ইন্দ্রনীল ঘোষ-এর গদ্য

Spread This

ইন্দ্রনীল ঘোষ

ডিসেম্বর ১৯৭৪, অস্ট্রিয়া। মার্গারেট সেফার (Margaret Schäfer) নামে অষ্টাদশী এক জার্মান তরুণীর হত্যা সামনে আসে। তার লাশ পাওয়া যায় জঙ্গলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায়, অত্যাচার হেনস্থার নানা চিহ্ন গায়ে, হাত-পা বাঁধা… স্টিল পাইপ দিয়ে মারার পর গলায় ফাঁস বেঁধে টেনেছে খুনি, ফাঁস দিয়েছে মেয়েটারই ব্রেসিয়ার জড়িয়ে, তারপর শুকনো পাতায় ঢেকে দিয়েছে শরীর-সমগ্র।

ঠিক যেমন এই ‘সমগ্র’ শব্দটা আমি বেছে নিলাম, ‘সমস্ত’ বা ‘গোটা’ বা ‘পুরো’ এসবের বদলে, শব্দের শেষে হ্রস্বইগুলো স্ট্রেসগুলো এদিক-ওদিক ক’রে সাজালাম, অনুরূপ ক্রিয়াদের আঁকিয়ে-বাঁকিয়ে একটা আকার বানালাম পছন্দ-মতো আর তারপর নিজেরই সাজানো শব্দসজ্জা তাদের ওজন আকৃতি গতি চলন সবটা সমেত বাক্যগুলো বারবার পড়তে পড়তে মুগ্ধ হলাম নিজেতেই — তেমনই কোনো সিরিয়াল কিলার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ — খুনের শিল্প… একটা ব্লেডের অ্যাঙ্গেল, কিম্বা জ্বলন্ত লোহার রঙ, বিশেষ কোনো ফাঁস… ওই কয়েক ইঞ্চি আয়োজন, কয়েকটা সামান্য চিহ্নের মধ্যেই কোটি কোটি অণুর বিক্রিয়া — তাদের তাপমাত্রার সঙ্গীত — তরঙ্গ টের পায় তারা, দেখতে পায় একটা নেহাতই কেজো মোটিফ — বাপের নাম না জানা – মায়ের রেন্ডিগিরি – আদিগন্ত থুতকার – খানকি মাগি – নদীমাতৃক – মহেঞ্জোদারো পৃথিবীর যাবতীয় ঘামাচি কীভাবে সূক্ষ্ম হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে নীহারিকায়।

মার্গারেটের হত্যা রহস্য সমাধান হয় ঘটনার প্রায় দু’বছর পর, ১৯৭৬ সালে।

  • খুনি — জ্যাক আন্টারউইগার (Johann “Jack” Unterweger)
  • জন্ম ১৬-ই অগস্ট ১৯৫১(১) অর্থাৎ খুনের সময় বয়েস মাত্র তেইশ
  • এর আগেও বেশ অনেকবার খুচরো মামলায় জেল খেটেছে, ১৯৬৭-তে একবার এক বেশ্যাকে যৌন হেনস্থার অভিযোগে, তা বাদে নানা চুরি ছিনতাই, বেশ্যার দালালি… মোট ষোলোটা গ্রেপ্তারির রেকর্ড। মার্গারেটের খুনে ধরা পড়ার আগে, জীবনের পনের থেকে তেইশ মোট ন’ বছর তার প্রায় জেলেই কেটেছে।

আন্টারউইগারের খুনের পদ্ধতিটা ছিল নজরে পড়ার মতো। পরবর্তীতেও সে যে খুনগুলো করে মোটামুটি তা প্রায় একই রকম— বেশ্যা বা কলগার্ল, উলঙ্গ দেহ, মারধরের চিহ্ন, গলায় অন্তর্বাসের ফাঁস, জঙ্গল, মারার পর পাতা বা অন্য কিছু দিয়ে শরীর ঢাকা। এটা ছিল তার স্বাক্ষর বা খুনের স্টাইল, অধিকাংশ সিরিয়াল কিলারেরই যেমন থাকে। শিল্পী বা কবি-লেখকেরও থাকে। এই স্টাইল যদি স্বতঃস্ফূর্ত হয়, মেকি না হয়, তবে তার মধ্যে মিশে থাকে শিল্পীর মনস্তত্ত্ব, তার জিন, তার বেড়ে ওঠা। কোনো কবির কথাই যদি ধ’রি, লিখতে আসার শুরুটা হয়ত অগ্রজ কোনো কবির শৈলী দ্বারা প্রভাবিত, কিন্তু ধীরে ধীরে সে খুঁজে পেতে থাকে নিজের শব্দ নিজের স্বর… যা জমতে জমতে একদিন গ’ড়ে ওঠে তার সিগনেচার। এই খুঁজে নেওয়া, বেছে নেওয়া বা চয়েজের নেপথ্যেই তার মনোজগত। কেউ লিরিকাল, কেউ আরবান, কেউ প্রতিবাদী, কেউ সংহত… ইত্যাদি। অবশ্য আরেক দলও থাকে — মেকি। যাদের লেখার মূল উদ্দেশ্যই বাজারে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা, ‘ভালো’ তকমা হাসিল করা। সিরিয়াল কিলাররা কেউ তেমন দর্শকদের কথা ভেবে খুন করে ব’লে জানা নেই। হ্যাঁ তবে, জঙ্গিরা করে। নৃশংস গলা কাটার ভিডিও ফুটেজ বাজারে ছাড়ে দর্শকের আতঙ্ক দেখার আশায়। তাদের যেমন একটাই লক্ষ্য — জনতার মধ্যে ভয় তৈরি করা, এই শেষোক্ত শিল্পী লেখকদেরও তেমন লক্ষ্য শুধু জনতার মধ্যে “বাহ” তৈরি করা। দুজনের ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রকাশ করার চেয়েও বড় বিষয় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। একজন সিরিয়াল কিলারের তা কখনই পাথেয় নয়। নিজেকে প্রকাশ করার তাগিদটাই তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। নিজের অন্তরমনের উদ্ভ্রান্ত অচেনা স্পন্দন তৈরি করে তার শৈলী। আন্টারউইগারের ক্ষেত্রেও তেমন। তার সিগনেচারগুলোর কারণ অনেকটাই লুকিয়ে ছিল তার অতীতে। বিচার চলাকালীন ধীরে ধীরে জানা যায়, অপরাধী আন্টারউইগারের সেই জীবনবৃত্তান্ত।

১৯৫০ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রিয়া তখন মিত্রশক্তির দখলে, মার্কিন সেনাদের (GI) ঘোরাফেরা। তেমনই এক মার্কিন GI জ্যাক বেকার (Jack Becker) এর সাথে ঘনিষ্ঠতা হয় তেরেসা আন্টারউইগার (Theresia Unterweger) নামে এক ভিয়েনিস যুবতীর। তেরেসা একটি বার-এ ওয়েটারের(২) কাজ করত। দু’জনের মধ্যে এই সম্পর্ক কিন্তু বেশিদিন টেঁকে না। জ্যাক বেকার চ’লে যায়, তেরেসা গর্ভবতী হয়। শুরু হয় পরবর্তীর জ্যাক আন্টারউইগার, বিশ্বযুদ্ধ অতিক্রান্ত অস্ট্রিয়ার জারজ নাগরিকদের অন্যতম।

জ্যাকের মধ্যে যে ক্রিমিনাল কারেন্ট খেলা করত তাকে বোঝার জন্য কয়েকটা বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া খুব দরকার। প্রথম, জ্যাকের মা তেরেসা। যৌনতা এবং অপরাধ-ঘন জীবনের মহিলা। জ্যাক পেটে থাকাকালীনই জেল যায় জালিয়াতির কেসে। তারপর আবার যখন জ্যাক তিন বছর, তখন। এই সময় জ্যাককে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার দাদুর কাছে। দ্বিতীয় ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট এই দাদু, যে ছিল বিপজ্জনক রকমের মাতাল ও বদ। ছোট জ্যাককে মারধর সহ নানা অত্যাচার — হাঁস মুরগি চুরির কাজে লাগাত। তৃতীয়, তার পরিবেশ, পরিস্থিতি — বাপের পরিচয় নেই, মা জেলে… একদিকে অপরাধ যেমন জ্যাকের জিনে, তেমনই সে বেড়েও উঠতে লাগল সেরকম অপরাধময় পরিবেশে — ছিনতাই চুরি লুট ধর্ষণ খুন এসবের মধ্যে। পাঁচ বছর বয়েস থেকে মদ শুরু, পনের বছরে জেল, ষোলতে এক বেশ্যাকে নৃশংসভাবে যৌন হেনস্থার মামলা — তরুণ আন্টারউইগারের পুলিশ রেকর্ড নিয়ে আগেই বলেছি।

সামগ্রিক অসুস্থ এক পরিবেশে বড় হতে হতে যে একজনকেই জ্যাক ছোট থেকে পায় তার প্রতি মমতাশীল, সে জ্যাক নিজেই। আর তাই জ্যাক যে একজনের প্রতিই মমতা টের পেত, সে-ও জ্যাক নিজে। বিচার চলাকালীন তার জবানবন্দী অত্যন্ত সহানুভূতি সহমর্মিতার সাথে নিজের প্রতিটা মানসিক অবস্থার কথা স্পষ্ট করতে থাকে। জানা যায়, কীভাবে দিনের পর দিন সে অপেক্ষা করেছে তার মা তাকে নিতে আসবে ব’লে, কীভাবে তার দাদু এই অপেক্ষাকে বোকামি ব’লে ব্যাঙ্গ করেছে। শেষমেশ কিশোর আন্টারউইগার সাল্‌জবার্গ পালায় নিজের মাকে খুঁজতে। মায়ের সাথে দেখা হয় না বটে, কিন্তু এখানেই তার জীবনে অল্প কিছু দিনের জন্য হলেও এক সুন্দর মোড় আসে। আলাপ হয় মাসি অ্যানার (Anna) সাথে। এই প্রথম জ্যাক নিজের বাইরে কাউকে পায় যে তার প্রতি সহানুভূতিশীল, তার বন্ধু। অ্যানা পেশায় যৌনকর্মী। অ্যানার সাথে কথাবার্তার সময় বেশ্যাদের নানা গল্প শুনত জ্যাক। কারও মাথায় পালক, তো কারো কাঁধে হঠাতই ভুতুড়ে আঁচড় দ্যাখা গেছে… কেউ আবার ভাঙা রেডিও নিয়ে টাকা জমাচ্ছে, কবে নতুন রেডিওর দিন হবে… রূপকথার মতোই এসব রেন্ডিকাহন — শুনতে শুনতে অনুভব টের পেত জ্যাক।

কিন্তু খুব শিগগিরিই থেমে যায় সে রূপকথাও। অ্যানা খুন হয়। তাকে তারই এক খদ্দের মেরে ফেলে রেখে যায়। আন্টারউইগারের জীবনের প্রতিটা বিন্দুতে যেন অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছিল প্রকৃতি… যেন প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছিল একই সাথে এক আন্তর্জাতিক সিরিয়াল কিলার আর কবি গ’ড়ে তোলার। অ্যানার খুন জ্যাককে ভিতর থেকে ধসিয়ে দেয়। সেটা ১৯৬৭। সে বছরই এক বেশ্যাকে আক্রমণ ক’রে বসে সে।

বিচার চলাকালীন নিজের জবানবন্দীতে জ্যাক জানায়, মার্গারেট সেফারের সাথে বচসা চলতে চলতে হঠাতই তার মধ্যে মায়ের চেহারা দেখতে পায় জ্যাক। আর সাথে সাথেই সম্বিত হারিয়ে প্রথমে স্টিল রড ও পরে তারই ব্রেসিয়ার তার গলায় জড়িয়ে ফাঁস দেয়।

এ’ আবার একটা জায়গা, যেখানে একজন সিরিয়াল কিলার আর শিল্পী পাশাপাশি এসে দাঁড়ায় — নিজের অন্তরমনকে প্রকাশের তাড়না, অস্থির অসহায়তা। অন্য কোনো পাতি খুনি নয় — রাগের মাথায় বা কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করতে ধাঁ ক’রে কাউকে মেরে দিলো — সেসব নয়। কারণ সেখানে শিল্প থাকে না, নির্মাণ থাকে না। আন্টারউইগারের খুনগুলোই যদি ধরা হয়, সেখানে ভিক্টিমের নিজেরই অন্তর্বাস দিয়ে তার গলায় ফাঁস যেমন রূপক হিসাবে তীক্ষ্ণ বিদ্বেষ বহন করে তেমনই শুকনো পাতা দিয়ে উলঙ্গ শরীর ঢেকে দেওয়া এক নান্দনিক প্রলেপ বা হয়ত-বা স্যাটায়ার।

কবি লেখক শিল্পীদের অনেক কাজই দায়ে বা প্রয়োজনে প’ড়ে করতে হয় বা অনুরোধ উপরোধ রাখতে, কোনো বিষয়ের ওপর লেখা প্রস্তুত, কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য মূর্তি নির্মাণ, মন্ত্রীর ফটোশুট এগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে’ ধরণের ব্যাপার, এখানে কোনো সিরিয়াল কিলারের তাড়না কাজ করে না, বরং কাজ করে দক্ষতা, তুলনা করতেই হলে একে বড়জোর প্রফেশনাল কিলারের সাথে করা যায়। কিন্তু এসব বাদে, কখনও কখনও এমনও হয় যখন এক শিল্পী কোনো তীব্র অনুভবের মধ্যে, কোনো গভীর দুঃখ শোক আনন্দ অপমানবোধ স্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের সমস্ত অস্তিত্বে শিল্পের আর্তি টের পায়, নিজের অন্তরমনকে প্রকাশ করার তীব্র প্রয়োজনে, নিজেকে সম্পূর্ণ করার তাগিদে। কারণ শিল্পই তার কাছে সবচেয়ে স্বাভাবিক কম্যুনিকেশনের মাধ্যম। সেই তীব্র মুহূর্তে সব ব্যবহার হয়ত শিল্পী দক্ষভাবে ভেবেচিন্তে করে না, কিন্তু তার অনুভূতির সাবলীল প্রকাশ আপনিই শৈল্পিক হয়ে ওঠে। সিরিয়াল কিলারের ক্ষেত্রেও তাই, তার অন্তরমনের বিভিন্ন আণবিক ঘটনা প্রকাশ পায় প্রতীকে রূপকে, শুধু খুন ক’রে পালিয়ে যায় না সে, চিহ্ন তৈরি করে, ভাষা তৈরি করে। আপাতভাবে দেখতে গেলে এক বিরাট পার্থক্য, শিল্পী আর খুনির — শিল্পী সৃষ্টি করে, খুনি ধংস। কিন্তু একটু গভীরে ভাবলেই বোঝা যায় তা নয়, অন্তত কোনো সিরিয়াল কিলারের ক্ষেত্রে, কারণ তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সে-ও বস্তুত মৃত্যু সৃষ্টি করে।

ব্যক্তিগত জীবনে এমন বহুবার ঘটেছে যখন অনুভূতির ঘনত্ব বন্ধ ক’রে দিয়েছে আমাকে — আমার ভেতর আর বাইরের আদানপ্রদান। কানে তালা লেগে গেলে যেমন ভোঁ শোনা যায় বা দীর্ঘক্ষণ বেঁধে রাখা চোখের বাঁধন খুললে আলো যেমন লাগে… আমার একটা বাইরে আছে, সেটা টের পেলেও সেটাকে বোঝার, খুঁটিয়ে দেখার ইচ্ছাটাই থাকে না… স্থিতিজাড্য কাজ করে। এরকম সময়ে কী অদ্ভুতভাবে আমি কবিতাই লিখেছি নিজেকে প্রকাশ করতে। ট্রান্সে লেখা নয়, আবার সম্পূর্ণ বৌদ্ধিক সচেতন নির্মাণও নয়। ঘনত্বের পার্থক্যে যেমন তরল একদিক থেকে আরেক দিকে প্রবাহিত হয় যতক্ষণ না দুদিকের ঘনত্ব সমান হচ্ছে, এ-ও তেমনি। পরে খুঁটিয়ে দেখেছি সেই লেখার ভাষা গঠন শিল্প। সিরিয়াল কিলারেরও তেমন।

কয়েক বছর আগের এক ঘটনা বলি। ভাগলপুরের এক বড়সড় হোটেলে। আগের রাতে ব্যবসার পার্টনাররা এসেছিল, অনেক দেরি অব্দি আলোচনা হয়েছে, সম্ভবত ভাগলপুরের ব্রাঞ্চ আর থাকবে না, নানা সমস্যা, ভুল বোঝাবুঝি, দোষারোপ, বন্ধ হয়ে যাবে… তো, যাই হোক, পরদিন যখন ঘুম ভাঙল এক অনড়-অজর সকাল। জামশেদপুর থেকে এখানে এসে প্রায় দু’ বছর চেষ্টা করেছি ব্রাঞ্চ দাঁড় করানোর, নতুন পার্টনার নিয়েছি… সময় টাকা কর্মশক্তি সব গেছে… কেমন ফাঁকা লাগছিল নিজেকে। যন্ত্রণা, পরাজয়-বোধ, অপমান-বোধ, প্রতারিত হওয়ার গ্লানি — সে এক মিশ্র অনুভূতি, বিছানা ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছা করছিল না। হঠাতই বেড-সাইড টেবিল থেকে ল্যাপটপটা টেনে টাইপ করতে শুরু করলাম —

সাম্প্রতিক বিপ্লবের পর,

আমি ফিরে যাচ্ছি নিজস্ব নিয়নে

এই আলোকিত ফেরাটুকু শুধু আমিই দেখতে পাই

আর তুমি, নবনীতা বা শ্রাবন্তী বা যারা যারা আমরা সেই ছোট থেকে বন্ধু ছিলাম…

 

পৃথিবীতে ঘুম আনা আলো, পৃথিবীরই কোনও কাজে লাগলো না —

এই নিয়ে একটা ট্রাজিক ফিল্ম বানানো যায়

শেষ সিনে মারপিটও রাখা যায়, ওই ধর্মযুদ্ধ গোছের,

প্রত্যেকটা গাছে আমাদের প্রতিবার মেরে ফেলা হবে–

আর বসন্ত নামবে ফিল্মে…

 

লোক হাততালি দেবে

 

এই মৃত্যু যে এডিটেড, সেটাও তারা বুঝবে না

[শেষ সিন বসন্ত]

লিখে ফেলার পর টের পাচ্ছিলাম, অনুভবের যে স্থবির ব্যাপারটা ছিল তা ধীরে ধীরে স’রে যাচ্ছে। কবিতাটা আমারই মানসিক অবস্থার এক লিখিত প্রতিরূপ, তাকে লিখে ফেলার ফলে মন সহজ হয়ে আসছিল, লাশের সামনে দাঁড়ানো ধারাবাহিক খুনির মতোই।

আরও একটা সময় খুব মনে পড়ে। তখন তেইশ বছর বয়েস, মাস্টারস করছি, সদ্য মা আত্মহত্যা করেছে। ব্যাপারটা আমায় খুব আঘাত দিয়েছিল। আঘাত — শোক, দুঃখ, যন্ত্রণা নয় কিন্তু। আমরা সচরাচর শব্দগুলো সম্পর্কিত ভাবি। কিন্তু তা কেন? আঘাত অনুরণনও সৃষ্টি করতে পারে, কিম্বা বাদ্য-তরঙ্গ। আমার ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটছিল। চারপাশের শব্দ গন্ধ স্বাদ দৃশ্য সবেতেই যেন অচেনা কীসব মাত্রা জুড়ে যাচ্ছিল। সমস্ত কিছুর ভেতর অঙ্কুর বেরোনো টের পেতাম। দেখতাম, কীভাবে আলোর মধ্যে কোটি কোটি আলোর দানা তাদের মুহূর্ত-মুখ খুলছে, বন্ধ করছে। সারাক্ষণ একা ঘুরে বেড়াতাম, বা ব’সে থাকতাম কোথাও চুপচাপ… নিজেকে হাল্কা করার একটাই উপায় — লেখা। স্বগতোক্তির মতো লিখে যেতাম। লেখার পর বারবার পড়তাম, যেন উন্মাদের মতো নিজের ওই অনুভবগুলোকে বারবার পড়তে চাওয়ার জন্যই লিখতাম। প্রায় পনের বছর আগের সেসব কবিতার কিছু আমার প্রথম বইয়ে আছে।

আলোর দানায় ওড়ে আমার না-এর হেসে ওঠা

থেমে উঠবার শিল্প হাসছে আলোর অণুকানে —

পুরোনো কাঠের স্নেহ, পুরোনো কাঠের মনিঘোর

আসবাব হতে হতে হঠাতই হেসেছে

 

হাসির মধ্যে কোনো আঙুলের ছাপ নড়ে কিনা

দুটো ছাপ পাশাপাশি ‘ভালো আছো’ প্রশ্ন করে কিনা

বাড়িটা এসব খোঁজে

আসবাবে ভ’রে উঠে বাড়িও একলা হতে চায়…

[হাইওয়ে-৫ /কাব্যগ্রন্থ – রাত্রে ডেকো না, প্লিজ]

মার্গারেট সেফার হত্যার রায় বেরোয়। বিচারে জ্যাকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

মজার বিষয়, জেলে আসার পর থেকেই আশ্চর্যজনকভাবে পরিবর্তন হতে থাকে তার। নিরক্ষর জ্যাক পড়াশুনো শিখতে শুরু করে, ধীরে ধীরে সাহিত্যের করেস্পন্ডেন্ট কোর্স… লিখতে থাকে কবিতা, গল্প, নাটক, রেডিওতে সম্প্রচারের জন্য ছোটদের গল্প। ১৯৮৩ সালে জেল থেকে লেখা তার আত্মজীবনী Fegefeuer (Purgatory) প্রকাশ পায়। এক বছরের মধ্যেই এ’ বই বেস্টসেলার। পরের বছর Endstation Zuchthaus (Terminus Prison) নাটকের জন্য সাহিত্য পুরস্কার পায় সে। অস্ট্রিয়ার মানুষের মধ্যে, বিশেষত সাহিত্য মহলে হৈ-চৈ প’ড়ে যায়। বহু সাহিত্যিক, প্রিজন-রিফর্মিস্ট এগিয়ে আসেন জ্যাককে প্যারোলে মুক্তির আবেদন নিয়ে। সাহিত্য সংস্থা PEN, এঁদের সমর্থনে দাঁড়ায়।

আত্মজীবনীতে জ্যাক তার দমবন্ধ বেড়ে ওঠা, মনের ভিতর জমতে থাকা রাগ-ঘেন্না-হিংস্রতার কথা কনফেশনের ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তোলে — নিজের প্রতি অসীম মায়া ও সহানুভূতিতে সমস্ত অন্যায় স্বীকার করে, “স্টিল রড দিয়ে বেশ্যা আর দালালগুলোকে পেটাতাম — হ্যামবার্গ, মুনিচ বা মার্সেইতে। আমার শত্রু ছিল, মনের ঘেন্না দিয়ে আমি তাদের দাবিয়ে দিতে চেয়েছি।” ১৯৮৮ সালে Purgatory সিনেমা হয়।

এত সবের মধ্যেও জ্যাকের মৃত্যুর দিকে টান কিন্তু লক্ষ্য করার মতো ছিল। জেলে থাকাকালীন প্রায় তিনবার সে চেষ্টা করেছে আত্মহত্যার। আন্টারউইগারের স্মৃতির মধ্যে সংবিগ্ন অন্ধকার, খুন আর মৃত্যুর তীব্র ইচ্ছে জড়িয়ে থাকত একে অপরকে — অসীম এক আত্ম-স্নেহে। তার প্রকাশ কাব্যিক, যা অনায়াসেই অস্ট্রিয়ার তাবড় সাহিত্যিক থেকে প্যারোল বোর্ড-মেম্বারদের সম্মোহিত করে ফেলল। মানুষ মনে করতে শুরু করল, নিজের লেখার মধ্যে দিয়ে নিজেকে উগড়ে দিতে দিতে জ্যাক তার সমস্ত রাগ, ক্ষোভ, ঘেন্নাকে শেষ ক’রে দিয়েছে, এখন সে নিষ্পাপ —উইটি, নম্র, বিনয়ী এক মানুষ।

জ্যাকের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এক ক্ষমতাশালী কম্যুনিকেশন, তা সে খুনই হোক বা সাহিত্যই। তার প্রতিটা মার্ডার যেমন কিছু বলে, পদ্ধতিগত আঙ্গিকে, তেমনই তার লেখা — যা মানুষের সামনে আশার স্বপ্ন তৈরি করে, অসুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এক তরুণের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা — মানবতার জয়গান… ইত্যাদি। খুব সফলভাবে সে এই রিয়াক্সনগুলো তৈরি করতে পারত প্রয়োজনমতো। এটাও আরেকটা গুণ — যা শিল্পীর। একজন সচেতন শিল্পী এটা আগেই ভাবেন যে তাঁর কোন কাজ কীরকম প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে মানুষের মধ্যে। সবসময় হয়ত তাঁর ভাবনা বাস্তবের সাথে মেলে না, কিন্তু প্রসেসটা থাকে।

 

আগেও বলেছি, পাঠক বা দর্শকের থেকে কেবলমাত্র ‘ভালো’ শুনতে চাওয়ার ইচ্ছাটা শিল্পকে খাটো করে, গণ্ডিতে বেঁধে দেয়। একজন দক্ষ শিল্পী দর্শকের নানা প্রতিক্রিয়াকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করেন। সিনেমায় এটা আমরা হামেশাই দেখি। একইরকম যৌন দৃশ্য কখনো কামোদ্দীপক, কখনও শক, কখনও ভায়োলেন্স। বাকি শিল্পেও তা দেখা যায়। তবে কবিতায় হবে না কেন? সম্প্রতি এক বন্ধুর সাথে এ’ নিয়েই কথা হচ্ছিল — কোনো লেখা ‘ভালো’ লাগা না-লাগা নিয়ে। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম, “কবিতার সাপেক্ষে কোনো পাঠকের পজিটিভ রিয়াক্সন কীভাবে ডিফাইন করবে?”

করার পরই মনে হয়, প্রশ্ন সাজানোর ধরণটা বেশ জটিল হয়ে গেছে। বুঝিয়ে বলি, “ধরো, দেখা হলো — নমস্কার করলাম। এই নমস্কার করাটা আমাদের দেশে পজিটিভ। তার বদলে থাপ্পড় মারলে সেটা নেগেটিভ হত। আবার কোথাও হয়ত দেখা হলে চুমু খায়। সেখানে নমস্কার করাটা নেগেটিভ রিয়াক্সন মানা হয়। সেরকমই তোমার মতে, একজন পাঠকের যদি একটি কবিতার প্রতি পজিটিভ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তবে তা কীরকম হবে?”

বন্ধুটি প্রাথমিকভাবে একটা উত্তর দিয়েছিল বটে, যা মূলত একজন সমালোচকের কাছে তার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা, বা ঠিক কোন ধরণের আলোচনা/প্রশংসা তার ভালো লাগে ও কেন। উত্তরটা ভুল ছিল না, তবে আমার প্রশ্নটা আরেকটু সার্বিক ছিল। পাঠকের প্রতিক্রিয়াকে লেখক যে ব্যবহার করতে পারেন, এবং করেন, সেই প্রসঙ্গে আসতে চাইছিলাম আমি। নিজেও সবসময় চেয়েছি এই বিষয়ে সচেতন থাকতে। যত দিন গেছে, পাঠকের মধ্যে শুধু আনন্দই নয়, কখনও বিস্ময়, কখনও হোঁচট-বোধ, কখনও মিশ্র কোনো অনুভূতি এরকম নানা বৈচিত্র্যময় প্রতিক্রিয়া আশা করেছি। এটা ঠিকই যে পাঠকের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি লেখকের হাতে কখনই থাকে না — যারা সর্বদাই পাঠকের ‘বাহ’-প্রত্যাশী, তারা তাই বিষয়টা সামলাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে পাঠকের পছন্দ অনুযায়ী নানা শব্দ/ ব্যবহার লেখায় বসিয়ে যান সারাজীবন, যাতে নিশ্চিন্ত থাকা যায় প্রশংসামূলক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার ব্যাপারে — তাদের কথা বাদ দিয়ে বলি, পাঠকের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি লেখকের হাতে না থাকলেও লেখকের একটা বোঝাপড়া বা প্রত্যাশা থাকে কোন ধরণের পাঠক তাঁর লেখাটির নিরিখে কীরকম প্রতিক্রিয়া দিতে পারেন তা নিয়ে। বাস্তবের সাথে সেই বোঝাপড়াকে মিলিয়ে দেখা — সেটাই নিরীক্ষা।

এখানে দুটোই গুরুত্বপূর্ণ, কোন ধরণের পাঠক আর কী প্রতিক্রিয়া। যিনি অঙ্ক সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ তিনি কোনো অঙ্ক সম্বন্ধীয় প্রবন্ধকে “দারুণ, অসাধারণ” বললে তেমন পার্থক্য হয় না, কিন্তু একজন অঙ্কবিদ নিন্দা করলেও অনেক লাভ। সেভাবেই, কেউ লিখেছেন বিশ্লেষণ মূলক গভীর আলোচনা, যদি প’ড়ে পাঠক বলে, “ভারী মিষ্টি গদ্য তো”… ভাবুন!

বৃষ্টি যে পড়েছিল

     তা তুমি ওঠাওনি কেন

আমি টিউন বাড়ালাম দূরত্বের

ফুল ভয়েজে জুলাই চলছে

 

শুধু তার গ্রামোফোনটুকু অপেক্ষায়

মাস্টার আসেনি

আসবে কি

জলে ভিজে, সব পথ

     উঠে এলো নোটেশনে

গাইতে গাইতে হঠাতই এক চৌরাস্তা

এরপর কোন গান

আমি থামলাম

সমের ধারে বাড়ি ঘর, অথবা এই পুকুর

সবই তো জুলাইয়ের

তবে আমার কী

এই থেমে থাকার কী

 

মাইরি, তুমি ওঠালে না ব’লে

বৃষ্টি শুধু পড়েই গেল চিরদিন

[জুলাইওয়ালা/ কাব্যগ্রন্থ – জুলাইওয়ালা]

রাবাং ডাং উড়ল উল্লো

সা খুলল গলায়

ভাষার এই শিভরিং

     বৌ-লিঙ্গে ঠোকা সরগম ঘষাঘষি

যেন বসি সরকার — আর উঠতে পারছি না

জিভওয়ালা চাঁদিম সোলো ব্রেসিয়ার

স্তন গরমের ম্যাজিক ঠিক ধরতে পারছি না

 

গ্লেসিয়ারে সিল্কি তার যাওয়া

আজ রুট ফুটছে ভরপাইয়া ঠোঁটে

 

বানু-ভাঙ… টুকরো টাকরা

[স্রোত-১/ কাব্যগ্রন্থ – লোকটা পাখি ওড়া নিয়ে বলছে]

প্রথম কবিতার কথা বলি। আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘জুলাইওয়ালা’ বেরোয় ২০০৯-এ, মানে কবিতাটা তার দু’ এক বছর আগে লেখা হবে। পরের কবিতার ক্ষেত্রে, বইটা (লোকটা পাখি ওড়া নিয়ে বলছে) ২০১২ সালে বেরোনো, ফলে এই লেখাটা ধরা যায় ওরকম ২০০৯/১০ নাগাদকার। দুটো লেখার মধ্যে পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। প্রথম কবিতায় শব্দ-চয়ন, বাক্যের ভঙ্গিমা, লিরিকধর্মিতা মাধুর্য্ সৃষ্টি করে। পড়া-ওঠা এই দুই বিপরীতধর্মী ক্রিয়াকে ব্যবহারের মজা একটা লাইনকে স্পষ্টভাবেই আকর্ষণীয় ক’রে তোলে — লেখকের লাইন-গঠনের ঝোঁক টের পাওয়া যায়। দ্বিতীয় লেখা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে মাধুর্য্ বা কোনো বিশেষ লাইন সৃষ্টির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ধ্বনির খেলা। লেখালিখিতে তখন আমি আরও তিন-চার বছর পেরিয়ে এসেছি। চেনা-পরিচিত পরিসর, চেনা-পরিচিত সৌকর্যের বাইরে অন্য পরিসরে কাজ করতে চাইছি — ধ্বনি কবিতায়। মজার বিষয়, দ্বিতীয় কবিতাটাও কিন্তু লিরিকাল। রীতিমাফিক ছন্দ না থাকলেও যুক্ত-ধ্বনির সন্নিবেশ, বাক্যাংশের দৈর্ঘ্য, পর্বভাগ তার গতিতে রণন তোলে। এখানে লাইন তৈরির আর কোনো চেষ্টা নেই। যেটুকু কম্যুনিকেশন বা তার আভাস ওই ধ্বনি-সংঘাতে আপনা-আপনি তৈরি হয় – মুছে যায়, তা বাদে আর বিশেষ কিছুই বলা নেই।

প্রথম কবিতাটা লেখার সময় কবিতায় আমার শৈলী গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমার কাছে। শব্দ-চয়ন, গঠনের খেলা, অন্তর্নিহিত উইট এসবই হবে টাটকা, ফ্রেশ, আমার নিজস্ব। আর এই, ‘আমার নিজস্ব’ মুগ্ধ করুক পাঠককে। এমনটাই তখন প্রত্যাশা রাখতাম। একই জায়গায় সারাজীবন থেমে থাকতে অস্বস্তি হয়। এই পর্যায় পেরিয়ে আসার পর, আমার কাজ ও প্রত্যাশা বদলালো। ধ্বনি-কবিতা বা গ্রাফ-কবিতা নিয়ে কাজ করার সময় আমি কখনই ভাবতাম না, সমস্ত পাঠক তাকে মুগ্ধ হয়ে গ্রহণ করবে। এ’সময় আমি চেয়েছিলাম কাজগুলো আগ্রহী পাঠকের মনোযোগ পাক, কীভাবে ধ্বনিতে ধ্বনিতে সংঘাত হলে ছড়িয়ে পড়ে কবিতার দানা, কীভাবে কিছু না বললেও কম্যুনিকেশনের ফাঁস বেরিয়ে আসে, আগ্রহী পাঠক পড়ুক, নিজেরই মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হোক, বারবার ফিরে আসুক। এই বারবার ফিরে আসার জন্য যে প্রাথমিক মুগ্ধতার প্রয়োজন হয়, তারই উপাদান হিসাবে ছিল লিরিকধর্মিতা।

অস্ট্রিয়ার আইন বলে, অন্তত পনের বছর কারাদণ্ডের আগে যাবজ্জীবনের কয়েদিদের প্যারোল দেওয়া যায় না। সেই নিয়ম মেনেই ১৯৯০ সালের ২৩-শে মে আন্টারউইগারের মুক্তি হয়। জেলের ওয়ার্ডেন জানায়, “মুক্তির জন্য এতটা প্রস্তুত কয়েদি আমরা আগে দেখিনি।”

সে তখন ইতিমধ্যেই বিখ্যাত এক সাহিত্যিক। শুধু তাই নয়, খুব উঁচু প্রোফাইলের এক শুধরানো কয়েদি। এরকম ব্যাপার অস্ট্রিয়া আগে দেখেনি। জ্যাক চাইছিল তার আত্মজীবনী নিয়ে আরেকটা সিনেমা বানানো হোক। পেশাগত ভাবে ফ্রিল্যান্স রিপোর্টিং-কে বেছে নিয়েছিল সে। বেশ্যা ও অপরাধ জগত নিয়ে বাস্তব-নির্ভর বিভিন্ন লেখা তৈরি করতে থাকে রেডিও আর নানা পত্রপত্রিকার জন্য।

সব মিলিয়ে জ্যাক আন্টারউইগার খুবই গতিময় ও বর্ণবহুল এক জীবন কাটাচ্ছিল। আর ঠিক সে সময়ই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আরও বর্ণময় ও চাঞ্চল্যকর নানা অপরাধের ঘটনা শুরু হয় — একের পর এক বেশ্যা বা যৌনকর্মী খুন হতে থাকে।

১৫-ই সেপ্টেম্বর ১৯৯০ চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগের কাছাকাছি ভিটাভা নদীর ধারে একটা লাশ পাওয়া যায় — এক তরুণী, মৃত, সোজা শুইয়ে রাখা। শরীরে নানা হেনস্থার চিহ্ন। তারই মোজা (stocking) গলায় জড়িয়ে তাকে খুন করা হয়েছে। শরীর উলঙ্গ, পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া। জানা যায় তার নাম ব্লাঙ্কা বোকোভা (Blanka Bockova) — পেশায় যৌনকর্মী, খুবই প্রাণবন্ত এক তরুণী। তাকে শেষ দেখা গিয়েছিল চল্লিশের কাছাকাছি এক মাঝ বয়সী লোকের সাথে কথা বলতে। তার বেশি আর কেউ কিছু জানাতে পারে না।

কয়েক সপ্তাহ পরে অস্ট্রিয়ার গ্রাজ থেকে ব্রুনহিল্ডা মেসর (Brunhilde Masser) নামে এক যৌনকর্মী নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর আসে। তার খোঁজ চলছিলই। ইতিমধ্যেই, ডিসেম্বরে আর একজন বেশ্যা হাইডেমারি হামেরর (Heidemarie Hammerer) নিখোঁজ হয়। একমাস পর — নতুন বছরের উৎসব চলছে তখন — হামেররকে খুঁজে পাওয়া যায় মৃত অবস্থায়, শহরের বাইরের জঙ্গলে। প্রথম খুনের মতোই তার শরীর সোজা শোয়ানো, পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া, শুধু পার্থক্য এটুকুই — লাশটা উলঙ্গ নয়। বোঝা যাচ্ছিল উলঙ্গ অবস্থায় খুন করার পর লাশটাকে খুনি পোশাক পরিয়েছে। এবারেও ভিক্টিমের পরনের টাইটস গলায় জড়িয়ে খুন করা। সারা শরীরে অত্যাচারের চিহ্ন। হামেররের কাপড়-চোপরে বেশ কিছু লাল সুতোর রোঁয়া পাওয়া যায় যা তার নিজের পোশাক থেকে ছিল না। পুলিশ সন্দেহ করে, তা খুনির। এই প্রথম খুনির কোন চিহ্ন পায় পুলিশ।

এর কিছুদিন পরই পচা গলা অবস্থায় ব্রুনহিল্ডা মেসরের লাশ পাওয়া যায়। আগের ভিক্টিমদের মতো একই রকম ভাবে খুন করা হয়েছে তাকে।

গ্রাজের পুলিশ তখনও প্রাগের খুনের ব্যাপারে কিছুই জানে না, তারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে এসবের নেপথ্যে রয়েছে কোন সিরিয়াল কিলার। আর ঠিক তখনই ৭-ই মার্চ ১৯৯১ গ্রাজ থেকে আবার আরেক যৌনকর্মী নিরুদ্দেশ হয় — এলফ্রিড স্র্যাম্ফ (Elfriede Schrempf),

যার প্রায় কঙ্কাল হয়ে যাওয়া মৃতদেহ উদ্ধার হয় সাত মাস পর, ৫-ই অক্টোবর, গ্রাজেরই বাইরের জঙ্গল থেকে। শুকনো পাতা দিয়ে ঢাকা এক কঙ্কাল।

গ্রাজের এই ঘটনাগুলোর পরপরই এরকম চারটে আরও ঘটনা ঘটলো ভিয়েনাতে। এক মাসের মধ্যে চার তরুণী গায়েব।

২০-শে মে ১৯৯১ একজন অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ ভিয়েনার জঙ্গলের পথে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাতই এক উটকো গন্ধ পেয়ে তিনি এগিয়ে দেখতে যান, দেখেন এক তরুণীর উলঙ্গ মৃতদেহ, পাতায় ঢাকা, পচে গন্ধ বেরোচ্ছে। শিয়ালে ডান পায়ের মাংস খেয়ে গেছে। পরনের টাইটস গলায় জড়িয়ে মারা হয়েছে তাকে। কিছুদিনের মধ্যেই, তার স্বামীর করা মিসিং ডায়েরির সূত্র ধ’রে জানা যায় মৃতের পরিচয়। নাম সাবিনে মৈজ্জি (Sabine Moitzi), বয়স ২৫, বিবাহিত। মাঝেসাজে গোপনে প্রস্টিটিউট হিসেবে কাজ করত।

এর ঠিক তিন দিনের মধ্যেই, ২৩-শে মে পাওয়া যায় আবার এক তরুণীর মৃতদেহ। কারিন এরুগ্লু (Karin Eroglu), একইভাবে মারা হয়েছে তাকে। এ’ বাদেও ছিল আরও দুই যৌনকর্মীর নিখোঁজ হওয়ার খবর — সিলভিয়া সাগ্লা (Silvia Zagler), রেগিনা পেম (Regina Prem)। তাদের লাশ সামনে আসতে তখনও বাকি ছিল। এর মধ্যে গল্পে এক রোমাঞ্চকর মোড় আসে।

ভিয়েনা এমনিতে খুব শান্ত জায়গা। সেখানে এমন পরপর যৌনকর্মীদের উধাও হয়ে যাওয়া ও তারপর খুনের ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই চাঞ্চল্য বাড়ে। ভিয়েনা বনের আততায়ী (Vienna Woods Killer) — শিরোনামে বহু খবর হতে থাকে, আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ব্যাপারটা। পুলিশ বাদেও রিপোর্টাররা বিষয়টা নিয়ে নিজের নিজের মতো জিজ্ঞাসাবাদ, অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। এমন সময়ই পুলিশ হেডকোয়াটারে চিফ ম্যাক্স এডেলবাহা-কে (Max Edelbacher) ইন্টারভিউ করতে সেখানে গিয়ে পৌঁছায় স্বয়ং জ্যাক আন্টারউইগার। সেটা ছিল ৩-রা জুন, অর্থাৎ কারিনের লাশ পাওয়ার ঠিক দশ দিনের মাথায়। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে জ্যাক জানায়, সে একজন ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার। সেখানকার বিখ্যাত রেডিও অনুষ্ঠান ‘জার্নাল প্যানোরামা’-তে হালের এই বিষয়টা নিয়ে একটা স্টোরি করছে। তার মাসি একজন যৌনকর্মী ছিলেন, যিনি তাঁরই কাস্টমারের হাতে খুন হন। সেই মাসির থেকে বেশ্যাদের থাকা-খাওয়া রকম-সকম অনেক শিখেছিল জ্যাক। মাসি মারা যাওয়ার পর সে বুঝেছে কী যন্ত্রণায় কত সমস্যার মধ্যে দিয়ে এই যৌনকর্মীদের জীবন কাটাতে হয়। তার এই অভিজ্ঞতার জন্যই তাকে এ’ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রেডিওর পক্ষ থেকে।

এই বিষয়টা বেশ মজার — জ্যাক কোর্টে বলেছিল বটে যে মার্গারেটের মধ্যে সে নিজের মাকে দেখতে পেয়েছিল আর তাই রাগ ক্ষোভ সব মিলিয়ে আক্রমণ করেছিল তাকে, কিন্তু পরপর সমস্ত যৌনকর্মীদের খুন হয়ে যাওয়া তা-ও আবার যৌনতার সময়, কোথাও গিয়ে তার মাসি আন্নার খুনকে মনে করিয়ে দেয়। যাই হোক, জ্যাকের স্টোরি দু’ দিন পর রেডিওতে সম্প্রচার হয়। বাকি লোকের সাথে পুলিশ চিফ ম্যাক্স-ও তা শোনে।

ইন্টারভিউ এর পরপরই রাত্রিবেলা ডিনার টেবিলে বউয়ের কাছে সে’ প্রসঙ্গ তোলে ম্যাক্স। অস্ট্রিয়ায় ‘জ্যাক’ নামটা তার কেমন বেমানান ঠেকছিল। ম্যাক্স এর স্ত্রী অবাক হয়।

“সে কী তুমি জ্যাক আন্টারউইগারকে চেনো না?”

“না। মানে যতটুকু সে বলল, ততটুকুই। কে সে?”

“এখানকার খুব নামী সাহিত্যিক। এক বেশ্যাকে খুনের কেসে যাবজ্জীবন হয়েছিল। পনের বছর জেল খেটে প্যারোলে ছাড়া পেয়েছে… এই তো গেল বছরই। জেলের মধ্যে থাকার সময়ই জ্যাক লেখালিখি শুরু করে। ওর আত্মজীবনী নিয়ে একটা সিনেমাও হয়েছে।”

বৌয়ের কাছে এবং তারপর পুরোনো পত্র-পত্রিকা থেকে জ্যাকের সম্পর্কে সমস্ত তথ্য জানতে পারে ম্যাক্স।

সাত দিন পর জ্যাক, ম্যাক্স এর অফিসে আবার আসে তার সঙ্গে দেখা করতে। জানায়, পরদিন সে লস অ্যাঞ্জেলেস যাচ্ছে সেখানকার অপরাধ ও আইন নিয়ে একটা স্টোরি করতে। এই সূত্রে সেখানকার অনেক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে হবে। ম্যাক্স-এর পরিচিত কোনো অফিসার সেখানে আছে কিনা জানতে চায় জ্যাক।

লস অ্যাঞ্জেলেসে জ্যাকের আত্মজীবনীর ওপর দ্বিতীয় সিনেমা নিয়ে প্রযোজকের সাথে কথা বলার ছিল। যদিও পাকা কথা হওয়ার আগেই জুলাইয়ের মাঝামাঝি সেখান থেকে ফিরে আসে জ্যাক।

জ্যাকের আত্মজীবনী নিয়ে ১৯৮৮-তে বানানো সিনেমার পোস্টার

তার কিছুদিন পরেই, ৪ঠা আগস্ট, এত মাস ধ’রে নিখোঁজ সিলভিয়া স্লাগার লাশ পাওয়া যায়, ভিয়েনা থেকে মাইল পাঁচেক দূরের জঙ্গলে। ভিয়েনাতে যখন এই সব হৈচৈ চলছে, তাদের কোনো ধারণাও নেই লস অ্যাঞ্জেলেসে কী চলছে তা নিয়ে। সেখানেও অনুরূপ ভাবে খুন হওয়া তিনটে লাশ নিয়ে নাজেহাল সেখানকার পুলিশ ডিপার্টমেন্ট, ডিটেকটিভ ফ্রেড মিলার (Fred Miller)… প্রত্যেককে তারই ব্রেসিয়ার গলায় জড়িয়ে মারা হয়েছে। মাত্র চোদ্দ দিনের মাথায় তিনটে খুন। প্রথম ১৯শে জুন, কুড়ি বছরের কলগার্ল শ্যানন এক্সলে (Shannon Exley), এর ঠিক ন’ দিনের মাথায় তেত্রিশ বছরের আইরিন (Irene Rodriguez), পাঁচ দিন পর শেষ-খুন শেরি লং (Sherri Long)… সূর্যগ্রহণ দেখতে যাওয়া মানুষেরা তার লাশ দেখে — সেটা ১১ই জুলাই ১৯৯১।

একটা বিষয় ভাবার মতো — জ্যাক প্রথম খুন করে মার্গারেটকে, ১৯৭৪… যার জন্য গ্রেপ্তার হয় ১৯৭৬-এ। এই দু’ বছরে জ্যাক আর কতগুলো খুন করেছে? আরও একটা খুনের অভিযোগ তার ওপর ছিল বটে, কিন্তু তা কোর্টে প্রমাণ হয় না। ফলে সব মিলিয়ে তার খুনের সংখ্যা এক কী বড়জোর দুই। কিন্তু সেই আন্টারউইগারই প্যারোলে ছাড়া পাওয়ার পর দেড় বছরের মাথায় এগারোটা খুন করে। কেন? এটা কী দীর্ঘ দিন জেলে বন্দী থাকার কারণে? ছাড়া পাবার পর, খোলা জল-হাওয়ার বিভিন্ন সজীব সমীকরণ মিশে যাচ্ছিল তার অনুভূতির অঙ্কে — তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল খুনের জন্য? ঠিক যেমন কোন মানুষ শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ হলে বা মন খারাপ হলে বলা হয় কোথাও থেকে ঘুরে আসতে, যাতে সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলো আবার নতুনভাবে শুরু করতে পারে, অনুভব রিনিউ করতে পারে।

শিল্পীরাও হঠাতই এরকম খোলামেলা পরিবেশে এলে, তাদের কাজের পরিমাণ বেড়ে যায়। বহু লেখককে দেখেছি, দীর্ঘদিন রাইটার্স ব্লক চলছে, বাইরে বেড়াতে গিয়ে প্রচুর লেখা নিয়ে ফিরল। বেড়াতে গেলে আমিও সচরাচর বেশ কিছু নতুন লেখা নিয়ে ফিরি। তবে এ’ বিষয়টা সবচেয়ে বেশি করে বুঝেছিলাম যেবার ট্রেনে পায়ের তিনটে আঙুল ভাঙলো। বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছি, প্যাসেঞ্জাররা চোখেমুখে জল দিচ্ছে, ধরে দাঁড় করাচ্ছে। একেকবার জ্ঞান ফিরছে আবার চলে যাচ্ছে, আবার দেখছি নতুন দৃশ্য — হয়তো প্রথম দৃশ্যে বসে আছি, পরেরবার আমার জুতো খুলছে, তার পর হয়তো আমায় একটা ফাঁকা সিটে শুইয়ে দিয়েছে। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা — আলোর তরঙ্গক্রমে যেন আমি ক্ষণিক ঘটছি, ক্ষণিক মিটে যাচ্ছি।

[পা-১ (অংশ) /কাব্যগ্রন্থ – লোকটা পাখি ওড়া নিয়ে বলছে]

“আলোয় সমূহ পাই

তার দেরি, গ্রিনারির ঘুম…

হঠাৎ হঠাৎ এই পৃথিবীতে এসে পড়া

এক পক্ষীরাজ সেলাই আমার শেষ হয় না”

[পা-১ (অংশ) /কাব্যগ্রন্থ – লোকটা পাখি ওড়া নিয়ে বলছে]

তারপর সেই নার্সিং হোমের দিনগুলো, আমার অপারেশন। যখন অপারেটেড হচ্ছি, কোমর থেকে পায়ের নিচ অব্দি অজ্ঞান, মাথায় শেষ যে বোধ রেজিস্টার্ড তা অনুযায়ী বোঝা যাচ্ছে — বেডে আমার পা শোয়ানো, অথচ ঝাপসা চোখে দেখছি — আমার পায়ের জায়গা থেকে আর একটা পা মতো কী যেন বার করে ডাক্তাররা কেমন সব ছেনি হাতুড়ি ঢোকাচ্ছে। বড় অদ্ভুত সেই অনুভূতি, যে অঙ্গ নিজের ব’লে চিনি, বাকি দেহের সঙ্গে তার লেগে থাকার যে বোধটুকু ছোট থেকে অভ্যাসে, সেই বোধই যেন বিপদগ্রস্ত। আমি কী করব? নিজের পায়ের সঙ্গে নিজেরই সম্পর্ক রইল না যে! — “আর সেখানেই আমার পা-কে রেখে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম

খাদের ধারে দাঁড়িয়ে, যদি ভাবি

পিছনে পশুচারণ জমি

তা এক রূপকের ফ্যান্টাসি…

আর সেখানেই আমার পা-কে রেখে

আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

এখন যে কোন ডাক

জিভের গাজনে এসে চুপ হয়ে যায় —

হো হো ঝোলা

নাগরদোলা

সূঁচ থেকে ত্রিশূলে

পশুচারণ উগরে দেয় জমি…

খুব রাতের শান্ত বেসিন

তাকে মা ভাবা,

এক উপমার ফ্যান্টাসি

[পা-৫]

ফিরে আসার পর প্রায় দুমাস, বিশাল এক তিনতলা বাড়িতে সারাদিন-সারাক্ষণ একা — নিচ তলার এক ছোট্ট খাটে বন্দি। পাশে জানলা। শুধু সকাল বিকেল কাজের আর রান্নার লোক আসে। কেমন ক’রে চ’লে ফিরে বেড়ান একটা অস্তিত্ব হঠাৎই এক স্থির জানলার বোঝাপড়া হয়ে যায়…

“জানলার ফ্রেম জুড়ে দেশ খেলছি সারাদিন

রঙিন সুতোয় কাঁপা নদীর ধারণা…

শ্রীনিবাস রাস্তা শোনে

পা শোনে স্টেথোস্কোপ দিয়ে”

[পা-৩ (অংশ)]

এর মধ্যে ওই অবস্থাতেই একদিন এক কাণ্ড ঘটল। বাথরুমে ক্রাচ স্লিপ ক’রে উলটে পড়লাম, ঠিক যে পা-টা ভাঙা সেই পায়ের ওপরেই। সে এক আজব অবস্থা। ওপরে কল থেকে টপ-টপ ক’রে জল পড়ছে, আর আমি মেঝেতে ত্যারাক্যাচরা। অদ্ভুত এক পার্স্পেক্টিভ থেকে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে ভাবছি, ছিটকানো জলের লেভেলে নেমে এসেছি। আর কোনো চান্স নেই। কুটি-কাঁটা দিয়ে যা-ও বা সাজিয়েছিল পা-টা — সবই গেল। পায়ের ভিতর যেন ধাতব প্লেটগুলোর নড়াচড়া টের পাচ্ছিলাম।

“ধাতব আদর জমে শীতে

মুহূর্তের আলোয় বোবা হারেম

আমায় কষ্ট দিচ্ছে

নতুন ক’রে পালটে দিচ্ছে পা…

যেন অনেক উঁচুর থেকে পড়তে পড়তে

এ’ পৃথিবীর সময় হয়ে যাব”

[পা-৪ (অংশ)]

সবটা মিলিয়ে, এ’ আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন এক জগত ছিল। যেন আমার চারপাশের শিরা উপশিরায় কবিতা-কিলবিল। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম।

সেই চেনা সবুজ…

তার ফাঁকাগুলোয় অ্যাপ্রন গুঁজে

ডাক্তার ও নার্স গুঁজে

আমি আজ সেরে উঠব দোতলায়।

যেন ফিসফিস দুলছে হাড়গোড় —

অফ সিজনের ঘুম জুড়ে

মনে হচ্ছে

এ’ আলোর জিন্দাবাদ হয়ে বাঁচি…

 

পা থেকে বয়ে যাচ্ছে অন্নপূর্ণা,

আমি তার শান্ত ছেলে

ভাতের পেটো মেরে

দক্ষিণ ঘাপলা করেছি শরীরে

[পা-২]

সিলভিয়ার মৃতদেহ পাওয়ার পরপরই বেশ কিছু ঘটনার মধ্যে দিয়ে জ্যাকের গ্রেফতারির প্লট বোনা শুরু হয়।
  • মার্গারেট হত্যা রহস্যের সমাধান যে অফিসার করেছিলেন তিনি ততদিনে রিটায়ার্ড। তিনি এবার ভিয়েনা পুলিশকে পরামর্শ দেন, খুনগুলোর পদ্ধতিগত কারণে, জ্যাক এর ওপর বিশেষ নজর রাখতে।
  • গ্রাজ এবং ভিয়েনা পুলিশের মধ্যে তথ্যের আদানপ্রদান ঘটে। জানা যায় একই ধরনের খুন দু’জায়গায় হয়েছে, পাশাপাশি সময়ে।
  • জোয়ানা (Joanna) নামে এক 19 বছরের যৌনকর্মী পুলিশকে এসে জানায়, তাকে গ্রাজ থেকে একজন লোক গেল-বছর অক্টোবরে এক বিএমডব্লিউ-তে তুলেছিল, যার নাম্বার প্লেট — W JACK .. প্রসঙ্গত, এটা ছিল জ্যাকের গাড়ির নাম্বার। জোয়ানা আরও জানায় তাকে গাড়িতে করে শহরের বাইরে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হতে বলে লোকটা। তারপর মাটিতে মাথা নিচু করে শুতে বলে। তার কব্জিতে হ্যান্ডকাফ লাগায়। যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকে জোয়ানা। যত সে চিৎকার করে ততই যৌন আনন্দে গোঙায় লোকটা। পরে গাড়ি ক’রে তাকে ফেরত পৌঁছে দিয়ে যায় গ্রাজে। মেয়েটির বলা সময়-ক্ষণ অনুযায়ী, এটা গ্রাজে প্রথম খুন হওয়ার কয়েকদিন আগের ঘটনা। জ্যাকের ছবি দেখে তাকে সনাক্ত করে জোয়ানা।

মার্গারেট ট্রায়ালের সময়ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জ্যাকের মানসিকতার এই দিকটি নিয়ে জানিয়েছিলেন। জ্যাক ছিল ধর্ষকামী বা স্যাডিস্ট, নিপীড়ন তাকে যৌনভাবে উত্তেজিত করত। আর সেই উত্তেজনাকে সাজাত-গোজাত, যত্ন করত তার আত্মরতিমূলক উগ্র নাটুকে স্বভাব।

ভিয়েনাতে জ্যাকের বিরুদ্ধে সন্দেহ বাড়তে থাকলে, সে লস অ্যাঞ্জেলেস পালায় — কিন্তু সেখানেও ডিটেকটিভ ফ্রেড মিলারের হাতে ধরা পড়ে। ১৯৯২ এর ২৭শে ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হয় জ্যাক।

আখেরে সব খেলাই একসময় থেমে যায়। জানা যায় কীভাবে বিভিন্ন দেশে মহাদেশে খুন করে বেরিয়েছে সে। তাকে কোন দেশের কোর্টে তোলা হবে তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। সেবছরই ২৮-শে মে তাকে অস্ট্রিয়ার হাতে তুলে দেয় আমেরিকা।

১৯৯৪ এর ২০শে এপ্রিল। হিটলারের জন্মদিন। শেষ অব্দি কোর্টে মামলাটা এসে পৌঁছায়। অস্ট্রিয়ান প্রেস এই কেসের নাম দিয়েছিল — শতাব্দীর সেরা মামলা। এর আগে অস্ট্রিয়ার ইতিহাস এমন কোনো আন্তর্জাতিক মানের অপরাধীকে কাঠগোড়ায় তোলেনি, যার বিরুদ্ধে তিনটে দেশে হত্যার অভিযোগ, দেশ মহাদেশ পেরিয়ে যে মামলায় সাক্ষী-সাবুত আসছে।

১৯৯৪ সালের জুন মাসে গার্জের কোর্টে বিচার শুরু হয়। নিজের সাফাইয়ে আন্টারউইগার যুক্তি দেয় যে, সে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, টাকা-পয়সা রয়েছে… এবং এই সবকিছুই সে অর্জন করেছে ভীষণ অসভ্য অপরাধময় এক জগত থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিশোধন ক’রে… সভ্য জগতের এক সদস্য হয়ে উঠে, খামোখা খুনের সাথে জড়িয়ে নিজের সব অর্জন নিজের হাতেই সে ধ্বংস করবে কেন? কিন্তু এই যুক্তি খুব একটা গ্রাহ্য হয় না। কারণ ততদিনে মনরোগ বিশেষজ্ঞরা জেনে গেছেন যে, জ্যাক শুধু এক স্যাডিস্ট, নার্সিসিস্ট খুনিই নয় — সে কমপালসিভ সিরিয়াল কিলার। তার স্নায়ুর প্রচ্ছন্ন অলিগলিতে যে খুনের চাহিদা, খোঁজ — তার লাগাম তার নিজের হাতেও নেই। আসলে, স্যাডিস্ট মানুষদের মূল চাহিদা কেবলমাত্র কাউকে নিপীড়ন করাই নয়, বরং নানাভাবে তাকে অধিকার করা, শক্তি প্রয়োগ ক’রে তাকে নিজের অধীন করা। যাতে তার সমস্ত অস্তিত্ব, তার জীবনের সবকিছু সে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর, কারো জীবনকেই বন্ধ ক’রে দেওয়ার চেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণ তার জীবনের ওপর আর কী হতে পারে? তাই স্যাডিজমের চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে খুন করার এই তীব্র ইচ্ছা অনেকের মধ্যেই দেখা গেছে — এ’ যেন শেষ ও চূড়ান্ত দখল করা কাউকে।

বিচার চলাকালীন বেশ কিছু সাবুত পেশ করা হয় যা খুবই শক্তিশালী প্রমাণ ছিল জ্যাকের বিরুদ্ধে। যেমন সবক’টা দেশে পাওয়া লাশের গলাতেই ফাঁস লাগানোর ধরণ ছিল এক। ব্লাঙ্কা বোকোভার চুলের টুকরো জ্যাকের বিএমডব্লুর সিটে পাওয়া গিয়েছিল। লাশের গা থেকে যে লাল সুতোর রোঁয়া সংগ্রহ করা হয়েছিল তা মিলে যায় জ্যাকের স্কার্ফের সাথে।

যদিও আন্টারউইগার তখনও নিজের দোষ অস্বীকার করে চলেছিল, কেস চলতে চলতে ক্রমশ সে সমর্থন হারাতে থাকে সমস্ত মানুষের — বিশেষত প্রেস ও সাহিত্য সমাজের, যারা তার পাশে এতদিন অব্দি ছিল।

১৯৯৪ সালের ২৮শে জুন কোর্ট জ্যাককে দোষী সাব্যস্ত করে। মোট নটা খুনের দায় প্রমাণ হয় — প্রাগ, লস অ্যাঞ্জেলেসের তিনটে খুন এবং অস্ট্রিয়ার পাঁচটা। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে।

একমাত্র আন্টারউইগার নিজে বাদে তার পাশে তখন আর কেউ ছিল না। নিজের সপক্ষে সে বারবার বলছিল, যদি খুনের আসল অপরাধীকে না ধরা যায় তাহলে শুধু যে একজন ভুল মানুষকে শাস্তি দিয়ে তার ওপর অন্যায় করা হচ্ছে তাই নয়, শাস্তি না দিয়ে অন্যায় করা হচ্ছে একজন আসল অপরাধীর ওপরেও, যে এখন আড়ালে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।

একদিক থেকে ভেবে দেখতে গেলে কথাগুলো পুরোপুরি ভুলও নয় — অন্তত রূপকধর্মী হিসাবে। অপরাধময় এক অতলে জন্ম তার, মার্গারেটের খুন থেকে শুরু ক’রে বিখ্যাত সাহিত্যিক, সমাজের উঁচু তলার এক গণ্যমান্য হয়ে ওঠার জন্য কম মেধা কম অধ্যাবসায় দেয়নি জ্যাক… কিন্তু এই এতসবের পরেও কোথাও সেই ‘আসল খুনি’ লুকিয়ে ছিল তারই ভিতরে। যাকে শাস্তি দেওয়া জ্যাকের হাতে ছিল না। জ্যাক তো নিজেরই অন্তরমনের নানা বিক্রিয়ার কাছে অসহায়।

পরদিন, ২৯শে জুলাই ভোর ৩টে ৪০ মিনিটে তাকে তার জেলের ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পাজামার দড়ি আর জুতোর ফিতে ব্যবহার ক’রে বানানো ফাঁস। যে পদ্ধতির গিঁট সে ব্যবহার করত ফাঁস বানানোর জন্য, যা দিয়ে সে এতকাল এতজনকে খুন ক’রে এসেছে, সেই একই গিঁট নিজের জন্যও দিয়েছিল জ্যাক।

মৃত্যুর প্রতি তার তীব্র আকর্ষণ এখানেই এসে থামে। তার দেহ ঝুলছিল, নিজেরই শিরার ফাঁদে ফেঁসে যাওয়া মানুষের মতো, নিজেরই ম্যানারিজমের জালে আটকা পড়া ক্লান্ত কোনো শিল্পীর মতো।

(১) ভিন্নমতে, ১৯৫০।

(২) যদিও কোর্টে আন্টারউইগারের দেওয়া জবানবন্দী অনুযায়ী তেরেসা ছিল এক যৌনকর্মী। বার-ওয়েটার থাকা অবস্থাতেও বাড়তি রোজগারের জন্য যৌন-সম্পর্ক খুব একটা অসম্ভব বা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

সূত্র:

  • Unterweger, Jack | Information researched and summarized by Chelsea Newton & Tiffany Waller, Department of Psychology, Radford University
  • The Vienna Woods Killer: A Writer’s Double Life | John Leake
  • Michael Newton – An Encyclopedia of Modern Serial Killers – Hunting Humans
  • Unterweger, Jack | Richard Bevan | The Crime & Investigation Network
  • Murderer’s ‘final freedom’: The bizarre life of Jack Unterweger, poet and killer of prostitutes, ends at his own hand | Independent | Report of Sunday 3 July 1994
  • murderpedia.org
  • wikipedia.org
  • imdb.com
  • abebooks.co.uk

 

[লেখাটি মধ্যবর্তী পত্রিকার শারদ ২০১৯ সংখ্যায় পূর্বপ্রকাশিত ]