অরুণাভ দাস-র ভ্রমণ কাহিনী

Spread This

অরুণাভ দাস

তরাইয়ে আলো-ছায়ার পথে, যেখানে ভারতবর্ষ এখনো ইন্ডিয়া হয়ে যায়নি
 
 
ঝুম বৃষ্টির সন্ধ্যায় বাগডোগরা বিমানবন্দরে অবতরণ। আসলে সন্ধ্যা হতে একটু দেরি হয়তো, কিন্তু আকাশজোড়া মেঘপুঞ্জ চরাচরব্যাপী অন্ধকার ঘনিয়ে আসার বিভ্রম তৈরি করছে। ভ্যাগ্যিস একটাই লাগেজ এবং সেটা কেবিন লাগেজ, পিঠে তুলে দৌড়। গাড়ি অপেক্ষায় ছিল টার্মিনালের বাইরে। তুমুল ধারাপাতের ভেতর দিয়ে শিলিগুড়ি শহরে দাদার বাড়ি পৌঁছই। অসময়ে হালকা শীতের আমেজ অদূরেই পাহাড় ভ্রমণের কত রঙিন স্মৃতি মনে পড়িয়ে দিল। এবার সফর অন্যরকম। দাদা পরিকল্পনা করে রেখেছেন। দুর্গম ও ধসপ্রবণ পাহাড় নয়, ডুয়ার্সের অভয়ারণ্যগুলি তো এখন সরকারিভাবে বন্ধ। এবারে তাই তরাইয়ের হাট ও গ্রাম দেখতে এসেছি। পরদিন সকাল হতেই দাদা-ভাইতে গাড়ি চড়ে চরকিপাক। বেলাকোবার চমচম সহযোগে ব্রেকফাস্ট হুট-সফরে নতুন মাত্রা এনে দিল। আপাতত বৃষ্টি ধরেছে, মেঘলা আকাশের নীচে প্রকৃতির ঝিমধরা শান্তিকল্যাণ।
      বর্ষার শেষ দিকে তরাইয়ের প্রাকৃতিক ক্যানভাস উপচে পড়া সবুজের বন্যা, পোশাকি নাম কাঠামবাড়ি অরণ্য। গাজলডোবায় তিস্তা ব্যারাজ পার হওয়ার পর থেকে শ্যামল পৃথিবীর অমল হাসি ক্রমশ চওড়া হতে লেগেছে। কিন্তু কাঠামবাড়ি আগের মতো দুর্ভেদ্য নয়। দিনে দিনে বনাঞ্চল অনেকটা সাফ হয়ে এলেও সকালের আলোয় গা ছমছম। দু-একজন, যারা কাঁধে কুঠার নিয়ে হেঁটে চলেছে তাদের পরমবীরচক্র দেওয়ার কথা ভাবা যেতেই পারে। শ্বাসরুদ্ধকর গাড়িযাত্রার শেষে ওদলাবাড়ি। ভোজবাজির মতো জঙ্গল হাপিস এবং শহর ও গাড়িঘোড়া রোজই বেড়ে চলেছে। পৃথিবীর সব রকমের দূষণ যেন থাবা বসাতে বদ্ধপরিকর ওদলাবাড়ির ওপরে। হাইওয়ের ধারে হাট হপ্তায় হপ্তায় ক্রমবর্ধমান। ডুয়ার্সের সুপরিচিত এই হাটতলায় মোড়ের মাথায় বিখ্যাত মিঠাইঘর মরুদ্যান। স্বর্গীয় স্বাদের রসমালাই মুখে ভরে নিরাপদ দূরত্ব থেকে আর একবার কাঠামবাড়ির স্মৃতিচারণ। আহ কত্ত অকৃত্রিম আর সবুজ ছিল আট-দশ বছর আগেও! পড়েছি প্রখ্যাত ভ্রামণিক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের লেখায়। আজ এই শহুরে হাটে মন নেই আমাদের। ডাকছে প্রকৃতির কোলে গ্রামীণ হাট। কিন্তু, অকৃত্রিমতা যে কোথাও আর বজায় নেই, তা বিলক্ষণ জানা। সভ্যতার দূষণ এমনই সর্বগ্রাসী। পার্থক্য কেবল কম আর বেশিতে।
      ওদলাবাড়িতে কিছু কাজ ছিল সঙ্গীদের, সারা হলে নতুন পথে। দিনটা রবিবার, যাচ্ছি তরাইয়ের নিপানিয়া হাটে। দুপুর থেকে বিকেলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জমে ওঠে চা-বাগানের গায়ে সাপ্তাহিক হাটতলা। আসলে বাগানকর্মীদের সাপ্তাহিক অর্থপ্রাপ্তির পরদিন কেনাকাটা সারার জন্য এ আয়োজন। নিপানিয়া হাট বসতে তখনও দেরি। তাড়া নেই। থামতে থামতে চলি। কিছু দূর অন্তর ছবি তোলার ও আরণ্যক প্রকৃতি দেখার বিরতি। কোথাও গ্রাম, তিস্তার দাক্ষিণ্যে সেজে ওঠা ক্ষেত-খামার। এই সব দেখার অবকাশে খানিকটা সময় বইয়ে দেওয়া আর কী। সঙ্গীরা রসিক মানুষ, রাস্তার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি দোকানের বিশেষত্ব নখদর্পনে। তাঁরাই রাস্তার ধারে স্নিগ্ধ বনছায়ায় এক অতি সাধারণ ঝোপড়ায় গাড়ি থামিয়ে ঢেঁকি শাকের পুর ভরা সিঙাড়া খাওয়ালেন। অভিনব স্বাদ গন্ধ। সঙ্গে জল না মেশানো ঘন দুধের চা। শহরে এইরকম জিনিস খেলে গ্যাস অম্বলের প্রকোপ অবধারিত, এখানে পরিবেশের গুণে সব অনিয়মই নিমেষে হজম। দোকানিকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, সবুজ বনের ধারে এই গ্রামের নাম ধুমসিগাড়া।
 
      আরো একপ্রস্ত চা পানের পর এক ছুটে তিস্তা নদীর তীরে। বর্ষার গন্ধবাহী নদীজল ছুঁয়ে আসা হাওয়ায় মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। নিপানিয়া হাটতলায় ঢোকার আগে বাগিচার বসতি অঞ্চলে ঘোরাঘুরি। নদীতীরের মাঠে বেলগাছ। গ্রামের বউ মেয়েরা মাটিতে পড়ে থাকা বেল কুড়োতে ব্যস্ত। আমরাও হাত লাগালাম মহা উৎসাহে। বেল খেতে কতটা ভালোবাসি তা প্রশ্নাতীত নয়, কিন্তু কিশোর বয়সের অনাবিল আনন্দ হঠাৎ ফিরে পাওয়ার মধ্যে অন্য এক ভালোলাগা মিশে থাকে অবশ্যই।
 
      তিস্তাচর ঘেঁষা এ সব জায়গা আজকের নয়। জলপাইগুড়ি তরাইয়ের অন্যতম পুরনো চাবাগান সরস্বতীপুর। একশ বছরের বেশি প্রাচীন বাঙালির চা-উদ্যোগ। আজ যদিও হাত বদল হয়ে অবাঙালি মালিকানায়। বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চল লাগোয়া একদা রায়কত রাজাদের কীর্তিভূমিতে বাগিচা গড়ে ওঠে ১৯১৭ সালে। চারদিকে পরিপাটি অরণ্য আজও পুরোপুরি মানচিত্র থেকে মুছে যায়নি। একটু তফাতে তিস্তা নদী। মেঘহীন দিনে নদীজলে মুখ দেখে কাঞ্চন-পর্বত। সামান্য দূরে গাজলডোবা, অযাচিত সরকারি আদরে অধুনা বিখ্যাত। সেখানে ‘ভোরের আলো’ নামে পর্যটন মেগা হাব তৈরির কাজ চলছে। ফলে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সহ পরিকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের। দলছুট হয়ে নদীর আঁচল ধরে হাঁটা লাগালে লালটেন গ্রাম। পটে আঁকা ছবির মতো।
তরাইয়ে আলো-ছায়ার পথে, যেখানে ভারতবর্ষ এখনো ইন্ডিয়া হয়ে যায়নি
      বাগানের অন্যদিকে সবুজের জলসাঘর মান্তাদারি ফরেস্ট ড্রাইভ। গত শতকের শেষের দিকে রাজ্য সরকার ওখানেও পর্যটন বিকাশের কথা ভেবেছিলেন। এখন লুপ্তপ্রায় অরণ্যের অন্তিম কিছু স্মৃতিচিহ্ন, তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন আর মেঘহীন দিনে নদীর আয়নায় মুখ দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা নিয়ে মান্তাদারি পথভোলা পথিক ও শীতকালে পিকনিক পার্টির মন ভরায়। এইরকম কিছু জায়গায় উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির অবকাশে নিপানিয়ায় পুরোদস্তুর হাট বসার খবর এসে গেল। তখনই প্রথমে বন ও তারপর বসতি ফেলে এক দৌড়ে সবুজ সোনার দেশে।
 
      বর্তমানে কল্যাণী গ্রুপের অধীন সরস্বতীপুর বাগিচার আয়তন ১১৮৭ একর, যেখানে প্রায় ৯০০ মানুষ কাজ করেন, পরিবার পরিজন মিলেজুলে কয়েক হাজার, যাদের প্রায় সকলের বাগানেই বা আশেপাশে বসবাস। সাপ্তাহিক মজুরি লাভের পর সাত দিনের সওদা সারেন রবিবারের নিপানিয়া হাটে। কন্যা নামে বনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অপরূপ নদীর ধারে হাটতলা। সবুজ চাবাগিচা ও অপূর্ব বনছায়ার কোলে এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত হাট আর কোথাও দেখিনি৷ তরাইয়ের হৃদয় উপচানো রঙের বাহার নিয়ে বাইরের মানুষের কাছে দারুণ আকর্ষক, প্রচলিত ভ্রমণ-পথের সীমানা ছাড়িয়ে এক মধুর স্বাদ বদল। কিন্তু নিপানিয়া হাটে সবটাই আলো ও রঙের গল্প নয়। প্রদীপের নীচে কালোও দেখে এসেছি নিজের চোখে। দেশি-বিদেশি সুরা ও জুয়াখেলার রমরমা হাটতলা থেকে শুরু করে কন্যা নদী যাওয়ার রাস্তায় ঝোপঝাড়ের আড়ালে। সব মিলিয়ে আলো-অন্ধকারে মেশা আশ্চর্য রঙিন জীবন নাটকের একটি করে অধ্যায় লেখা হয় কন্যা নদীর ধারে প্রতি রবিবার দুপুর থেকে সন্ধে। মানুষ ও তার চিত্রবিচিত্র জীবন দেখার সাধ হলে নিপানিয়া থেকে শুরু করা যায় তরাই ডুয়ার্সের হাটে-মাঠে-বাটে এক ব্যতিক্রমী পরিক্রমা। এক জায়গায় দেখি কাঠের আগুন জ্বালিয়ে এক বুড়ো তার ওপর কালো হয়ে যাওয়া মাটির হাঁড়ি বসিয়ে কী যেন তরল জ্বাল দিচ্ছেন। কৌতূহল হতে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, সর্বব্যথাহর জড়িবুটির ওষুধ। বিক্রেতার মুখে অনর্গল বুলি, “জীবন গেল, ব্যথা গেল না। শেষবার আমার কাছে এসেই দেখুন।” এমন প্রত্যয় শহরে কজনই বা দেখাতে পারেন? এক জায়গায় আবার নড়বড়ে কাঠের টেবিলে সাজানো দেশী বিদেশী সুরার বোতল। বিক্রেতা সুবেশা মহিলারা। ক্রেতা নিজের চাট নিজেই বানিয়ে নেবেন, এটাই এখানকার দস্তুর। সুরা কিনলে রান্নার পাত্র, উনুন, কাঠ ও কেরোসিন ফ্রি। অনেকেই মুরগির মাংস কিনে এনে হরেক কিসিমের চাট বানানোয় ব্যস্ত। মসলাদার সুগন্ধে ম ম করছে হাটতলার এই দিকটা। এমন অভিনব উদযাপনের আয়োজন আগে আর কোথাও দেখেছি বা শুনেছি বলে মনে হয় না।
      যে দর্শন নিয়ে ঘরে এলাম, তা তরাই-ডুয়ার্সের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনের থেকে কম কিছু নয়। আরশিনগরের পড়শিরা দাগ রেখে গেল মনে। বর্ষার মায়াবি ক্যানভাসে যেন এক নব মেঘদূত পাঠ করে চেনাজানা পরিসরে ফিরলাম।