ছোট ছোট নিঃস্পন্দ দেহগুলো যখন শেষবারের মতো বাড়ি ফেরে ,স্নান করাতে গিয়ে আত্মীয়স্বজন হতবাক । নগ্ন দেহগুলোর কারো পেট চেরা ,কারো মাথার অর্ধেক খুলি কেটে আলগা করে বসানো। সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ক্ষতস্থানগুলি সেলাই না করেই পাঠিয়ে দিয়েছেন । শুধু বাবা মা বা নিকট আত্মীয় নয়, ভিডিও করতে থাকা সাংবাদিকের পেশাদারি গলাও কাঁপছিল সে দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে ।

ভাবটা এইরকম যে হতভাগ্য বাচ্চাগুলি তো মাটি অথবা আগুনেরই খাদ্য হবে, তাহলে এই সংবেদনশীলতার অভাব নিয়ে এতো বলার কী মানে হয় ! বিশেষত যে দেশে জীবিতেরই কোন সম্মান নেই, সেখানে মৃতের মর্যাদা ভাববিলাস কিনা এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা অশুদ্ধ হয় না।  বেশিরভাগ মানুষেরই মনোভাব এইরকম। মৃতের মর্যাদা নিয়ে তারা দুপয়সা খরচ করতে রাজি নয়। সেকারণেই কাশ্মীরের বাখরওয়ালদের ছোট্টমেয়েটি কিন্তু স্বনামেই আসমুদ্রহিমাচল আলোচিত ও পরিচিত । যেন ধর্ষণ করে যখন মেরে ফেলাই হয়েছে আটবছুরেটিকে, তখন স্বনাম, বেনামে কিইই বা যায় আসে ! তাহলে কি শুধু জীবিতেরই হক থাকে ছিটেফোঁটা মর্যাদায়,মৃতের বেলা সেসবের কোন প্রয়োজনই নেই ? জীবিত ও মৃতের মধ্যে এই অবহেলা ও অসংবেদনশীলতার রেখা টানা কতোদূর নীতিসম্মত  ? অথচ আইন আছে যে নির্যাতিতার নামধামপরিচয় কিছুই প্রকাশ করা যাবে না। খবরের কাগজগুলোও তা ছাপতে পারবে না, দূরদর্শনের প্রতিবেদক তা উচ্চারণ করতে পারবে না।

অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ এই যে কোন সভ্যতা কত উন্নত ও সংবেদনশীল তা নির্ধারিত হয় মৃতের প্রতি তার মনোভাব ও ব্যবহারে । শুধু মনীষী বা বিখ্যাতদের বেলা নয় ,একটি সুসভ্য দেশ মৃতদের প্রতি সশ্রদ্ধ বিনম্র থাকবে এইটিই প্রত্যাশা। সাধারণ মানুষের তবু ধর্মীয় সংস্কার, ব্যক্তিগত নৈকট্য সামাজিকতা, শিক্ষা ,অব্যাখ্যাত ভয় ইত্যাদি কারণে মৃতের প্রতি বিশেষ মনোভাব নিয়ে চলার পক্ষপাতী । কিন্তু রাষ্ট্র ও সভ্যতা ? তার দায় মেটে কিভাবে ?  বরং এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে এদেশে এই দায়িত্ব এখন ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে । মৃত ও জীবিত নির্বিশেষে এখানে এখন শেষ কথা বলছে সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যকামিতা । একটি সাম্প্রদায়িক,ধর্মীয় উন্মাদনাময় ও বিভেদকামী রাজনৈতিক শক্তির উত্থানে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং প্রাচীন সভ্যতার ধাত্রী এই দেশ কিভাবে সভ্য বিশেষণে ভূষিত হবার অধিকার হারাচ্ছে তা সত্যই প্রণিধানযোগ্য ।

সাধারণের যে সাধারণ জ্ঞান থাকে, রাজপুরুষদের তাইই থাকবে এ আশা নিতান্ত বাতুলতা। দিল্লীতে হুমায়ুন বাদশার মূল সমাধিস্থলের বাইরের চাতালে প্রচুর ছোট বড় কবর । কোনটি হিন্দুস্তানের বাদশার প্রিয়পাত্রের, কোনটি অকালমৃত রাজসন্তানের বা দাসেদের । তারই একটিতে জুতোসুদ্ধ ঠ্যাঙ তুলে আয়েস করে বসে মোবাইল দেখে চুল ঠিক করছিল যে যুবক, তার সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করতে সে কিন্তু হুড়মুড়িয়ে উঠে গেল । কিন্তু এ দেশের বর্তমান শাসকের প্রতিভূদের মধ্যে এই সম্যক ও সাধারণ সৌজন্য বড়োই দুর্লভ । ফলে ত্রিপুরার বিদগ্ধ বঙ্গসন্তান রাজ্যপাল যখন বছর দুয়েক আগে এই নিদান দেন যে প্রতিবেশীদেশের জিহাদিদের এপারে মারা হলে তাদের শেষকৃত্য হবে এক অভিনব উপায়ে তখন চমকে উঠতে হয়। তার মতে নিহত জিহাদির মুখে শূকর মাংস গুঁজে শূকরচর্মাবৃত অবস্থায় তাকে জ্বালিয়ে দেওয়া উচিৎ । এই চূড়ান্ত অসংবেদনশীল মতেরও অনেক সমর্থক পাওয়া যাবে, কারণ ধর্ম ও রাষ্ট্রনীতির চক্করে সুস্থ ও মানবিক ভাবনাকে মানসিক দুর্বলতার লক্ষণ বলে ধরে নেওয়াই বর্তমান রেওয়াজ । কিন্তু সরকারী অর্থে পোষিত ও রাজভবনের নিরাপত্তায় লালিত ,রাষ্ট্রমহিমায় মোড়া  বিশেষ রাজনীতির একজন যখন এই বিধান দেন তখন তার গূঢ়ার্থ খুঁটিয়ে দেখা কর্তব্য । শূধু ধর্মে হারাম হবার কারণে মুসলমানের মুখে যদি গুঁজে দেওয়া হয় শুকরমাংস ,আর হিন্দুর মুখে গরু , তাহলে বুঝতে দেরি হয়না যে এ শুধু মৃতদেহের প্রতি অসম্মান নয় ,তাকে সামনে রেখে তার ধর্মের বিরুদ্ধে আর এক রকম জেহাদ ঘোষণা । এর আঁচ খুঁচিয়ে তুলবে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ নিরীহ মানুষকে যারা কোনভাবেই আতংকবাদের সঙ্গে যুক্ত নন । সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নীল নকশাই কি এই মন্ত্রণার পেছনে মূল চালিকাশক্তি  ?

মনে রাখতে হবে সবচেয়ে বেশি শবভুক দাঙ্গা ও যুদ্ধ । যুদ্ধের কথায় পরে আসছি ,সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যেদেশে হয় তাকে সভ্য দেশ বলা যায় না। সম্মান দেওয়া দূরস্থান, মৃতদেহের ঢের লাগিয়ে তার চূড়ান্ত অসম্মান ঘটায় দাঙ্গা সভ্যতা শালীনতার কোন তোয়াক্কা না রেখেই। উস্তাদো কা উস্তাদ মহামহিম  মেঘকন্ঠ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের মজহারে ফুল চড়াতে হলে ২০০২ সালের আগে যেতে হত বরোদার এক ঘিঞ্জি গলিতে । নোংরা মোটর গ্যারেজের পেছনে শ্বেত পাথরের ছত্রী দেওয়া সমাধি, কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দেখেন কয়েকটি কাটাঝোপ ও গুজরাতি রামছাগল ছাড়া কেউ নেই। তবু কুমারপ্রসাদের চট্টোপাধ্যায়ের মতো সঙ্গীতরসিক কেউ চাইলে পৌঁছোতে পারতেন মৃত আফতাব-এ-মৌসিকি সুরসম্রাটের দরবারে। কিন্তু ২০০২ সালে গণহত্যার সময় একদল লোক শাবল গাইতি নিয়ে সে সমাধি আক্রমণ করে । মনোগত ইচ্ছা, কবর খুঁড়ে খাঁ সাহেবের দেহাবশেষের অমর্যাদা করবে। তাদের সে কদর্য মনোবাসনা মিটেছিল কিনা জানিনা, কিন্তু ভারতীয় সঙ্গীতের স্বর্ণযুগের শেষ বাদশাহের এই হেনস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ধর্মান্ধ আধিপত্যবাদ কিভাবে ভয়ের বাতাবরণ তৈরিতে মৃতদেহের বিকৃতিকে কাজে লাগায় । এর আরেকটি কদর্য রূপ হালে দেখা গেছে উত্তরপ্রদেশে যোগীর নির্বাচনী জনসভায়। নিজে না বললেও তারই উপস্থিতিতে মঞ্চভাগী এক হিন্দুত্ববাদী বক্তা বিশেষ ধর্মের রমণীদের মৃতদেহ কবর থেকে তুলে ধর্ষণ করবার উপদেশ দেয়।

অথচ সকল ধর্মেই মৃতের শান্তি বিঘ্নিত না করবার কথা বলা আছে । মৃতদেহের অপমান মানে মনুষ্যত্বের অপমান। বর্তমান শাসকের কল্যাণে যে ধর্মকে রক্ত ও তরবারির ধর্ম বলে জানছে ভবিষ্যত প্রজন্ম, সেই ইসলাম ধর্মে নবী স্বয়ং বার বার বলেছেন মরদেহের পবিত্রতা রক্ষার কথা। ইসলাম-পূর্ব আরবে শত্রুর মৃতদেহ বিকৃত করবার রেওয়াজ ছিল । ইসলাম কিন্তু এই প্রথাকে অমার্জনীয় ভাবে। কথিত আছে সামনে দিয়ে এক মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় সম্মান প্রদর্শনের জন্য হজরত মহম্মদ উঠে দাঁড়ান। একজন তাকে বলে, এতো একে স্ত্রীলোক ,তাতে ইহুদি । একে সম্মান না দেখালেও চলবে । উত্তরে নবী বলেন মৃত্যু উচ্চাবচহীন,গভীর শোকের উৎস । তাই যারই জানাজা যাক না কেন শোক ও সম্মান জ্ঞাপন করাই বিধেয় । তিনি বিধান দেন মৃতের সম্বন্ধে কোন কুকথা বলা চলবে না , শেষযাত্রায় অংশ নেওয়া অবশ্যকর্তব্য এবং সমাধিকে বসবার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাতে অবশ্য কিছুই আটকায় না। ভারত পাক সীমান্তে মাথা কাটা, চোখ খোবলানো সৈন্যদের মৃতদেহ পাওয়া যায় আকছার। সীমান্তের এপারে ওপারেও।

দাঙ্গা ভয়াবহ ,নিয়মবিহীন ও নিরপরাধের রক্তে রাঙা । এই সেদিন ঘটে যাওয়া দিল্লি দাঙ্গা একথা আমাদের আবার বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের ম্যানুয়ালে মৃতের সম্মান নিয়ে লেখা আছে পাতার পর পাতা। ১৯০৭ এ হেগ কনভেনশনের ধারাগুলি ১৯৪৯ সালে স্বীকৃতি পায় জেনিভা কনভেনশনে। এতে নিষিদ্ধ আছে মৃতদেহে ইছাকৃত পচন ধরানো,মৃতদেহ থেকে কিছু নিয়ে নেওয়া বা মরদেহকে বিকৃত করা। তাই এতোদিন পরেও সিরিয়া যুদ্ধে মহিলা সেনানীর মৃতদেহের সঙ্গে অসভ্যতার ভাইরাল ভিডিও দেখে মনে হয় শেখা গেল না কিছুই ,বরং সভ্যতার যেটুকু শান ছিল তা দ্রুত বিলীয়মান । যুদ্ধবন্দী অবস্থায় মারা গেলে তার যথোচিত শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করতে হবে। একান্ত অসম্ভব না হলে তা হবে মৃতের স্বধর্ম অনুযায়ী। ইন্টারন্যাল সোসাইটি অব রেডক্রসের রিপোর্টেও বলা আছে একজনের জন্য একক সমাধিই কাম্য যদি না বিশেষ পরিস্থিতিতে দরকার হয়ে পড়ে গণকবর। বস্তুত যুদ্ধক্ষেত্রে বা বন্দীদশায় মৃত্যু হলে শত্রুর মৃতদেহের কোনরকম বিকৃতি সব সভ্য দেশেই আইনত দন্ডনীয় । এইজন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিচার হয়েছিল মৃতদেহ বিকৃতি ও নরমাংস ভক্ষণের অগুন্তি অভিযোগের।

আমাদের দেশের সংবিধানে আর্টিকল ২১ এ মৃতের প্রতি সম্মানের অধিকার ও যথাযথ আচরণের অধিকার দেওয়া হয়েছে ।“জাতীয়” ধর্মগ্রন্থটিতে শরীরকে জীর্ণ বস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা হলেও, সাংবিধানিক ঐতিহ্যের প্রতি নত থেকে ভারতীয় সর্বোচ্চ আদালত ২০১৮ সালের ২৪ শে এপ্রিল যে রায় দেয় তাতে বেদম ধাক্কা খেয়েছে এই মনোভাব যে মরে গেছে বালাই গেছে , প্রকাশ করে দিলেই হয় নামধাম । কাঠুয়া কান্ডের উল্লেখ না করেও সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার করে জানিয়েছে মর্যাদা আছে মৃতেরও। দন্ডবিধির ২২৮ক ধারায় সংবাদমাধ্যমে যৌন নির্যাতিতার পরিচয় জানানো চলবে না কিছুতেই । পকসো আইনে এমন কি বিচার প্রক্রিয়ার বিবরণী প্রকাশ নিয়েও বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। কিছু সংবাদমাধ্যমের বেশ কয়েক লক্ষ টাকা জরিমানাও হয়েছে এই অপরাধে । তবু বারবার কেন প্রকাশ পেয়ে যায় নির্যাতিতার নামধাম ? নির্ভয়ার আসল নাম সবাই জানে , কাঠুয়ার শিশুটিরও । ব্যতিক্রম সুজেট গর্ডন । মৃতের জড়ত্বে তাকে ঠেলে দেবার চেষ্টা হলেও জীবিতের মতোই একক চেষ্টায় তিনি আলোয় ফিরেছিলেন । খোলা মুখে মিছিলে হেঁটেছিলেন । তাঁর নাম উচ্চারণে উচ্চারিত হয় এক অসমসাহসী মানুষের স্মৃতি , যিনি স্বনাম ও সততাকে তথাকথিত সামাজিক লজ্জার বেগুনী গন্ডদেশে সজোরে চপেটাঘাতের জন্য ব্যবহার করেছিলেন ।

সব বলার পরেও কিছুই বলা হয়না , যদি না বিশেষভাবে উল্লেখ করি মৃতের প্রতি ধর্মীয় আধিপত্যবাদীদের নিষ্ঠুর মনোভাবের কথা। বেগুনি রঙের ওপর সোনালি ফুলের কাজ করা জামায় যে নিষ্পাপ চোখদুটো আমাদের তাড়া করে চলে ,বাখরওয়ালদের সেই মেয়েকে কবর দেবার জন্য কাঠুয়া গ্রামে কোন জমি পাওয়া যায়নি ।বাখরওয়ালরা ঐ গ্রামে নিজেদের পয়সায় একটুকরো জমি কিনেছিল মৃতদের সমাহিত করবার জন্য । পাঁচ জনকে সেখানে মাটি দেওয়া হলেও শিশুটির বেলায় এমন বাধা এল যে তাকে কবর দেবার জন্য নিয়ে যেতে হল দশ কিমি দূরের আর এক গ্রামে । মৃতের স্মৃতিকে কতো কারণে মুছে ফেলতে চায় একদল জীবিত !

এই অপচেষ্টাগুলির অপমৃত্যু হোক । শুধু আইনের বলে নয়,ধর্ম জাতপাত নিরপেক্ষভাবেই  আমাদের ভেতর থেকেও উঠে আসুক জীবিতের সঙ্গে সঙ্গে মৃতের প্রতি সৌজন্য ও সম্মান। সেখানেই আমাদের মনুষ্যত্বের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও তাতে সসম্মানে উত্তীর্ণ হবার উপায় ।