শৌভিক কুন্ডা-র ভ্রমণ কাহিনী

Spread This

শৌভিক কুন্ডা

লেবুফুলের গন্ধ
 
 

আমি ফিরে ফিরেই যাই। অথচ  কেউ নেই, কিছু নেই। কেউ বলতে আত্মীয়-বন্ধু। কিছু বলতে নজরকাড়া তেমন বিউটি স্পট! তবু যাই। যাবোও, বারবার। এই যে এখন ঘরে বন্দী সময়, এই যে সবরকম নিয়ম মেনে চলছি, এর জন্য নিজেকে পুরস্কারও তো দেবো! সুতরাং ২৮ বস্তি, আবারও। 

রাজাভাতখাওয়া রেলগেট পেরোতেই  দ্রিমি দ্রিম, এখনো, এই মাঝপঞ্চাশও পার করে আসা বুকের ভেতর। রাস্তায় ময়ূর-টিয়ের ঝাঁক। ডানদিকের  পথ বাঁক নেয় জয়ন্তীর দিকে। আমরা এগোবো সোজা। অল্প এগোলেই ডানহাতে দিগন্তমুখী কাঠের দোতলা। বক্সা ওয়াইল্ড হোম। গাড়ি  নিয়ে আসাই ভালো। এ তল্লাটে এখনো সকালে একবার, আর বিকেলে ফিরতি, এই দু দফায় সরকারি বাসটিই কেবল।

আনলকড
 

খোলা বারান্দায় ডাইনিং স্পেস। হু হু বাতাস খেলা করে। চড়া রোদ, উড়ে ফেরা বৃষ্টি, বা শীতের কামড় সামলাতে বাঁশকাঠির চিক। চোখ মেলে দিলে মাঠ পেরিয়ে পাথরটানা বাঁধ, নদী, পাহাড় আর জঙ্গল। নদী বলতে ঝোরা। ভুটানের পাহাড়ে বৃষ্টি হলে বক্সাঝোরা গর্জাতে থাকবে। শীতের মাঠ আবার গড়িয়ে যাবে ঝোরার ধার অব্দি, সরষে ফুলের হলুদ স্রোত বুকে নিয়ে। মাঠের যে গোলপোস্ট,  তার ক্রসবারটি মধ্যিখানে উঁচু হয়ে থাকে। হাতি এসে পিঠ চুলকে নেয় সেখানে! রোদ ঠেলে কখনো মুঠো মুঠো মেঘ নেমে আসে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। টিনের চালে ঝমরঝমর বৃষ্টি।   সন্ধ্যের লেপচাখায় আলো জ্বলে উঠলে মনে হয় হাত বাড়ালেই  হীরের কুচি। এর বেশি আর কি চাই!

তবু বাড়তিটুকুও জুটে যায় ঠিক। মিশে থাকে গোপাল পল্টুর আতিথেয়তায়। গরম ভাত আর মুশুর ডালে চত্বর থেকে সদ্য ছিঁড়ে আনা লেবুর গন্ধে। বক্সাখোলা থেকে ছেঁচে আনা নদীয়ালি মাছের অমৃতস্বাদে। আসবো জেনেই সন্ধ্যের হুইস্কির পাশে শুঁটকির প্লেটটিতে! ছোট্ট অরণ্যগ্রামের হাতেগোনা বাসিন্দারাও বড়ো  সিধেসাদা। শুরুতে বলেছি এখানে আমার আত্মীয় নেই। যা বলি নি,স্বজন আছেন অনেক! গ্রামের একমাত্র ইলেক্ট্রিশিয়ান সোনম। ঘরের লাগোয়া দোকানে মিলে যাবে সোনমের বাচ্চা বউটির মন কেড়ে নেওয়া হাসি। হাসি তো সঞ্জীবের মুখেও ছিলো। সঞ্জীব পাখরিন। সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে গল্প জুড়ে দিত। ভুটানি বীয়ারে চুমুক দিতে দিতে। সময় থাকলে সঙ্গ দিত বার্ড ওয়াচিংএ! শহুরে চোখে অচেনা পাখির খোঁজ পড়তেই উলটে নিতো হাতে ধরা বইয়ের  পাতা। পাখিদের মতই উড়াল দিয়েছে সঞ্জীব। অসময়ে।

আমীর আসে মেয়ে কৃতিকার হাত ধরে। ছোড়দার গল্পে ডুবে যাই তিনজনে। ভুলেই যাই ছোড়দাও নেই আর। যেন এই আশি পেরনো পায়েও টপকে যাচ্ছেন পাহাড়ি পথ, এখনো। বিদ্যুৎ সরকার।  ট্রান্স হিমলয়ান এক্সপিডিশনে প্রথম এশিয়াবাসী হিসেবে রেকর্ড বুকে লেখা আছে যাঁর নাম! আমীরের মুখে শুনি, কৃতিকা এখনো ভুল করে খোঁজে তার ‘দাদু’কে। বিকেল নেভার আগে ঘুরে আসি রাজাভাতখাওয়া পথের  শিবমন্দির থেকে। দু দশক ধরে এ মন্দিরের সেবায়েত হয়ে আছেন স্বেচ্ছায় যে মানুষটি, তাঁর আবাহনও নেই যেমন,  বিসর্জনও তেমনি। বস্তির বাসিন্দারা চাল-ফল দিয়ে যদি যায়, ক্ষুন্নিবৃত্তি। না পেলেও নির্বিকার। নাম জানান না, “এই মন্দিরের পূজারী কইলেই হইবো। সক্কলেই চিনে।” বাড়ির কথাও বলতে নারাজ, “কুথায় নাই বাড়ি? আছে, ফ্যার নাইও! দ্যাহেন না, কত ঘর পইড়া থাহে ফাঁক্কা, থাকনের লুক নাই;আবার কত ঘরে লুক গাদাগাদি করে, থাকনের জায়গা নাই!” সরল সহজ দর্শন!

জয়ন্তী, জয়ন্তী
 

ইচ্ছে হলে ঘুরে একদিন আসা যায় জয়ন্তী থেকে। দেখে নেওয়া যায় পুখুরিয়া পাহাড়, পায়ের জোর থাকলে মহাকাল গুহা। অথবা যাওয়া যায় উল্টো পথের বক্সা ফোর্ট। সেখানে মেঘের বুকে ইতিহাস মেখে থাকে। এ পথেও সান্ত্রাবাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার হাঁটা। কেউ কেউ জিরো পয়েন্ট অব্দি যায়। সান্ত্রাবাড়িতে মোমো খেয়েও ফিরে আসে কেউ কেউ। ফেরার পথে, তৈরী হতে থাকা বৌদ্ধ গুম্ফায় কিছুসময়ের শান্তিকল্যাণ।

ওয়াইল্ড হোমের চত্বর, গেট ছাড়িয়ে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে লেবুর গন্ধ! হাতি নাকি লেবুগাছের ধার ঘেঁষে না। পরিধিঘেরা বার্বড ওয়ারের ভেতরবাগে তাই আবার সে গাছেদের ফেন্সিং। ছোড়দার শেষ ইচ্ছে মিটেছে কিনা জানা নেই। কলকাতার নিজবাস ছেড়ে মাঝে মাঝেই চলে আসতেন আমীর-কৃতিকার আশ্রয়ে। ছোট্ট গুম্ফাটির নির্মাণকাজে নাকি এক লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। সাথে অনুরোধও একটি। গুম্ফার চত্বরে একটা ছোট ঘর। আমৃত্যু থাকতে চেয়েছিলেন।  গুম্ফার পেছনে বক্সাঝোরার ধারেই যেন তাঁকে কবর দেওয়া হয়, এমন ইচ্ছেও জানিয়েছিলেন। আমি ছোড়দা নই। পিছুটান অনেক অনেক। ছাড়াতে পারবো না, জানি। নয়তো চাইতাম, এমন এক লেবুগাছের তলাতেই যেন শোওয়ানো হয় আমার শরীর। সেখানে বাতাসের দোলায় ঘাসের ওপর  লেবুফুলেরা ঝরে ঝরে পড়বে। ঘাস-মাটি চুঁইয়ে লেবুর মাতাল গন্ধ মিশে যাবে থেমে যাওয়া শ্বাসে।