সৌমিত্র চ্যাটার্জী-র ভ্রমণ কাহিনী

Spread This
Soumitra Chatterjee

সৌমিত্র চ্যাটার্জী

অপার্থিব অহলদাড়া
 
পিঁয়াজের দর, সংসারের যাঁতাকল, মেট্রো সিটির কৃত্রিমতা কিংবা ধর্ম আর রাজনীতির প্যাঁচে রক্তে অক্সিজেনের সরবরাহ কম পড়িয়াছে? নার্ভাস সিস্টেম স্বাভাবিক ভাবেই সচল নয়? স্বাভাবিক, খুবই স্বাভাবিক.. সল্যুশন খুঁজে ফিরছেন? বেশী খোঁজাখুঁজির দরকার নেই। রবিবাবু উপায় দিয়েই গেছেন। ” জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো “. করুণাধারা বলতে কে  কি বোঝেন, আমি জানি না। বইপত্র, ঈশ্বর, ধ্যান, পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র, সুরা ইত্যাদি প্রভৃতি নানান  ধারা আছে। কে  কোন ধারার অনুসারী হবেন তা ব্যক্তিগতর পর্যায়ে পড়ে। তবে আমার  ভালোবাসার স্বাদকুঁড়ি ফোটানোর একটা সেফ কাস্টডি আছে, পাহাড়। এতো বৈচিত্র, এতো রসদের অনুপান সহজে মেলে না। যাদের জঙ্গল ভালো লাগে তারা তুলনায় বোধহয় বেশি সেরিব্রাল হন। সবুজ ধূসরে রসদ খুঁজতে তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের সঞ্চারণ অবশ্য প্রয়োজনীয়। পাহাড়ে এতো কিছুর দরকার পড়ে না। আমার মত অল্প মেধা দিব্যি হাঁ করে থাকে শপিং মলের বিপুল সম্ভারে। আসলে পাহাড় নিয়ে লিখতে বসলে বড্ড বিড়ম্বনায় পড়ি। একদিকে আবেগের ফোড়ন মাত্রা ছাড়ায় ঝাঁজে,  অন্যদিকে বিশালতাকে বাগে আনতে ভোকাবুলারির আকুলিবিকুলি।
               আমার মা তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও আমার কাছে এক অসম্ভব গ্রহণীয় চরিত্র। আবেগে ভেসে গিয়ে কোনো মূল্যায়ন নয়। নারী বা মানুষ যে ভাবেই দেখি না কেন,  সময় পেরিয়েও  তোমার সহজিয়া বারবার কড়া নাড়ে আমার বোধের কেন্দ্রে। ঠিক পাহাড়ের মত। যে বিশালতার কোনো ব্যাখ্যা নেই আজও আমার কাছে। নতজানু সমর্পণই একমাত্র রোডম্যাপ। আর সেই রোডম্যাপ ধরে চলতে চলতে আজ আর কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিট করার স্বপ্ন দেখি না।সেসব প্রাগৈতিহাসিক ভাবনা একসময় ছিলো। আজ চটকপুর বা অহলদাড়া-তেই থমকে থাকি। না পাওয়া প্রেম কস্তুরীগন্ধে মুগ্ধতা ছড়ায়। আমি খোলা জানলায় বসে থাকা অমল, সুধার কৈশোরেই  পৃথিবী দেখি।
 
           ছোট্ট একটা ভূমিরূপ, অহলদাড়া ।  না  হওয়া প্রেম, তিতিক্ষা, মুখোমুখি বনলতা সেন কিংবা নগ্ন নির্জনে একলা  দাঁড়ানোর ইচ্ছে  হলে একবার চলে আসুন। মুখোমুখি দাঁড়ান আয়নায়। ডানদিকে নিচে সেই ক্লাসিক সবজে তিস্তা আর বাঁদিকে তিরিশ পঁয়তিরিশ ডিগ্রি ঘাড় ঘোরালে চিরকালীন সিডাক্টিভ কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী জ্যামিতি। হনিমুন কিংবা ঋদ্ধ সন্ন্যাস কোনটা চান? ভিজে ঠোঁট  নাকি ত্রিনয়নে পদ্মাসন? শুধু  প্রাণমন ভরে  অন্তরতম কে মেলে দিন। বাকিটা ম্যাজিক। অনুভূতির খাঁজে খাঁজে বারুদের বিস্ফোরণ।  নীরব অনুরণন আপসে গিটারের টেনে ছেড়ে দেওয়া তারের মত  রিনরিন করে বাজতে থাকবে।
 
           চটকপুর থেকে সকালে বেরিয়ে লাটপাঞ্চার যাবার রাস্তাটা ডানদিকে রেখে আর একটু সামনে এগোতে হোলো। গাড়ি আপনাকে যেখানে নামাবে সেখান থেকে সরাসরি একটা পাথুরে ধূসর রাস্তা উঁচুতে উঠে গেছে। পায়ে পায়ে. দুলকি চালে উঠে যান শীর্ষজমিতে। তিনশো ষাট ডিগ্রীর অপার্থিব দিগন্তের মায়েস্ত্রো আর ফিনফিনে ঠান্ডা হাওয়া আপনাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাবে।মাঝেমধ্যে বয়ে যাওয়া হাওয়ার শব্দ ছাড়া চারদিকে অতন্দ্র নীরবতা। বুক ভরে ভালোলাগার শ্বাস নিতে নিতেই চারপাশে চোখ বোলান। প্রুশিয়ান ব্লু মাখা দিগন্ত, পান্না সবুজ তিস্তা, রুপোলি কাঞ্চনজঙ্ঘা, কালচে শ্যাওলা বনাঞ্চল আর দুধসাদা তুলো তুলো মেঘের মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বান্ধবী কুয়াশা  আপনাকে হালকা আদর করে গেল মুচকি হেসে, টেরই পাবেন না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ঘুগনি বাটি করে পরিবেশন করলে মাথায় একটি লাল লঙ্কা বসিয়ে দিতে ভুলো না যেন। একটু নিচে খানচারেক কটেজের লাল টুকটুকে রুফটপ যেন দৃষ্টির স্বাদকুঁড়িতে সেই রাবীন্দ্রিক জলসিঞ্চন।
 
        এভাবেই সময় বয়ে যাবে তিরতিরে স্রোতের মত। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যুবতী রোদ্দুর অল্প মেদভারিক্কি মধ্যবয়সিনী হবে,  কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথায় প্লিউম এর আঁচড় পড়তে থাকবে সরু থেকে ক্রমশঃ আরও মোটা তুলিতে। নিরাবৃত এক পৃথিবীর প্রেমে যখন আরও সঘন প্রেমিক হয়ে উঠছেন, ভেতরবাড়ি হয়ে উঠছে নিকোনো উঠোনের সাঁঝের তুলসীতলা, দেখবেন “সময়” টার কাছে আরও ঋণী আরও কৃতজ্ঞ হয়ে উঠছেন। একসময় সেই “সময়”-ই আপনাকে বলবে, সময় ফুরিয়েছে. জীবনের সব ভালোই কি বড় স্বল্পস্থায়ী হয় !!
 
           ফেলে আসা মুহূর্তগুলো কাঙালের মত যত টা পারা যায় মুঠোভর্তি করে নেমে আসছি  একটা অবয়ব হয়ে।  ডানহাতের মুঠোয় ধরা আছে একটা  নরম হাত। অবতরণের ছন্দে ঈষৎ চেরীমাখা মাদকতা। লালচে ধুলো ধূসরিত পায়ের ছাপগুলো জুড়ে যেন ভালোবাসার নিটোল ভাস্কর্য। নিচে একটা ছোট চায়ের দোকান। বাইরে পাতা কাঠের বেঞ্চিতে এসে বসি। অল্প  দূরে ড্রাইভার মনিষ জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে অন্যমনস্ক দূরের দৃষ্টিতে। সেদিকে তাকিয়ে বুকের বৈঠকখানায় এতক্ষনের বেজে চলা  সেহেনাই যেন হটাৎই থমকে যায়। আবার তো ফিরে যেতে হবে সেই সভ্যতায়, যেখানে আমার   জন্ম বেড়ে ওঠা। যেখানে আমি  নিজেকে প্রায়শই মেলাতে পারি  না চারপাশের ঘৃণা, অসভ্যতা, নারকীয়তার সঙ্গে। মুহূর্তে মনে পড়ে যায়, হ্যারল্ড ফিউগার্ড এর  “মাস্টার হ্যারল্ড এন্ড দা ভয়েস “
নাটকের কথা। যেখানে উঠে এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতি বিদ্বেষের কদর্য রূপ। সেখানেও মাত্র তিনজন অভিনেতা, একটা চায়ের দোকান, একটা কাঠের বেঞ্চি. এখানেও তাই। একটা শিরশিরে অস্বস্তি শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে যায়। আমার দেশ জুড়েও তো সেই কদর্য্যতার আগুন। পুড়ছে বাস, ট্রেন, ঘরবাড়ি, মানুষের মন।আর কতদিন ধরে নবারুণ গলার শির ফোলাবেন, “এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না “, আর কতদিন চাপা ক্ষোভ, বিষণ্ণতা, নিয়তিনিবিড় অন্ধকারে বেঁচে থাকতে হবে? কবে গড়ে উঠবে  সুস্থ মানুষের পৃথিবী? কবে শেষ হবে অনিকেত অপেক্ষার পর আলোয় ফেরা?
         “সাব, চায়ে লিজিয়ে”, এক রমণীকণ্ঠ ভেসে এলো কানে। দূরে ক্রমশঃ ঢেকে যাওয়া কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে থেকেই হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলাম ডান হাত। পরক্ষনেই মুঠোয় এসে উঠলো উষ্ণতা। একটা নরম সিপ্. ঠোঁট, জিভ, গলা বেয়ে  সর্পিল গতিতে উত্তাপ টা নেমে যেতে যেতেই কানে এলো গিটারের রিনরিন। কর্ড থেকে কর্ডে গাঢ় হওয়ার দিকে এগোচ্ছে মেহেফিল। অহলদাড়া মুগ্ধ নীরব শ্রোতা। তাকাই নি। জানি তো পাশে এসে বসেছেন ফেডেড জিন্স, অল্প চুলো, বসন্তের দাগে ভরা মুখ, ছোট অথচ তীক্ষ চোখের মানুষটি। সময় বইছে, তিনি গাইছেন, ভাসাচ্ছেন, দোলাচ্ছেন, ভরসা যোগাচ্ছেন, “আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি কার তাতে কি? ” এক ‘বিধর্মীর গমগমে গলা দিয়ে সুরভেজা শব্দগুলো ধীরে ধীরে বুকে গালে পিঠে চুলে হাত বুলিয়ে বেড়াচ্ছে।
          অহলদাড়ায় আলো কমছে, উপত্যকার ডানা ডুবছে আবছা আলোয়। কাঞ্চনজঙ্ঘা রুপোলী থেকে লোহিমার দিকে।  ঠান্ডাটা বাড়ছে। গাড়ি চাবি ঘুরিয়ে ফার্স্ট গিয়ারে। ছেড়ে  যাচ্ছি অহলদাড়া, নিয়ে যাচ্ছি বৈদেহী স্মৃতির রসদ। গিটারের শব্দ ক্রমে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর। তবু আশ্বাসের  তীক্ষ্ণতায় ভেসে আসছেন কবীর, ” হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে / দেখা হবে তোমার আমার অন্য গানের ভোরে “
 
          পাহাড়ই সঞ্জীবনী, পাহাড়ই করুণাধারা. ভালো থেকো অহলদাড়া.