অমৃতা চট্টোপাধ্যায়-র ভ্রমণ কাহিনী

Spread This
Amrita Chattopadhyay

অমৃতা চট্টোপাধ্যায়

একটি ডায়েরি
অথবা ব্যক্তিগত ভ্রমণ

কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিক। প্রথম কটা মাস কেটে গিয়েছিল স্বাধীনতা উদযাপন করতে করতে ( আমি engg college-এর hostel এ ছিলাম)। তারপর ধীরে ধীরে স্বাধীনতার গভীরতা মাপতে গিয়ে দেখলাম পায়ের নীচে মাটি নেই। অতি প্রিয় রুমমেট অপরাজিতা shift হয়ে গেছে পাশের রুমে। আমার রুমের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। একফালি জানলা দিয়ে দিন বা রাত ঘরে আসতো। বিশ্বাসকে সেদিন মাটি চাপা দিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস ফিরে ফিরে আসে। বিশ্বাস করতে ভালোবাসি আমি। ঠিক যেমন বরফ ঘেরা ট্রেক পথে বার বার লাঠিকে বিশ্বাস করি পরের পা ফেলার আগে। যদিও বা পা কখনো ঢুকে যায়, অঙ্কের বাইরে। 
আজকের এই করোনা ময় অবস্থা শুরু হওয়ার আগে একটা ব্রেক নিয়েছিলাম রোজের রুটিন থেকে। 
কেদারকন্ঠ ট্রেক। চারদিন হাঁটা। 12500 ft আমরা ৭ জন। Team lead অভিজিৎ। অভিজিৎ ছাড়া কাউকে চিনি না। দেরাদুন স্টেশন এ মিট করে ১০ ঘন্টা রোড ট্রিপ টু সাঁকরি। একটা ছোটো জনপদ। কোনো মোবাইল টাওয়ার নেই। শান্তি পেলাম। আমার আর প্রকৃতির মাঝে কেউ থাকবেনা কিছুদিন। আমি- প্রকৃতি আর আরো আরো গভীরে যাওয়ার আহ্বান। প্রচণ্ডভাবে উত্তেজিত। সম্ভোগের আশায়। এই প্রথম হয়তো একান্তভাবে আদর পাব বা আদর করতে পারব। সাঁকরিতে প্রথম রাত কাটলো দোল পূর্ণিমার চাঁদ আর সাদার নেশায় বুঁদ হয়ে।
 

শুরু হলো পথ চলা।

১ – ব্রেকফাস্ট করে হাঁটা শুরু হলো এই সকাল ১০টা নাগাদ। বাঁধানো পিচের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। ১০ মিনিট পর হুট করে শুরু হলো জঙ্গলের পথ। আগের দিন রাত পর্যন্ত বেশ বৃষ্টি হয়েছে। পাথরের রাস্তা, জল আর মাটি মিশে হড়কানো কাদাময়। এখানে নিঃশ্বাস এতোটাই সাবধানী যে পরমুহূর্তে না পিছলে পড়ার সাক্ষী হচ্ছে প্রতিবার। পাথরের দুপাশ দিয়ে কিছু কিছু সময় নদীর মতো জল বয়ে চলেছে নিচে। আশপাশ দেখতে হলে হাঁটা থামাতে হয়। আমরা শহুরে মানুষ। Multitasking- অভ্যাস করানো হয়। কিন্তু সেদিন হাঁটতে হাঁটতে দেখাকে- হাঁটা ও দেখা করতে হয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলাম শহুরে আদিমতা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। 
৪ ঘন্টা পর এই পড়লাম- এই পড়লাম পথ সামলে পৌঁছলাম 1st halt station। চারদিকে বরফের চাদর। পাইন গাছগুলো মেরুদণ্ড সোজা করে নীলের দিকে চেয়ে। সাদার প্রান্তে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রঙ মেলান্তি টেন্ট, ছোটবেলার Poppins এর কথা মনে করিয়ে দেয়। আর exact pop art কে রিফ্লেক্ট করে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি যা কিছু আর্ট ফর্ম, কালার কম্বিনেশন, ক্রিয়েটিভ ডিজাইনস সব কিছুর মূলে এই প্রকৃতি। আমি প্রকৃতিকে যত চিনব, যত দেখব, যত জানব আমার ক্রিয়েশন তত প্রাকৃতিক, তত জীবন্ত, তত কাছের হয়ে উঠবে। কিন্তু এর বিপরীতে পার্থদার কথাও বার বার মনে হয়। সত্যি কি আমাদের নতুন কিছু করার আছে? সবই তো এই প্রকৃতি। 
আকাশের মতো ক্যানভাস আর কী হতে পারে? আর সেখানে কিভাবে প্রতি মুহূর্তে লাইভ পেইন্টিং হয়ে চলেছে… 
 
আজ রাত্রিবাস এই Poppins এর মধ্যে গুটি মেরে।
সোমনাথ আসেনি। পাহাড়ে ও ভাল লাফায়। তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে চলে এক পাথর থেকে আর এক পাথর। সাদা পাহাড়কে চুমু খাওয়ার স্বপ্ন ওর অনেক দিনের। কিন্তু তবুও আসেনি। এবার পায়ের তলার সরষে ঝেড়ে মুছে বসন্তের রোদে দিয়েছে। 
 

শুরু হলো পথ চলা।

২ – হাঁটা শুরু হবে ব্রেকফাস্ট করে এই ১০টা নাগাদ। ব্রেকফাস্টে  ব্রেড, কলা, মাখন আর গরম চা। 
আমাদের গাইড চন্দ্রমোহন জি, সবাইকে একজোড়া লাল আয়তাকার একহাত লম্বা, velco লাগানো একটা জিনিস ও কাঁটা কাঁটা আর একটা জিনিস দিয়ে গেল। 
ঐ লাল আয়তাকার বিষয়টি gaiters ও কাঁটা কাঁটা ব্যাপারটাকে crampon বলে। gaiters জুতো থেকে হাঁটু অব্দি মুড়ে দেয়। যাতে বরফ না ঢোকে জুতোর মধ্যে। আর crampon জুতোর তলায় পড়ার জন্য। পা’কে শক্ত বরফে আটকে রাখে এটি।
শুরু হলো। প্রথমবার সাদা বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছি। চারদিকে ঝকঝকে আলো। আলো কাচের মতো স্বচ্ছ। তোর আর আমার মাঝখানে একপর্দাও দূষণ নেই। তোকে কত শুদ্ধ কত পবিত্র লাগছিল ঐদিন। 
এই আধঘন্টা হেঁটে পৌঁছলাম জুদা কি তালাব। একটা লেক- একটা ফ্রোজেন লেক পাশে দুটো গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো বেন্ঞ্চ। আর একটু ওপরে একটা চায়ের দোকান।
লেকের পিছনে পাইন বন হাতছানি দিয়ে একটু জিরোতে বললো।
 
চিত্তরঞ্জন থেকে ফেরার পর, বাবা রোজ অফিস না গিয়ে অ্যাটাচি নিয়ে আউট্রাম ঘাটে একটু জিরোতে যেত। 
গঙ্গার ছলাৎ ছলাৎ শুনতো। হাওড়া ব্রিজ দিয়ে হাস্যকর গাড়িগুলোর ইঁদুর দৌড় দেখত। বাবার হাসি পেতো। গঙ্গার হাওয়া ওড়াতো বাবার চুল, শান্তি দিতো, বাবা শান্তিকে সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সারাদিনে একপ্যাকেট বাদাম, একটা একটা করে খেয়ে। সময় নেই- সময় নেই বাক্স থেকে নিজেকে বের করতে পেরেছিল। বাবাকে দেখে আমার ভালো লাগতো। বাবার তাড়া ছিলোনা কোনো। এই গেলো গেলো ভাবটা না থাকা- আমাকে শান্ত হতে শিখিয়েছে।
 
আরো দুঘন্টা হেঁটে পৌঁছলাম কেদার কন্ঠ বেস ক্যাম্প। আমাদের ৭ জনের গ্রুপ আর একটা ৫ জনের গ্রুপ। মোট ৫টা টেন্ট আর ৩ জন গাইডদের তরফ থেকে। 
নিজেরাই tent pitchকরলাম। শিখলাম কীভাবে tent pitch করতে হয়। বিভিন্ন খাপে খাপ গুঁজে বেশ কিছু chain টেনে বা খুলে, দড়িগুলো প্রাণপনে টেনে, nails দিয়ে বরফে গেঁথে দিলাম।  রাতের আস্তানা তৈরী। সাদা ক্যানভাস এ পাঁচটা হলুদ টুপটাপ। 
বেস ক্যাম্প থেকে দূ………রে দেখা যাচ্ছে কেদার কন্ঠ পিক । সাদা- সাদা- সাদা- প্রচন্ড উজ্জ্বল। সানগ্লাস ছাড়া দৃষ্টি প্রায় ঝলসানো।
পারবো তো? সবাই ভাবছে। অভিজিৎ আমার দিকে তাকিয়ে। একবার চোখের পলক ফেলল আর ঘাড়টা হালকা নাড়ালো। কখনো কখনো বন্ধুর এইটুকু জেসচারই বর্ডারলাইন ক্রস করিয়ে দেয়।
 
লকডাউন এখনো চলছে। বাড়িতে বন্দী থাকতে থাকতে রোজকার রুটিন কেমন যেন পালটে যাচ্ছে।
সত্যি যেন-
ঘিলু ফাটার আঁশটে গন্ধ- সদ্য খোলস ছাড়া স্যাঁতস্যাঁতে শরীর- ফিরে ফিরে আসা নিশির ডাক- 
তলিয়ে নিয়ে চলেছে প্রাচীন যোনি পথে।
সূর্যের আলোয় ভয় পেতে শুরু করেছি।
রাত, আরো- আরো- আরো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে আমাকে।
ছিলাম কেদারকন্ঠ বেস ক্যাম্পে। আজ রাতের বেলা ঘরে বসে সেই দিন স্বপ্ন লাগে। 
 
শুরু হলো পথ চলা।
 

৩ – সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করে ঐ হলুদ আস্তানায়, বরফের বিছানায়। মানে এবড়োখেবড়ো বরফের ওপর টেন্ট তার ওপর ম্যাট ও স্লিপিং ব্যাগ। সারফেস আনইভেন হওয়ার জন্য যতবারই শুতে যাই, ঢালুর দিকে গড়িয়ে প্রায় টেন্টের দেওয়ালে গিয়ে ঝুলতে থাকি। সারা রাত বসে অপেক্ষা ফাইনাল ডে-র।
রাত ২:৩০, গরম ডালিয়ার পায়েস খেয়ে হাঁটা শুরু হলো। কেদারকন্ঠ summit এর জন্য। 
দোল পূর্ণিমার রাত। আকাশে সেই চাঁদ মুখ। যার জন্য আমি সারাটা বছর অপেক্ষায় থাকি। রূপালী আলো ঝরে পড়ছিল আমার শরীরে। আর বার বার মেখে নিচ্ছিলাম আমারই ছন্দে। বরফের চাদরের ওপর তুলি বোলানো স্বপ্ন মায়া। তার মধ্যে মাঝে মাঝে সোজা দাঁড়িয়ে থাকা পাইন গাছের ছায়া আরো রহস্যময়। – চাঁদের আলোর ছায়া।
 
একবার ঐ পূর্ণিমার চাঁদ দেখবো বলে ছুটেছিলাম তাজপুর। আর সেটা ছিল গুরুপূর্ণিমা। আমি ও সোমনাথ। আমাদের এরকম হঠাৎ ছোটার বেশ কিছু গল্প আছে। সন্ধে হয়ে এসেছিল। আকাশে চাঁদ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বসেছিলাম সমুদ্রের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে একটা মাছ ভাজার ঝুপড়িতে। সঙ্গে চলছিল old monk । হঠাৎ বিশাল আলোক গোলোক যেটাকে এতক্ষণ অবজ্ঞা করে যাচ্ছিলাম রাস্তার পাশের কোনো রিসর্টের বিরাট আলো বলে- সেই চাঁদ আমাদের দেখে হেসেছিল সেই দিন। একটা ঝাউ বনের মধ্যে দিয়ে আমাদের রিসর্টে ফেরার রাস্তা। সেই দিন ঐ ঝাউ বনের ছায়া মাটিতে দেখেছিলাম, চাঁদের আলোয়। 
ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক রহস্যময়তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। হাত ধরা ছিল সোমনাথের। চাঁদের আলোয় সোমনাথকে সেদিন আরো শান্ত লাগছিল। সেই অসীম শান্তি আজও লেগে আছে ঠোঁটে। 
 
চাঁদের আদরে লুটোপুটি খেয়ে পাইন এর আলো ছায়ার রহস্য ভেদ করে হেঁটে চলেছি summit এর পথে। ধীরে ধীরে রূপালী মায়াজাল সরিয়ে একটা লালচে আভা দেখা দিল পূবের আকাশে। ঘড়িতে ৫টা ৩০, summit দেখা যায়  ঐ। পা আর চলছে না। খাড়া পথ বরফে ঢাকা। অক্সিজেনের মাত্রা কমতে শুরু করেছে। আর মারণ হাওয়া যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে তেপান্তরে। তাপমাত্রা এতোটাই কম, যে চোখের পাতায় জমে যাচ্ছে গুঁড়ো গুঁড়ো বরফ। কেমন যেন থম মেরে যাচ্ছি। শুধু বুঝতে পারছি থামলে চলবে না। চলতে হবে। আর মাঝে মাঝেই অভিজিৎ এর চোখ বন্ধ করে হালকা ঘাড় নাড়া মনে পড়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে এক একবার মাথা উঁচু করে দেখে নিচ্ছি summit এর চূড়া। 
পিছন থেকে রাজার গলা- ‘ অউর থোড়া’। সামনে একটা বড়ো পাথর। বেয়ে উঠতে হবে। চন্দ্রমোহন জি সাহস দিলো। পাথরটা পার হয়ে দেখি আমাদের ৭ জনের মধ্যে যারা (৪জন) আগে পৌঁছে গিয়েছিল- তারা দাঁড়িয়ে। 
বাকিদের অপেক্ষায় আর উৎকণ্ঠায়। আমাকে দেখে অভিজিৎএর চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল। ধীরে ধীরে সবাই পৌঁছল। – সেদিন যে কিছু একটা অ্যাচিভ করার আনন্দ হয়েছিল, সেটা টিমের একজনও যদি না পৌঁছত, তাহলে হতো না। সেদিন সত্যি বুঝেছিলাম – ‘ যতদূর জ্যোৎস্না পড়ে- সবাই সবার আত্মীয়।‘
আমরা পেরেছিলাম। আমরা সবাই পেরেছিলাম। আমরা সবাই সবার জন্য পেরেছিলাম। 
 
শেষ হবে পথ চলা। 

১ – summit তো হলো, এবার নামার পালা। ঐ প্রচন্ড হাওয়ায় যেখানে একমুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়ানো যাচ্ছে না, সেখানে দাঁড়িয়ে যেই ভাবছি যে, ওঠার রাস্তা দিয়ে নামবো, তখনই আত্মারাম খাঁচা ছেড়ে পালাচ্ছে। হঠাৎ চন্দ্রমোহন জি কোথা থেকে দৌড়ে এসে বললো- চলিয়ে।‘ বলে অন্য একটা দিকে নেমে যেতে শুরু করল। ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলাম। একটু এগিয়ে দেখলাম, চুড়ান্ত slope এর সামনে দাঁড়িয়ে। চন্দ্রমোহনজি বার বার বসে পড়ে স্লাইড করতে বলছে। 
সেকি? বরফের মধ্যে দিয়ে স্লাইড করে নামবো? মেন্টাল ব্লক কাটাতেই পাঁচমিনিট চলে গেল। মোহনজির পীড়াপীড়িতে পড়লাম বসে। হুড়হুড় করে এগোতে থাকলাম- মানে স্লাইড করে পড়তে থাকলাম। আমার আগে রাজা। তার আগে কিঞ্জল। কিঞ্জল একটু ধীরে ধীরে মানে crampon বরফে আটকে আটকে নামছে সাবধানে। রাজা মাঝে মাঝেই বলছে – ‘দিদি, ব্রেক ‘ তখনই আমি স্পিড কন্ট্রোল করছি crampon বরফে গেঁথে। একটা সময় Slope এতো ঢালু, crampon গাঁথতে গেলে বুঝলাম দু পা চিরতরে ফাঁক হয়ে যাবে। তাই আর স্পিড কন্ট্রোল করার বৃথা চেষ্টা করলাম না। সোজা crampon পরা পা নিয়ে রাজার কোমরে সপাটে এক লাথি। আমার লাথিতে ওদের স্পিড আরো দ্বিগুণ হয়ে গেল। সাঁই সাঁই করে নামতে থাকলাম। দুপাশে সাদা সাদা আর সাদা। মাঝখান দিয়ে হুশহুশ করে নেমে চলেছি আমরা। একটা সময় slope শেষ হলো। তখনো ধাতস্থ হইনি। এক ধাক্কা। সড়াৎ করে আর ২-৩ ফিট এগিয়ে পুরো ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে পড়েছি। পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি অভিজিৎ মাথা নীচে আর পা ওপরে করে শুয়ে আছে। ও ওই ভীষণ slope এ দুবার ডিগবাজি খেয়ে শেষে ঐভাবে নেমেছে। আর আমাকে মাথা দিয়ে গোঁত্তা মেরেছে। শেষ হলো আমাদের ধেড়ে বয়সের স্লিপ খাওয়া।
তারপর শুরু হলো টুকটুক করে হাঁটা। গন্তব্য বেস ক্যাম্প । নামতে নামতে হঠাৎ সেদিন গুঁড়ো গুঁড়ো আকাশ ছুঁয়ে গিয়েছিল আমার চোখ, ঠোঁট, মুখ। সামনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম প্রকৃতির সাদা কালো ছায়াছবি। 
স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ওখানেই যদি ফ্রোজেন হয়ে যেতাম।
কোনো আপশোস থাকত না। নেমে এলাম বেস ক্যাম্পে লান্ঞ্চ করে ফিরে যাওয়া জুদা কি তালাব এ। আজকের রাত ওখানেই কাটানোর কথা। বেস ক্যাম্প ছেড়ে কিছুতেই আসতে ইচ্ছে করছিল না। ঐ হলুদ টেন্ট এ বসে বাইরের স্নোফল সিনেমার দৃশ্যের মতো দেখছিলাম।
তীব্রভাবে প্রেমে পড়ছিলাম আবার। সেদিনের মত ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল বরফের কোলে। 
 
২০০৭ প্রথম চাকরি পেয়েছি। তখনো  কলেজের হ্যাংওভার যায়নি। প্রথম চাকরিতেই এতো সুন্দর একটা সহকর্মীদের গ্রুপ পেয়ে যাব ভাবতে পারিনি। ঠিক কলেজের এর মতো মনে হতো। ৬-৭ জনের একটা গ্রুপ সারাদিন চুটিয়ে কাজের পর হাজিরা দিতাম tandoor park । যার আগে কাজ শেষ, সে গিয়ে রুমাল পাততো T P তে।
একবার ট্রেনিং এ সবাই গিয়েছিলাম দুর্গাপুর। আমার এমনিতে রাত প্রিয়। তাই ডিনার এর পর হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছিলাম। পাশে এসে দাঁড়াল শুভেন্দু। সাদা পাঞ্জাবী আর পাজামা। চাঁদের আলোয় আর ফুরফুরে হাওয়ায় অদ্ভুত মায়াবি লাগছিল ওকে। কি কথা হয়েছিল মনে নেই। শুধু মনে আছে ঐ আবছা আলোয় ওর জ্বল জ্বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ দুটো চোখ। – দূরে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছিল আমায়। 
পরদিন আমার ফেরা। বাকিরা আরো কিছুদিন থাকবে। ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়েছি আমি। হোটেল এর পাশে একটা গ্রাউন্ড পেরিয়ে মেইন রাস্তা। হাঁটতে হাঁটতে কিছু যেন একটা মনে হলো। পিছন ফিরে দেখলাম। শুভেন্দু সেই সাদা পাঞ্জাবী পরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখছে আমার চলে যাওয়া। ঠিক DDLJ এর ঐ দৃশ্যের মতো। 
‘ পলট্‌- পলট্‌ – পলট্‌ ‘
ছোটোবেলা থেকে ভাবতাম লাইফটা ঠিক সিনেমার মতো। আর কিছু কিছু বলিউডি দৃশ্য যে জীবনে ঘটেনি সেটা বলা যাবে না।
সেবার আমরা সবাই গিয়েছিলাম শুভেন্দুর বাড়ি একদিনের জন্য। ওর বাড়ি ভদ্রেশ্বর। হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেন এ যেতে হয়। সারা রাত কাটলো গল্প, গান আর আড্ডায়। পরের দিন আমাদের ফেরা। শুভেন্দু সি-অফ করতে এসেছিল স্টেশনে। আমরা উঠে গেছি ট্রেন এ। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। শুভেন্দু প্ল্যাটফর্ম এ। ট্রেন ছাড়লো। বাকিরা কথা বলছে। আমি শুধু দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ। এক ঝাঁপ। চলন্ত ট্রেন থেকে এক ঝাঁপ শুভেন্দুর কোলে। 
চুড়ান্ত ভাবে FOMO effect ( Fear of Missing Out)। স্টেশনে এক প্ল্যাটফর্ম লোকের মাঝে, সমস্ত সহকর্মীদের সামনে আমি শুভেন্দুর কোলে। 
ঐ মুহূর্তটা- মনে হয়েছিল ঐ মুহূর্তটা। এখনো মনে হয় জাস্ট ঐ মুহূর্তটা। মুহূর্তে যদি বাঁচতে পারি- 
 
ঠিক যেমন আজকের ঐ বেস ক্যাম্পের মুহূর্তটা। ভাসিয়ে দিচ্ছিল আমায়। কিছু না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম আমি। জাস্ট একটা ঝাঁপ। যতদিন আমার ঐ ঝাঁপটা আছে, ততদিন বেঁচে আছি আমি। 
নামতেই হবে নিজের জায়গায়। যতই চাই, বরফের কোলে সাধিকার মতো সমাধিস্থ হব।  কিন্তু এখনো সময় আসেনি। তাই নামতেই হবে সমতলে। এখনো সমান্তরাল কিছুটা পথ হাঁটা বাকি। বেস ক্যাম্পের বেশ কিছু জন একটু আগেই চলা শুরু করেছে। আমরা, যাদের ব্যালান্স করার তাড়া একটু কম, শুরু করলাম সব শেষে। এই দুপুর ১ টা নাগাদ। – আমি, অভিজিৎ, আর রাজা। এদের কারোর কথা আগে ডিটেইলসে বলিনি। বলার সময় হয়নি। অভিজিৎ- একজন সাদামাটা বেঁটে খাটো লোক। ঠিক অমলকান্তির মতো নয়, পেশায় কলেজ এর প্রফেসর। আমাদেরই ব্যাচমেট 2005 পাস আউট- ইষ্ট বেঙ্গল, সাদা পাহাড়, মদ আর লেখালিখি- এই হল জগৎ। ওর জন্যই আমরা সবাই এই ট্রেকটাতে আসতে পেরেছি। রাজা- বয়স এই ২৫-২৬। চুড়ান্ত প্রাণশক্তিতে টইটম্বুর। Go get it type । ফুটবল খেলা চাবুক শরীর। ব্যাঙ্কের  recovary- তে কাজ । অভিজিৎ ওর গুরু।
তো আমরা চললাম সবার শেষে। রাস্তায় বেশ ভালোরকম স্নোফল শুরু হয়েছে। চলতে চলতে ভাবছি। এই স্নোফল যদি বাড়তে থাকে, আর তার মধ্যে জুদাকি তলাবে টেন্টে রাত কাটানো, ঠান্ডা, পাগল হাওয়া, তার ওপরে পাহাড় ভাঙা ক্লান্তি। সবমিলিয়ে বেশ চাপ। পৌঁছলাম জুদাকি তলাব। দেখলাম সেই চা এর দোকানে বাকি টিম বসে আছে, আমাদের অপেক্ষায়। আমরা ঢুকতেই সুমিত বলল- ‘ এই তো, তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। কথা আছে।‘ আমি যা ভাবছিলাম, দেখলাম সবাই তাই ভাবছে। আজ বরফ। টেন্টে থাকা চাপ। সবার চিন্তা আমাকে নিয়ে। আমি কি পারব? পারব কি জুদা কি তালাব এ না থেকে টানা সাঁকরি অবদি নামতে? তাও সন্ধ্যা নামার আগে? আগের দিন রাত ৩টে থেকে হাঁটছি। এখন দুপুর ১টা ৩০। পারবো? সবাই জিজ্ঞাসু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। আমিও নিজেকে প্রশ্ন করে চলেছি। চা এর দোকানের বাইরে হিমেল সাদা চাদর নেমে এসেছে। বললাম- হ্যাঁ, পারব, আবার ঝাঁপ। ঐ মুহূর্তে ঝাঁপ। 
জানানো হলো চন্দ্রমোহনজিকে। মোহনজি পুরো ট্রেকের এক ভরসা। এই ৪০-৪৫ বছর বয়স। টানটান সুঠাম চেহারা। পাহাড় থেকে পাহাড়ে অবলীলায় দৌড়ে বেড়ায় বিভিন্ন গ্রুপকে সঙ্গে নিয়ে। মাসে এক দুবার বাড়ি ফেরা। সাঁকরি থেকে ৪০ কিমি দূরে ছোট্টো গ্রামে মোহনজির ছোট্টো মেয়ে চোখ ভরা অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে নতুন বরফ মাখা গল্পের আশায়। মোহনজি বললো ‘আপ লোগ চলিয়ে- ম্যায় আ রাহা হু পিছে সামান লেকর।‘ 
আমরা সময় নষ্ট না করে হাঁটতে শুরু করলাম। ৭ জনের মধ্যে দুজন বেশ স্পিডে বাকিদের অপেক্ষা না করে নামতে শুরু করেছে। আমরা- আমি, অভিজিৎ, রাজা, কিঞ্জল, তন্ময় বেশ পিছনে। মূলত আমারই জন্য। বরফ রাস্তা শেষ হয়ে শুরু হয়েছে সেই কাদা- পাথর রাস্তা, স্নোফল বৃষ্টির ফোঁটায় পরিবর্তিত। পরের পা কোথায় ফেলব? কোন পাথরের ওপর ফেলব? সেটা ভাবতেই ২ মিনিট সময় লাগছে। আমার কনফিডেন্স, আমাদের গাইড মোহনজি ও নেই সঙ্গে। এনিওয়ে, এইভাবেই ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর রাস্তা গেছে গুলিয়ে। জঙ্গল- পাহাড়- কাঁদা পিছল রাস্তা- ঝিম ঝিম ক্লান্তি- হারিয়ে যাওয়া রাস্তা- সব মিলিয়ে মাথা ভোঁ।
বেশ একটা না শেষ হওয়া পেইন্টিংএর মতো। বার বার আমার শিবপুরের বাড়িতে রাখা একটা গ্লাস পেইন্টিংএর কথা মনে হচ্ছিল। 
 
খুব ভালোবেসে একটা 4ft/ 4ft আয়না কিনেছিলাম। গ্লাস পেইন্টিং করব বলে। শুরুও করেছিলাম ব্ল্যাক আউটলাইন। অর্ধেক মুখ কৃষ্ণ আর তাঁর কাঁধে হেলানো রাধার টলটলে একটা মুখ। ময়ূরকন্ঠী আর সোনালী রঙের খেলা ভাবা ছিল মাথায়। কিছুতেই আর রঙ ঢালতে পারছিলাম না। বছরের পর বছর ঘুরে গেল। রঙ ঢালা হোলো না। ফাঁকা আয়নায়  কালো আউটলাইনে এইভাবেই পড়ে রইল আমার রাধা কৃষ্ণ। সোমনাথ আসার পর শুধু রাধার টিপ-এ টাটকা লাল রঙ ঢেলেছিলাম। বাকি এখনও বেরং। এইভাবেই মেনে নিয়েছি পেইন্টিংটাকে। ওতে এখন আমি নিজের মুখ দেখি। চোখ টেনে কাজল পরি।
 
আজও কি এই হারিয়ে যাওয়া রাস্তা মেনে নিতে হবে? রঙ ঢালার কোনো উপায় কি নেই? একটা কুকুর অনেকক্ষণ ধরে আমাদের সাথে আসছিলো। পাহাড়ে এমন প্রায়ই হয়ে থাকে। কোথা থেকে একটা কুকুর জুটে যায় সাথে। গল্পে বলে, পঞ্চপাণ্ডব যখন স্বর্গের পথে যাত্রা শুরু করে ও একে একে সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকে, শেষে একটা কালো কুকুর যুধিষ্ঠিরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের ঐ দিন এমনই একটা কুকুরের ওপর ভরসা করতে হয়েছিল। কিছু না বুঝে কুকুর যেদিকে যাচ্ছিল, সেই দিকেই আমরা যাচ্ছিলাম। মেনে নিয়েছিলাম গল্পটাকে সত্যি বলে। 
শেষে দূরে নীচে কিছু টেন্ট দেখা গেল। ওখানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। নামলাম। ওরা পথ দেখিয়ে দিল। নামতেই থাকছি। বিকেল ৪:৩০ ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ে চলেছে সারাক্ষণ। ঝুপ করে সন্ধ্যা নামবে। জঙ্গলের রাস্তা কাদা জলে পিছল। ঐ একটা চায়ের দোকান দেখা যায়। পা আর চলছিল না। হাঁটু ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছে। দোকানি বলছে আরো দেড় ঘন্টার রাস্তা। সবাই কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে ঐ চায়ের দোকানে। বিশেষত আমি। অভিজিৎ – এক ধমক দিয়ে, ‘ তাড়াতাড়ি না করলে, সন্ধ্যা নেমে যাবে।‘ আবার শুরু করলাম। পথের প্রতিটা বাঁকে মনে হচ্ছিল, ঐ যেন বড় রাস্তা দেখা যায়। ঠিক ঐ জায়গায় পৌঁছলে, বড় রাস্তা ততটাই পিছিয়ে যায়। আবার নতুন টার্গেট সেট। 
পা জাস্ট আর চলছে না। ক্লান্তিতে মাথা ইনস্ট্রাকশন দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সবাই এগিয়ে গেছে। আমি পিছনে দাঁড়িয়ে সবার চলে যাওয়া দেখছি। কিন্তু পা আর এগোচ্ছে না। 
 
চিত্তরঞ্জন থেকে ফিরে, আমরা হাওড়ায় থাকতাম। আমি, বাবা, মা, দাদু, ঠাকুমা আর কাকু। আমি ছিলাম দাদুর আদরের ছেলে পশুপতির একমাত্র কন্যা টুটুসোনা। আমার প্রিয়জনকে গিফট দেওয়ার স্বভাবটা হয়তো দাদুর থেকেই। দাদুর বাজার থেকে ফেরা মানেই Poppins, Gems, নতুন নতুন পেন, পেনসিল , ব্রিটানিয়া বিলস, চিজলিংস ইত্যাদি ইত্যাদি। আর বইমেলা মানে টিনটিন।
দাদুর সাথে নাতনীর খাস গল্প- আমাদের গ্রাম বিক্রমপুর, ধলেশ্বরী নদী- বেনারস- দাদুর বন্ধু ব্যাঙের সাথে দাদুর সাইকেল শেখা- 
আমার প্রশ্ন – ‘দাদু তুমি তো স্বাধীনতার আগে জন্মেছ, তাহলে স্বদেশী আন্দোলন করোনি কেন?’
দাদু বলেছিলেন – ‘স্বদেশী করেছি তো। ছোটো ছোটো কংগ্রেসের এর পতাকা বিলি করতাম।‘ 
এই উত্তরেই আমি বেজায় খুশি।
এদিকে মা আর ঠাকুমার সমস্যা বেড়েই চলছিল। দাদুকে আমরা না ওরা বেছে নিতে হয়েছিল। সেদিন থেকে আমি আর বাবা দাদুর পার্সে পাশপোর্ট সাইজ ছবি হয়ে গিয়েছিলাম।
আমার গল্পের চাকা ঘোরা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। টক মিষ্টি দিনগুলো কেমন একরঙা মনখারাপী হয়ে যাচ্ছিল। দাদু নাতনির কানেকশনটা থমকে যাচ্ছিল। জাস্ট চলছিল না। হঠাৎ একদিন দরজায় ঠকঠক। দরজা খুলে দেখি আমাদের আগের বাড়ির পেপারকাকু। আমার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বলল, ‘দাদু পাঠিয়েছে।‘ মনটা খুশি হয়ে গেল। প্যাকেট খুলে দেখি DYFI এর একটা গানের ক্যাসেট। 
‘’এখানে থেমো না’’।
দাদু নিজের ভাবনা আর না থামা দুটোই সেদিন পৌঁছে দিতে পেরেছিল টুটুসোনার কাছে। 
হঠাৎ কোথা থেকে চন্দ্রমোহনজি উদয় হলো। বলল, ‘ চলিয়ে’। আর দাদু মুচকি হেসে বলেছিল- ‘এখানে থেমো না’। 
মোহনজির হাত ধরে, আর ওর এক্জ্যাক্ট পদচিহ্ন ফলো করে, শেষ ৫০০ মিটার পথ দীর্ঘ সময় ধরে না থেমে, পৌঁছলাম বড় রাস্তায়। সন্ধ্যা ৬টা সাঁকরি নামলাম। প্রায় ১৫ ঘন্টা একটানা হাঁটা। অতীতের ধাক্কা আর বর্তমানের হাতছানি সব মিলিয়ে শেষ হলো জীবনের প্রথম বরফ ট্রেক।