সোমনাথ ঘোষাল-এর গল্প

Spread This

সোমনাথ ঘোষাল

বিশু ঠাকুর   

 

এমনিতে বিশু ঠাকুর জল চিবিয়ে খায় না। কিন্তু ভাবে জলটাও চিবিয়ে খাবে। এই শহরের বুকে আর দশটা অতি সাধারণ মানুষের মতন। বেঁটে বলাই ভালো। যৌবনে গাঁট্টাগোট্টা। এখন ষাট পেরিয়ে এসেও  নিজেকে লুকিয়ে রাখে। যেন বয়স হয়নি। আজ অব্দি শখ কী কী কেউ  জানে না। কথাবার্তা বেশ খারাপ। থুতু দিয়ে টাকা গোনে। তাই গান্ধী খুব একটা সঙ্গে থাকে না! খুব নোংরা ভাবেই থাকতে ভালোবাসে। কারোর সঙ্গে বনিবনা নেই বলে, দীর্ঘ বছর ধরে একা থাকে। সবাই থেকেও একা। বউ বাচ্চা থেকেও একা। একা একতলা বাড়িতে থাকে। একজন মালিক  আছে। তার ওখানে কাজ করে। মালিকের ব্যবসা। খুব কম টাকা। ওই  মেরে কেটে চার পাঁচ। এতে চলে না। যদিও বিশু ঠাকুরের একটা ব্যবসা আছে। পুজোর ব্যবসা। পুরুতগিরি করে দিন চলে। পঞ্জিকা  মতে যে যে দিন পুজো সেই সেই দিন অফিস ডুব। তাই মালিক টাকা বাড়ায়নি। একটা অবৈধ চুক্তি আছে। ছোটবেলায় সেজো কাকার সঙ্গে যজমান বাড়িতে গিয়ে গিয়ে ঠাকুর সম্পর্কে হাতেখড়ি। প্রথমে জোগাড়ে। তারপর আস্তে আস্তে এই বাজারে প্রবেশ। যদিও গঙ্গা পেরিয়ে, গলায় পৈতে পরে  দোকানে দোকানে ফুল ফেলতে হয়নি। খাঁটি বামুনের ছেলে। তারওপর ঘটি। সেজো কাকার সাজিয়ে দেওয়া যজমান বাড়ি থেকে, বাড়ি সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। সেই সময়  কেউ একজন বলেছিল, যে এই লাইনে খুব একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে নেই। একটু ময়লা থাকতে হয়। যাতে  ঠাকুর মশাইয়ের প্রতি মায়া জন্মায়। তাই দুখী দুখী ভাব নিয়ে  জীবন চলছে। যদিও বিশু ঠাকুর মাছ মাংস সবই খায়। যজমান বাড়ির বাইরে একদম একটা আলাদা মানুষ। সব সময় লড়ে করে নেব এই মনোভাব। সেই ছোট থেকেই মার্কেটে চড়ে খেয়েছে। মোটামুটি আঁট ঘাট কাঁঠালি কলা সব জানা। পয়সা টিপে টিপে চলে। ভিখারিকে দুটাকা দিলে একটাকা  নিয়ে নেয়। পারিবারিক জীবনে নারায়ণ না গনেশ সেটা তারাই ভালো জানে। গাঁট বলাই ভালো। বয়স বেড়ে যাবে বলে, এখনও চশমা পরেনি।

 
তাই বিশু ঠাকুর একা। সবকিছুই বন্ধ। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। দুপুরে ডিম ভাতে ভাত খেয়ে বসে আছে। আসলে মনটা খুব ভালোই ছিল। কিন্তু অভিমান জমে শ্যাওলা পড়ে গেছে। এখন একা থাকতে খুব ভয় পায়। এই বাস্তব জীবনের সঙ্গে নিজেকে অনেকটাই গুলিয়ে ফেলেছে । জানলা দিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা আসে। পাঁজি দেখতে থাকে। এ বছরের সব পুজো গেল। কেউ আর পুজো করবে না! টাকা কোথায় পাবে? ঠাকুর তো পালাল। নাহলে আমার এই হাল হয়। চাকরিটাও মনে হয় থাকবে না! কীভাবে চলবে? বিশু ঠাকুর কোনো উত্তর পায় না! জানলার দিকে বোকার মতন তাকিয়ে থাকে। বহুযুগ আকাশ দেখেনি। বৃষ্টি দেখেনি।  নিজে যে বাড়িটায় থাকে সেটাও দেখেনি। ভেবেছিল একটা ঘর হবে। যেমন সবার হয়! কিন্তু বিশু ঠাকুর তো ভেঙে যাবে তবুও মচকাবে  না…!
 
 
অমাবস্যা না পূর্ণিমা কালকে কি? ঠিক মনে করতে পারছে না। বারবার ডান পা ধরে টানছে একটা খুব পুরনো জং লাগা আমুল স্প্রের কৌটো। তাতে কিছু পয়সা আছে। বালের পয়সা। কি হবে পয়সা? কার কাজে লাগবে! কৌটোটা লাথি মারতেই বিশু ঠাকুরের ঘুম ভেঙে যায়। শাঁখের আওয়াজ। বিশু ঠাকুর চুপ করে বসে থাকে। দেখে মাটিতে কিছু খুচরো পয়সা পড়ে আছে। বিছানাতেই ডেবোডাকনা সব এক জায়গায়। দুটো ঘর হলেও সারা বছরের যজমানির কাজে যা পায় তাই জমিয়ে রাখে।  ভালো ভালো ফল মিষ্টি নিজে না খেলে আশপাশে দিয়ে দেয়। আর যেগুলো শ্রাদ্ধবাড়ির কাজের জিনিস কেউ নেয় না, সেগুলো নিজেই  খায়।  বাকি চাল ডাল সব্জি থাকে। আবার থাকেও না! চলে যায়। কিন্তু জামা প্যান্টের পিস থেকে আরম্ভ করে তোষক বালিশ চাদর  গামছা আরও অনেক কিছুই জমতে থাকে। ঘরময় বোঁটকা গন্ধ। পুজো বাড়ির শাড়ি হলে কেউ নেয় নাহলে রেখে দেয়। যদিও বিশু ঠাকুরের যা যজমান তাতে ঘটি ডোবে না! তাই ছুটির দিন দেখে কালীঘাটে বাঁধাধরা কিছু দোকান আছে, সেইখানে শাড়ি পঞ্চাশ থেকে ষাট। গামছা কুড়ি টাকায়   বেচে দেয়। ভালো ভালো অনেক জামা কাপড় থাকলেও সেগুলো পরেও দেখেনা। হয়তো কোনোদিন বাচ্চা দেবে! আসলে দীর্ঘ বছরের অভ্যেস  হয়ে গেছে। ওই ময়লা থাকা। বিশু ঠাকুরের ছেলে এখন  অনেক  বড়। মামার বাড়িতেই থাকে। মায়ের সঙ্গে। ছেলেকে মাসে মাসে টাকা পাঠায়। মোটামুটি যতটা সম্ভব পাশে থাকে।
 
 
চৌবাচ্চায় জল ভরছে। কল থেকে। জামা কাপড় কাচবে। একটা হাতকাটা গেঞ্জি আর নীল বারমুডা। গেঞ্জিটা বেশ কালো হয়ে গেছে। ছেঁড়া। বাড়িতে অনেক নতুন গেঞ্জি আছে। কিন্তু রাখা থাকে। কারণ জানতে চাইলে বলে, ধুর কী হবে? কে আর দেখছে! লাল লাইফবয় সাবান মেখে স্নান করে। মাথাতেও সাবান দেয়। কাচা জামা কাপড় ছাদে মেলে, একটা ধূপ জ্বালিয়ে কী সব বলে ওঠে… করলা, আলু আর কুমড়ো ভাতে  দিয়ে ভাত খেয়ে, বাসন মেজে ঘরে আসে। বিভিন্ন জায়গায় খুচরো  পয়সা আছে। গুনতে থাকে। টাকা বিছানার তলায়, আলমারিতে,  ঠাকুরের তাকে রাখে। শুয়ে শুয়ে রেডিও শোনে। দেশলাই কাঠি দিয়ে কান খোঁচায়। খানিকপর ঘুমিয়ে পড়ে। ক্যালেন্ডার থেকে একটা জ্যান্ত  শিব নেমে আসে। গলায় সাপ নেই। টেবিলের পাশে একটা চেয়ার তাতে ময়লা সব জামা কাপড়। তারওপর বসে পড়ে। একটা বিড়ি ধরায়। বিশু ঠাকুরকে দেখতে থাকে। কান মুলে দিয়ে বলে কি রে গেঁড়েচোদা ধোন ধরে ঘুমোচ্ছিস! এদিকে আমি এলাম কী মারাতে? শোন উঠে পড়। আমার খুব খিদে পেয়েছে। কতদিন না খাইয়ে রাখবি বাল? বিশু ঠাকুর অকাতরে ঘুমোচ্ছে। শিব কী করবে বুঝতে না পেরে, কলা খেতে শুরু করে। পচা  কাঁঠালি কলা। মাটিতে এককোণে ছিল। তারপর জানলায় ঝুলে ঝুলে বলতে থাকে, হে হারেক মাল সাড়ে ছ’টাকা… হারেক মাল সাড়ে ছ’টাকা… ও দিদিভাই ও দাদাভাই প্রচার গাড়ির সামনে আসুন নিয়ে যান আসল কলা। আমার কলা। সবার কলা। জ্যান্ত শিব ক্যালেন্ডারে ঢুকে পড়ে। জানলা ঝাপসা থেকে স্পষ্ট হয়। বিশু ঠাকুর পাশ ফিরে নাক ডাকে।
 
 
মুখে মাস্ক পরে আলু পিঁয়াজ ডিম আনতে বাজারে যায় বিশু ঠাকুর। আজ পয়লা বৈশাখ। একটু কাটাপোনা কেনে নিজের জন্য। দুবেলা হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে সাবান দিয়ে জামা কাপড় কেচে স্নান করে নেয়। বাড়িতে বিশেষ পুজো করে না। ধূপ দেয়। আসলে বিশু ঠাকুরের কাছে এটা একটা পেশা। এই লাইনে অনেক মাল আছে। যারা ঠাকুরের ব্যবসা করে ভালো কামিয়েছে। যে যেমন পারে খিঁচে নেয়। বিশু ঠাকুর যদিও  খুব একটা পোক্ত নয়। মানে বুদ্ধি কম অথচ নিজেকে চালাক ভাবে। বোকাচালাক বলাই ভালো। এমনিতে খুব ভীতু। এই লক  ডাউনের সময় কোনোরকমে চার লিটার কেরোসিন তেল জোগাড় করেছে। তাও ব্ল্যাকে কিনে। বাড়িতে গ্যাস নেই। স্টোভে মাছ আর ভাত  করেছে। ভাতে আলু দিয়ে। এই করতেই দুপুর তিনটে। সকালে চিঁড়ে আর বাতাসা  খেয়েছিল। বেশ খিদে পেয়েছে। কোনোরকমে খেয়ে বাসন মেজে বসে। আগে গুটখা খেত। দাঁতের সমস্যা হওয়ার পর এখন মাঝেসাঝে খৈনি খায়। শখে বিড়ি বা মদ। তাও না। বারমুডা পরে খালি গায়ে, একটা চাদর চাপা  দিয়ে শুয়ে পড়ে। টিভিটা খারাপ। তাই বাড়িতে সময় কাটছে না। জীবনে আনন্দ উত্তেজনা বিনোদন কিছুই ছিল না! যৌবনে টুকটাক মেয়েদের  সঙ্গে ভাব করেছিল। গ্রামের দিকে। আত্মীয়দের বিয়ে বা অনুষ্ঠানে। তখন যেমন হত। সে সব গল্প। হয়ত কোনো গোপন প্রেম ছিল। সেটা আর টেঁকেনি। চল্লিশের পর বিয়ে হয়। কিছুদিন সংসার। ছেলে। ওই আইবুড়ো খণ্ডন। দুজনের ক্ষেত্রেই! তাই বিশু ঠাকুরের যৌনতার কোনো পুজো নেই। বাচ্চা জন্ম দেওয়া ছাড়া। কিছু মানুষ থাকে যারা এতকিছুর  সঙ্গে মানিয়ে নেয়, তারা আর নিজের আশপাশের সঙ্গে মানাতে পারে না! একা হতে হতে চিটেগুড়ের মতন হয়ে যায়। পাশবালিশ জড়িয়ে শুয়ে থাকে। বিয়ের সময় নিজেই বর সেজে খুব আনন্দ পেয়েছিল। হাজার হোক যার কাজ বিয়ে দেওয়া, সে আর বর সেজে কতদিন থাকবে!  দেয়ালে ছেঁড়া লক্ষ্মীর ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিচে দেয়ালে অনেকদিনের পুরনো স্টোভের কালি জমে চিটচিটে অবস্থা। যেন বহুদিন ধরে ভাতের মন্ত্র লিখে গেছে! প্রতিটা মন্ত্র খুব স্পষ্ট উচ্চারণ করে যায় খিদের। সেই খিদে যেমনই হোক। ভাতের মধ্যেও শরীর থাকে। পেটে ভাত পড়লে যেমন শরীরের ইচ্ছে জাগে। তাই রোজ একটু একটু করে খিদের মন্ত্র লিখে যায় রান্নার কালিগুলো। যেন ছেঁড়া ক্যালেন্ডারের লক্ষ্মী  শাড়ির আঁচল আলগা করে, হাতপা ছড়িয়ে ভাত খাচ্ছে। বিশু ঠাকুর ভাবে এরপর কি খাবে! পড়াশোনা তেমন জানে না। না জানে সংস্কৃত উচ্চারণ। অবাঙালি পুরোহিতদের মতন তেমন প্যাকেজ নেই। টোল  পাশ করা পুরোহিতও না। বিশু ঠাকুর ছেঁড়া লক্ষ্মীর দিকে তাকিয়ে  থাকে। এতবছর ধরে যজমানি করছে। কিন্তু এত ভয় কোনোদিন পায়নি। কীভাবে বাঁচবে! চলবে কীভাবে! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কান্নায়। বিশু ঠাকুরের চোখ লেগে যায়।
 
 
সন্ধ্যের শাঁখের শব্দ আসে। গায়ে হালকা জ্বর। শাঁখের আওয়াজ আর ঘণ্টার শব্দ জড়িয়ে ধরে। ঘরে তেমন আলো নেই। পাশের বাড়িতে পুজো  হচ্ছে। বিশু ঠাকুর কোনোরকমে উঠে ধূপ জ্বালায়। ছেঁড়া লক্ষ্মীর সামনে হাঁটুমুড়ে বসে কাঁদতে থাকে। ভাবে সব শেষ হয়ে গেল। লক্ষ্মীকে কাঁচা খিস্তি মারে। আরও ছিঁড়ে দেয় লক্ষ্মীকে। দেয়ালের কালিগুলোকে হাতদিয়ে তুলে তুলে মাখতে থাকে সারা গায়ে। ভাবে আর কোনো ভয় নেই। জ্বর সেরে যাবে। বিশু ঠাকুর দেয়ালের সমস্ত খিদের মন্ত্র গায়ে মাখতে থাকে… আর কোনোদিন যাতে বিশু ঠাকুরের খিদে না পায়। বাইরে ভীড় করে থাকে সমস্ত খিদের দল। ধূপধুনো। ঘণ্টা। শাঁখের  আওয়াজ। বিশু ঠাকুর চিৎকার করে খিদের মন্ত্রপাঠ করতে থাকে।
 
খিদে… খিদে… খিদে…