শুভময় সরকার-এর গদ্য

Spread This
Shubhomoy sarkar

শুভময় সরকার

আশ্চর্য- ভ্রমণ, অচেনাকে চিনে চিনে…!

হালফিলে, মানে গত বেশ কিছু বছর যেভাবে সকালগুলো হচ্ছিলো, যেভাবে প্রাত্যহিকতায় জেগে উঠেছিলাম, সেভাবে হচ্ছে না। এইসব ‘হালফিল’- এর ঢের আগে, যখন বাতাসে এত কোলাহল ছিল না, ধাবমান ছিল না পথঘাট, তখন যেভাবে জেগে উঠতাম, সেভাবেই আবার…! সেসময় হাত ছুঁয়ে থাকতো অলসতায়, একেকটায় ছুটির সকাল যেন একেকটা আখ্যান, একেকটা মুহূর্ত সিনেমার ক্লোজশট, একেকটা আড়মোড়া তিস্তার বাঁকে বাঁকে ঘূর্ণির মতো। সেই সব কিছু আবার ফিরে আসছে একে একে! ফিরে আসছে আরও অনেক কিছুই- কিছু মুখ, কিছু স্মৃতিময় সময়, কিছু অভিমানী সন্ধে। পড়ন্ত দুপুর, দুধের সরের মতো নৈঃশব্দের ছায়ায় ছেয়ে থাকা সেইসব দুপুর আমায় একা করে দিতনা কখনো। নিঃশব্দ দুপুরে আলস্যের দিবানিদ্রায় চারপাশ যখন ঘুঘুডাকা বিষণ্ণতায় ঘুমোতো, আমি একা হয়ে যাইনি! কক্ষনো না…!

সর্বজয়ার মৃত্যুর সময়টা মনে আছে? ঐ যে সেই ঘোরের মধ্যে দেখা সব দৃশ্য, অপুর স্কুল থেকে ফেরা…! সেসব ছুটির দিনের বিষণ্ণ স্তব্ধ ঘুঘুডাকা দুপুরে মা আমায় পড়ে শোনাতো সর্বজয়ার শেষদৃশ্যের বর্ণনা। আহ! বিভূতিভূষণ, সেদিন থেকে আপনি আমার কাছে বিষণ্ণতার প্রতীক!

আসলে এই ঘরবন্দীর দিনগুলোতে যেমন দুশ্চিন্তায় আছি কিছুটা, আবার অন্যরকম কিছু ভাবনাও আসছে বৈকি! মানুষের উন্নয়ন নামক ইউটোপিয়ায় আক্রান্ত হবার একটা প্রতিস্রোতও তলে তলে গড়ে উঠেছে বোধহয়! ভয়ংকর এই ভাইরাসময় সময় কেটে যাবে প্রাকৃতিক নিয়মেই, তৈরি হবে প্রতিরোধ, অপেক্ষা কেবল সময়ের, কিন্তু সব কিছু আবার স্বাভাবিক হবার আগেই ভাবনা, উপলব্ধিগুলোকে নিয়ে নাড়াচাড়া জরুরি। বারোয়ারি জীবনে যা হারিয়ে যাচ্ছিলো, সেসব কি ফিরে আসছে তবে পাখিদের মতো, হারিয়ে যাওয়া সেইসব পাখিগুলোর মতোই! এই নিঃস্তব্ধ, একাকিত্বের নির্জন সময়ে ফিরে আসে যারা গৃহস্থের কার্নিশে, সেই বৈকুন্ঠপুর জঙ্গল থেকে। ‘বৈকুন্ঠপুর’ নামটা মনে পড়লেই একরাশ স্মৃতি উগরে দিতে ইচ্ছে হয়। সেই কবে ছোট বয়সে মায়ের হাত ধরে অরুণা টকিজে দেখতে গিয়েছিলাম ‘দেবী চৌধুরাণী’। আহা, মনে পড়ে যায় মিসেস সেনের সেই বড় বড় চোখে তাকানো আর রাশভারী গলায় ডাক- ‘রঙ্গলাল’! ওই দ্যাখো, আবার কেমন ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি, আসলে এখন ইমোশনাল হবার সময় নয়, এটা উপলব্ধির সময়! ইমোশন এখন অদ্ভুত এক বোকামো, এটা শুধু বাস্তবতার সময়। ওসব দুর্বলতা কেনো আবার! দেখছো না, চারপাশটা কেমন ঝাঁ- চকচকে বাস্তবতায় ডানা মেলেছে। তো আবার ফিরে আসি সেই অরুণা টকিজের গল্পে। অরুণা টকিজ তো আসলে কোনো সিনেমা হল নয়; একটা সুদীর্ঘ সময়, সময়ের জলছবি, প্যান্ডোরার বাক্স, খুললেই বেরিয়ে আসে একঝাক দুঃখ…!

মা চলে যাবার আগের রাতটাও তো সেই সর্বজয়ার দুপুরের মতোই কেটেছিল। ঘোরের মধ্যে মা-র চলে যাওয়া। ভোরবেলা বৈকুন্ঠপুর থেকে সেদিনও উড়ে এসেছিল পাখির দল, কার্নিশে বসে জানিয়েছিলো- এ বাড়ির একজন এবার ফিরে যাবে! আমি মা-র অস্থি মিশিয়ে দিয়েছিলাম নদীতে, সাহু নদীর পাড়ে বসে বলেছিলাম- আবার এসো আমার মা হয়েই…! চরাচরব্যাপী স্তব্ধতায় বৈকুন্ঠপুর সেদিন জানিয়েছিল, আমার জন্যও কিছুটা জায়গা রাখা আছে ওখানেই, সাহুর পাড়ে!

মৃত্যু আজকাল বড্ড বেশি ভাবায় আমায়। সে ভাবনায় ভীতি বা আতঙ্ক নয়। সে ভাবনায় বার বার ফিরে আসে সময়! তো আবার ফিরে আসি সেই সকালের ভাবনায়। প্রাত্যহিকতায় ধারাবাহিকতায় এই বন্ধদিন যেন আচমকাই এক ব্রেক! প্রকৃতি সাজিয়ে নিচ্ছে অবিন্যস্ত সময়, নিজের নিয়মে, আপন খেয়ালেই! সিগারেটের ধোঁয়ার কামড়ে আধবোজা চোখ যখন দেখতো তিস্তাকে, আজও কি একইভাবে দেখে? ওই যে তিস্তার স্পারে বসে নানান পরিকল্পনায় মেতে থাকা মন, এখন এতদিন পর, এতো ঝড় সামলে, এতোটা পথ পেরিয়ে বদলায়নি কি কিছুই? তিস্তাও কি বদলায়নি? সময়ের সঙ্গে বদলে নেয়নি একটুও? এসব কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় কিন্তু থাক, তিস্তা তো বুঝতে দেয় না কিছুই! কত শোক, তাপ, আনন্দ, বেদনার স্মৃতি নিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তাবুড়ি! ‘আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে…!’

রাত বাড়ে। লাদেনের গুহার দরজা খুলে যায়। আমি ঢুকে পড়ি নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায়! এখানে এলে আমি বলতে পারি- ‘ না, এখন আমার কোনো অসুখ নেই!’ আসলে তো অদ্ভুত এক অসুখে ভুগছি আমরা সবাই, জটিল জীবনের আবর্তে আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ছে সময়, গর্ভবতী সময়! আর অসুখের প্রকোপে ভেবে নিয়েছি গর্ভবতী সময় বুঝি গলে যায় এভাবেই, ফেরেনা! কিন্তু ফেরে তো! সময় তো আবার গর্ভবতী হয়, এবং যতবার সে গর্ভবতী, ততোবারই আমি পিতা- ‘যতবার তুমি জননী হয়েছে, ততোবার আমি পিতা’!

রাত বাড়ে, বাড়ে নির্জনতা। নিঃস্তব্ধ দুপুরের মতোই ভারী করে তোলে আমাকে। একা থাকি, একাকিত্বে নয়! রাত বাড়ে, লাদেনের গুহায় সে আমার এক আশ্চর্য- ভ্রমণ…! রাত যত গভীর, জীবন ততো বেশি স্পর্শকাতর। ‘আসঙ্গলোভী স্পর্শকাতর ডানা, যারা খুব চেনা, তাদেরও কি ছিলো জানা…!’ এক জীবনে সব জানা হয় না। জানাটা জরুরিও নয়। জানা হয়ে গেলে শেষ হয় সেই আশ্চর্য ভ্রমণ। কবে, সেই কতকাল আগে শুরু হয়েছিল আশ্চর্য ভ্রমণের আখ্যানমালা। সুদূর ঝর্ণার জলে তখন কোনো মার্গারিটা তো দূরের কথা, সামান্য আপাত আলোড়নটুকুও ছিল না, কিন্তু অন্তঃস্রোত তো ছিল বোধহয়, ছিল না কি? নইলে সেসব নির্জন কিন্তু তুমুল দুপুরগুলোতে কীভাবে পাহাড়তলির সেই ফেলে আসা শহরের বাংলোবাড়িতে শুয়ে শুয়ে কাঁচের জানলা দিয়ে এবড়ো-খেবড়ো পাথরগুলোর মধ্যে দেখে ফেলতাম নানান অবয়ব…!

রাত বাড়ে, জমে ওঠে কতো কতো আখ্যানমালা, ভোরের ভ্রমণ! শেষ রাত, চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে ছুটে চলছে আন্তঃরাজ্য বাস, সে ছিল পঞ্চমীর রাত। মাঝপথে যতবার বিরতিতে রাজপথের পাশে কোনো নির্জন সরাইখানায় থেমেছে সেই দুরন্ত বাস, ততোবারই নেমে জোনাকির খোঁজে গিয়েছি আমি! নির্জন, হাইওয়ের পাশে দেখেছি চরাচর জুড়ে জোনাকির উল্লাস। সে রাতের সেই আশ্চর্য ভ্রমণ ছুটে চলেছিল অনন্ত আঁধার চিরে তীব্র আলোয় পথ করে নিয়ে। রাতের গাড়িতে পেরিয়ে যাওয়া প্রতিটি জনপদকে অস্পষ্ট আলো আঁধারিতে দেখে বলেছি- ‘ সে কত পুরনো কথা- যেন এই জীবনের ঢের আগে আরেক জীবন/ তোমারে সিঁড়ির পথে তুলে দিয়ে অন্ধকারে যখন গেলাম চলে চুপে/ তুমিও ফেরোনি পিছে-তুমিও ডাক নি আর; – আমারও নিবিড় হল মন…!’

দূর থেকে সে রাতে ভেসে আসছে আড়ম্বরহীন গ্রামীন পুজোর প্রস্তুতি- সুর। পরদিন ভোরে রাতজাগার দল যখন প্রস্তুতি শেষে ঘুম চোখে বাড়ি ফিরে গেছে, খানিক পর অনাবিল আনন্দে শিশুদের দল ছুটে গেছে মণ্ডপের দিকে নিশ্চিত, মফওলী আনন্দে! অপূর্ণ চাঁদ তখন অস্তমিত ক্লান্তিতে, জোনাকির দল আরও এক আঁধারের প্রতীক্ষায় আর চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে আন্তঃরাজ্য বাসে ব্রহ্মপুত্র- ভ্যালির দিকে ছুটছি আমি, হাওয়ায় কেটে কেটে ভেসে আসছে গান, আহ! কিশোর কিশোর…! ওই তো শেষ রাতে ডানা মেলছেন অমিতাভ, রেখা, মিঠুন, সঞ্জয় দত্ত-রা। ঘুম চোখে ঝাপসা দেখে নিচ্ছি ফিকে হয়ে আসা পুব আকাশ! আজ ষষ্ঠীর ভোর!

রাত জাগা মা আমার শেষরাতের ক্লান্ত ঘুম- চোখে জানালায়! ওই তো দোতলার দক্ষিণের খোলা জানালায় একা দাঁড়িয়ে, উল্টোদিকে বিশাল সবুজ পার্ক, গাছেদের সারি, যেন আমারই অপেক্ষায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাড়ি ফিরছে আত্মজ, হস্টেল থেকে। ক্লান্ত চোখে মুহুর্তে ঝিলিক। লাল- ঘিয়ে রঙের বাসটা থেকে নেমে সোজা হেঁটে যাওয়া…! পেছনে পাহাড়ের পটভূমিতে আমাদের বাড়ি। আকাশ জুড়ে তখন শরৎকাল, একা দাঁড়িয়ে আমার মা। এভাবেই কেটে যায় সময়, সময়ের স্রোত। সময় তখনো গর্ভবতী। বাতাসে তখনো সেসব শোনা কথায় বারুদ- মাখা সময়ের মিথ, গল্পের রেশ! বুঝিনি তখনো, এই বারুদ্গন্ধ পুরোপুরি মিলিয়ে গেলে অদ্ভুত এক নিকষ কালো সময় আসছে। সে সময় জুড়ে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর এক ক্লান্তির আখ্যান নির্মিত হবে। মানুষ বিপজ্জনক ভাবে নিরাপদ থাকবে। থাকবে কি…!

তবে কি আর কিছুই বলার নেই আমার, সেই আশ্চর্য ভ্রমণের কথা…! আখ্যান কি তবে শেষ! নাকি এ এক অনন্ত যাত্রার আখ্যান? হয়তো আবার জমে ওঠা কথার পারগেশন জরুরি হবে, যেভাবে- ‘ … বৃষ্টির পর ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘ এসে/ আবার আকাশ ঢাকে, মাঠে মাঠে অধীর বাতাস। ফোঁপায় শিশুর মতো…।‘