অজন্তা সিনহা-র ভ্রমণ কাহিনী

Spread This

অজন্তা সিনহা

জয় বাবা বৈদ্যনাথ

পয়লা বৈশাখের ছুটিতে দেওঘর ? ওখানে তো এখন ভীষণ গরম ! লোকজন তো শীতে যায় শুনেছি ! লোকজনের এহেন নিরুৎসাহিত করার প্রক্রিয়া আমার ক্ষেত্রে কখনওই সফল হয়নি,সে তো আমার প্রিয় পাঠককুল জেনেই ফেলেছেন এতদিনে। বেড়ানোর আবার দিন-তারিখ-মাস কী? মন-হাত-পা-ঝোলা রেডি থাকলেই চলো। বলা বাহুল্য, আমার এই মন চাইলেই বেরিয়ে পড়াটা চাকরি জীবনে একান্তই নির্ভরশীল ছিল ছুটির ওপর। বছরের শুরুতেই ক্যালেন্ডার বানিয়ে ফেলতাম। পয়লা বৈশাখের ছুটিটা লম্বা নয়, অতএব কাছাকাছি নির্ঝঞ্ঝাট একটা ট্যুর প্ল্যান করতে হবে। এক ভ্রমণপ্রেমী ভাই বললো, “দেওঘর চলে যাও। ওখানে বালানন্দ ব্রহ্মচারীর আশ্রম আছে, আমার চেনা। থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।” আমি ঘোরতর অধার্মিক। আমায় কিনা বাবা বৈদ্যনাথ ডাকলেন ? একেই বোধহয় বলে ভাগ্যের পরিহাস ! শুধু ডাকা নয়, আরও কিছু ছিল তাঁর মনে, সেসব ক্রমশ প্রকাশ্য।

আপাতত দেবতার ঘরে যাত্রার ট্রেনপর্ব। ঘুম চোখ কচলে দ্রুত রেডি হয়ে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছেছি। হাওড়া-নিউদিল্লী দুরন্ত এক্সপ্রেসে যাব। নামবো জসিডি স্টেশন। ট্রেন ছাড়বে সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে। পৌঁছবে ১২টা ২৫ । অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের জার্নি। বৈশাখের ভোরের হাওয়া গায়ে মেখে নিয়েছি। ট্রেন চলছে দুলকি চালে। যথা সময়ে ট্রেন জসিডি স্টেশনে পৌঁছে গেল। আর নেমেই একেবারে তপ্ত কটাহে ঝাঁপ। তবে, বাতাসে আর্দ্রতা নেই। ঝাড়খণ্ডের মানুষজন দেখলাম খুবই বন্ধুবৎসল। একটি দোকানে গিয়ে অটো স্ট্যান্ডের খোঁজ করতেই দোকানের মালিক দেখিয়ে দিলেন। আগেই জানা ছিল, খুব দূরের রাস্তা নয় দেওঘর। আর রাস্তাও খুব ভালো। অটোচালক ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে দিব্যি চললাম। গরম হাওয়ার হলকা আটকাতে অটোর দুপাশ ঢেকে দিতে চেয়েছিল সে। আমি বললাম, লাগুক গরম, পথের দুপাশ না দেখলে পথে নামার মানে কি? ঠিক হলো সন্ধ্যায় সে-ই আমায় কাছাকাছি অবস্থিত নওলাখা মন্দিরে নিয়ে যাবে।

বৈদ্যনাথ ধাম

আশ্রম ও তার লাগোয়া অতিথিনিবাস দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। প্রচুর গাছগাছালি, ফুলের বাগান, তকতকে নিকোনো উঠোন। সিমেন্টের ঘরগুলি প্রাচীন ধরণের। চওড়া দেওয়াল। লাল সিমেন্টের মেঝে। সেখানেও পরিচ্ছন্নতা সর্বত্র। সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করে টাকাপয়সা জমা দিয়ে নির্ধারিত ঘরে গেলাম। সাদামাটা ঘর। কিন্তু খুব পরিচ্ছন্ন সব ব্যবস্থা। ওই মুহূর্তে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের আরাম পেয়ে সবচেয়ে তৃপ্ত হলাম। বাইরে সূর্যদেব গনগন করছেন। বড় বড় জানালাগুলি এখন বন্ধ। মালবাহক ছেলেটি বললো, বিকেলে খুলে দিলে বাগানের ফুল দেখা যাবে, গন্ধও আসবে ভাসা বাতাসে। খাবারের আয়োজন পাশের বিল্ডিংয়ে, জানিয়ে চলে যায় সে। স্নান করে খাওয়ার জায়গায় গেলাম। এলাহি বন্দোবস্ত। অতি সুশৃঙ্খল। বহু মানুষ একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু কোলাহল নেই। আগত অতিথিরা অনেকেই খাবারের অপেক্ষায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক আসে দেওঘরে। নানা ভাষার এক ককটেল কানে আসছিল। বেশ মজা লাগছিল শুনতে। এরই মধ্যে খাবার ডাক পড়লো। চেয়ার আর লম্বা টেবিল, টেবিলে কলাপাতা, মাটির গ্লাস। মন ভালো করা আয়োজন। নিরামিষ খেতে হবে, আগেই জানতাম। আহা ! এমন স্বাদু রান্না হলে তো আজীবন নিরামিষ খাওয়া যায়। ভাত, ডাল, শুক্তো, ভাজা, সবজির দুটি পদ, চাটনি, দই। সুচারু ও সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ।

নওলাখা মন্দির

একটা নিপাট ঘুম দিয়ে উঠে দেখি বিকেল গড়াচ্ছে। খবর পেলাম সেই অটো ড্রাইভার এসে গেছে। তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে চললাম নওলাখা মন্দিরে। গুরু বালানন্দ ব্রহ্মচারীর পরামর্শে কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা রাজবাড়ির রানী চারুশীলা দেবী ৯ লক্ষ টাকা ব্যয় করে এই মন্দির নির্মাণ করান । এমনও কথিত আছে, অসময়ে স্বামী ও ছেলের আকস্মিক মৃত্যুতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রানী স্বপ্নে দেবীর আদেশ পান ও এই মন্দির নির্মাণ করেন। যাই হোক, ওই নির্মিতির অঙ্ক মেনেই নাম নওলাখা মন্দির। ভারি সুন্দর স্থাপত্য। হালকা লাল রঙের দেওয়াল। দারোয়ানের কাছে জুতো জমা রেখে মন্দিরে প্রবেশ করলাম। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠা প্রথমে। তারপর একটি বিশাল সভাঘর পার হয়ে আর একটি কক্ষে মূল বিগ্রহের অধিষ্ঠান। ভিতরে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ। সন্ধ্যাপূজার আয়োজন চলছে দেখলাম। ওপরেই মন্দিরের চারপাশে সুন্দর একটি অলিন্দ। সেখান থেকে বাইরের প্রকৃতি অনেকটা দৃশ্যমান। সেখানে তখন এক অনির্বচনীয় ছবি আঁকা হচ্ছে। পশ্চিম আকাশে লাল রঙ ঢেলে সূর্যদেব ডুবছেন। আর ঠিক উল্টোদিকে মায়াবী চাঁদ উঠেছে। যেন উঁকি দিয়ে বলছে, সন্ধ্যা নামছে পৃথিবীর বুকে।

তপোবন

ফিরে এসে আশ্রমের ভিতরে যে মন্দির, সেখানে সন্ধ্যারতি দেখলাম। বাইরে শান্ত, সমাহিত পরিবেশ। বাগানে ফুলের দল গন্ধ ঢেলেছে। জোৎস্না মেখে নিয়েছে আকাশ। ইতস্তত ছড়িয়ে মানুষ। কিছুটা ঘোরাঘুরি আশ্রমের মধ্যেই। ঘরে ফিরে গল্পের বইয়ের পাতা উল্টানো। বাইরে থেমে যাচ্ছে শব্দরা। এখানে দুপুরের খাওয়া শুধু ওই বড় দালানে। অন্য সময় আমার থাকার ঘরের পাশের ছোট কিচেনে চা, ডিনার, ব্রেকফাস্টের আয়োজন। ডিনারে রুটি-সবজি খেয়ে চললাম ঘুমের দেশে। কাল সকালে যাব তপোবন ও ত্রিকূট পর্বত দেখতে। পরশু বাবার দর্শন। এটা আশ্রমের সেক্রেটারির পরামর্শ। কি একটা তিথি আছে ওইদিন।

বালানন্দ ব্রহ্মচারী আশ্রম

আশ্রম থেকে বের হয়ে পিচের রাস্তা ধরে আমাদের অটো। দু’পাশে খোলা প্রান্তর, তালগাছের সারি, মাঝে মাঝে প্রাচীন বট, অশ্বত্থ, ইতস্তত জঙ্গল ফেলে এগিয়ে চলেছি। সকালের ফুরফুরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। একটু পর রাস্তাটা বাঁক নিতেই একটা অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য। দুধারে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ। লাল লাল ফুলে সূর্যের কিরণ পরে ঝলমল করছে। ওই পথ ধরে আর একটু যেতেই তপোবন। অনেকটা উঁচু পাহাড়ের উপর শিবমন্দির। আর রাম-সীতার কাহিনিতেও আছে এর উল্লেখ। অর্থাৎ ধর্ম ও পুরাণের সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে এখানে। বেশ মজার নিয়ম। সিঁড়ি দিয়ে ওঠা আর পাহাড় বেয়ে নামা। আমার পক্ষে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ। ভাবলাম ওপরে আর গিয়ে কাজ নেই। পড়ে গেলে বিপত্তি। কিন্তু কে শোনে কার কথা ? একজন গাইড ঠিক করে দিয়েছিল অটো ড্রাইভার ভাই। লিকলিকে চেহারার সেই গাইড একেবারে নাছোড়বান্দা, আমাকে পুণ্য করিয়েই ছাড়বে। ততক্ষণে পাহাড়ের এধার-ওধার থেকে বাঁদর ও হনুমান পরিবারের আনাগোনা শুরু। অনেকেই কলা খাওয়াচ্ছে। রাম-সীতার ভক্তকুল বলে কথা ! যাই হোক, গাইডের হাত ধরে সিঁড়ি তো চড়তে শুরু করলাম। তারপরের কথা অবর্ণনীয়। কোথাও খাড়া সিঁড়ি, কোথাও গুহা, মাথা নিচু করে কোনও মতে নামতে হবে এমন কাঠের ও সিমেন্টের সিঁড়ি। নামার সময় তো আরও কঠিন অবস্থা। স্রেফ খাড়া পাথর। কিছু কিছু জায়গায় চেটানো পাথরের ওপর দিয়ে শুধু শূন্যে ব্যালান্স করে নামতে হবে। বৈশাখের সূর্য আগুন ঝরাতে শুরু করেছে ততক্ষণে। যখন মাটিতে পৌঁছলাম, বিশ্বাস হচ্ছিল না। ওই পাগল মানুষটি আমায় যেভাবে সাহস ও ভরসা দিয়ে পুরো কাজটি সম্পন্ন করতে সাহায্য করলো, তা কোনওদিন ভুলবো না।

এখান থেকে গেলাম ত্রিকূট পর্বত। রামায়ণে এরও উল্লেখ আছে। এখানে কোনও গাইডের ব্যাপার নেই। আর আমিও আর সাহস করলাম না। উচ্চ রক্তচাপের মানুষের জন্য একদিনে একটা তপোবনই যথেষ্ট। ড্রাইভার ভাই বললো, ওপরে মন্দিরে পুজো দেবে, এত কাছে এসেছে যখন। আমি পাহাড়ের ঠিক নিচে একটা দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চে বসলাম। এখানেও প্রচুর বাঁদর, একেবারে দু-আনা, চার আনা সাইজেও আছে। তাদের বিস্কুটের ডিমান্ড পূর্ণ করে আমি আখের রস খেলাম। এই জায়গাটায় প্রচুর গাছ থাকায় এক ছায়াময় আবেশ রচিত হয়েছে। প্রায় একঘন্টা পর ড্রাইভার ভাই হাতে প্রসাদের চাঙারি নিয়ে নেমে এল। আমরা ফেরার পথ ধরলাম। সেদিন বিকেলটা আশ্রমেই কাটালাম।

পরদিন রাত থাকতে উঠেছি। বৈদ্যনাথ দর্শনে যাব। ধর্ম নিয়ে তেমন আগ্রহ না থাকলেও পুরাণ ও ইতিহাসের একটা আকর্ষণ আছে। আশ্রম থেকেই রিকশা ঠিক করে দিয়েছিল। সেই রিকশাচালক একবারে ঘড়ি ধরে ৪টের সময় এসে হাজির। খুব সুন্দর ব্যবহার। মন্দিরে পৌঁছনোর পর গেটে আমাকে নামিয়ে সে রিকশা স্ট্যান্ডে চলে গেল। আমি আশ্রম সেক্রেটারির এক চিলতে কাগজে লেখা চিঠি নিয়ে নির্দিষ্ট পান্ডার কাছে গেলাম। তিনি খুবই সমাদর করে মন্দিরের চাতালে বসার ব্যাবস্থা করে দিলেন। এবারও কিছু পাগলামির কারণ ঘটলো। ‘আমি শুধু বাইরে থেকে মন্দির দেখে চলে যাব। পুজোর জন্য যা প্রয়োজন উনি যেন কিনে দিয়ে দেন। আমি টাকা দিয়ে দেব।’ আমার এহেন বার্তা শুনে পান্ডা মহাশয় প্রায় মূর্ছা যান আর কি ? ইনিও যথেষ্ট নাছোড়বান্দা। পুজো আমাকেই দিতে হবে এবং আমি যেহেতু বালানন্দ আশ্রম থেকে এসেছি উনি আমাকে তাই স্পেশালি শিবলিঙ্গ দর্শন ও স্পর্শ করিয়ে দেবেন। অগত্যা আত্মসমর্পণ।

পুজোর দেরি আছে। আপাতত অপেক্ষা। একটু একটু করে কাটছে অন্ধকার। তার কিছু পরেই সাদা ধবধবে মন্দিরের চূড়ার উপর এসে পড়ল প্রথম রবির কিরণ। চারপাশে অগণিত ভক্ত, দূর দূর থেকে এসেছেন তাঁরা। ঘন্টা বাজছে। ফুল ও ধুনোর গন্ধ। সব মিলিয়ে এক অনির্বচনীয় প্রভাত চাক্ষুষ করলাম। তারপর প্রবল ঠেলাঠেলি করে বাবার মাথা ছুঁয়ে প্রণাম করে মন্দিরের বাইরে। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম আর পেরে উঠলাম না। ফলে ওই হাফ পুণ্য নিয়েই ফেরা। পান্ডা মহাশয় তাঁর দক্ষিণা নিয়ে খুশি হয়ে আবার মন্দিরে। রিকশাচালক ভাই অপেক্ষা করছিল। রিকশায় উঠে তাকে বাবা বৈদ্যনাথের প্রসাদী প্যাঁড়া দিতেই সে একগাল হাসলো। খেটে খাওয়া মানুষের এই হাসি আমি যতবার ঝুলিতে পুরি ততবার আরও ধনী হই। আমাকে আশ্রমে নামিয়ে বিদায় নিল সে। এখন ব্রেকফাস্ট ও একটু বিশ্রাম। কিচেনে পছন্দের ফুলকো লুচি আর সাদা আলুর তরকারি খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে কিছুক্ষণ আলস্য। দুপুরের খাবার পর আবার একটু গড়াগড়ি। তারপর আর একবার নওলাখা মন্দিরে গেলাম। আজ হেঁটেই যাওয়া। একেবারে কাছে। চিনেও গেছি। মন্দিরে ঘন্টা বাজছে। রাধা-কৃষ্ণের সান্ধ্যকালীন সাজ সম্পূর্ণ। কিছুক্ষণ থেকে ঘরে ফেরা।

পরদিন ফিরলাম গরীব রথে। নামেই গরীব, নয়তো বেশ আরামদায়ক। দেবতার ঘরে তিনদিন বসবাসের না ভোলা স্মৃতি নিয়ে ফেরা । দেওঘরে বেশ কিছু হোটেল ছাড়াও আছে রামকৃষ্ণ মিশন ও অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম পরিচালিত অতিথিশালা। কাছাকাছি আছে ময়ূরাক্ষী নদী। বৈশাখে তিরতিরে জল। বর্ষায় রীতিমতো ফুলেফেঁপে ওঠে শুনলাম। বৈদ্যনাথ ধাম ছাড়াও আরও কয়েকটি প্রাচীন মন্দির আছে দেওঘরে। খুব পরিচ্ছন্ন শহর। যেতে সময়ও লাগে না তেমন। আবহাওয়া চমৎকার। জল অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। পাগলের মতো খিদে পেয়ে যায়। এদিকওদিক যেতে কোনও সমস্যা নেই। খরচাপাতি আয়ত্তের মধ্যেই। সব মিলিয়ে শর্ট ট্যুরের জন্য একেবারে আদর্শ দেওঘরে একবার ঘুরে আসতেই পারেন।