সুকান্তি দত্ত-র গদ্য

Spread This

সুকান্তি দত্ত

শৈশব-কৈশোরের রেডিয়োবেলা 
 
লকডাউনের অলসবেলায় পুরনো ফোটোর অ্যালবাম বের করেছিলাম ধুলো ঝেড়ে। কিছু ফোটো আমার জন্মের আগে, কিছু ফোটো আমার এক থেকে ন-দশ বছর বয়েস পর্যন্ত, সময়টা সেই ষাট-সত্তর দশক । কত প্রায়-ভুলে যাওয়া মুখ, কত চিরকালের মত চলে যাওয়া মানুষ। কোনো কোনো ফোটো অস্পষ্ট হয়ে গেছে, বেশির ভাগই সাদাকালো। কয়েকটি রঙিন ফোটোও পাওয়া গেল, এত বছর পরেও ভালোই আছে। দেখতে দেখতে একটা রঙিন ফোটোতে এসে  ফিরে গেলাম আমার শৈশব-কৈশোরের প্রিয় বন্ধুর কাছে, সেই কবেকার বন্ধু , টেলিরাড ট্রানজিস্টর !
আমার তখন বছর দুই-আড়াই হবে, সাদা হাফ প্যান্ট আর হালকা হলুদ হাফ শার্ট, গুটিয়ে আসা মোজা আর ফিতা ছাড়া কেডস। কোঁকড়ানো চুল, চোখে কাজল, কপালে কালো টিপ। হাসিহাসি মুখটা হাঁ হয়ে আছে, যেন কিছু বলছিলাম। বাড়ির ঘাসের উঠোনে রাখা রেডিয়োটা, পেছনে  বাচ্চা আমগাছ, বাঁ হাত দিয়ে হাঁটু চেপে সামনে ঝুঁকে পড়ে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে রেডিয়োর হ্যান্ডেল ছুঁয়ে আছি।
বাবা রেডিয়ো-অনুষ্ঠানের অনুরাগী ছিল, শিশুবেলা থেকে আমিও তাই।‌ রোববার সকালে ইন্দিরা দেবীর পরিচালনায়  ‘শিশুমহল’ অনুষ্ঠান, আকাশবাণী কলকাতা ক-তে, মাঝে মাঝে শুনতাম। ইন্দিরা দেবীর কণ্ঠস্বর কানে বাজে আজও, ‘ছোট্ট সোনা বন্ধুরা সব ভালো আছ তো?’ আর  স্টুডিয়োতে বসা বাচ্চারা সমস্বরে বলত, ‘হ্যাঁ…’।  শুনতাম ‘গল্পদাদুর আসর’, বিকেলের অনুষ্ঠান, সম্ভবত প্রতি শনিবার। বিশেষত খুব বৃষ্টিভাসা  বিকেলে যখন আর মাঠে নেমে খেলাধুলোর উপায় নেই তখন ওই ‘গল্পদাদুর আসর’-ই মন খুশি করে তুলত। সন্ধেয় বড়দি চালিয়ে দিত ‘অনুরোধের আসর’, বিবিধ ভারতীতে। বাংলা আধুনিক গানের সে একস্বর্ণযুগ,হেমন্ত-মান্না-সন্ধ্যা-লতা-আরতি-প্রতিমা-শ্যামল-মানবেন্দ্র-সতীনাথ-পিন্টু-সুবীর, সেসব গানের শ্রোতা হওয়ার শুরু তো এভাবেই। এ ছাড়াও নানা সময়ে কলকাতা–ক কেন্দ্রে ছিল ছায়াছবির গান, আধুনিক গানের আসর ইত্যাদি।  বাবার খুব প্রিয় শিল্পী ছিল সতীনাথ আর হেমন্ত, বাবা মাঝে মাঝে গুনগুন করত, ‘আমার এই গানে/ স্বপ্ন যদি আনে…’। বড়দির প্রিয় শিল্পী ছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আর লতার কণ্ঠে ‘ নিঝুম সন্ধ্যায় শ্রান্ত পাখিরা বুঝি বা পথ ভুলে যায়…’ বাজলেই আমি বলে উঠতাম, ওই যে তোমার গান বাজছে! কত রকমের গান শোনার শুরু তো রেডিয়োর হাত ধরেই, ভীষ্মদেব আর বড়ে গোলামের কোনো রাগপ্রধান বা ঠুংরি-খেয়াল বাজলেই বাবা কপালে হাত ঠেকাত, পড়াশুনার মধ্যেই কানে ভেসে আসত রবীন্দ্রগান, দেবব্রত-সাগর-চিন্ময়-কণিকা-সুচিত্রা, নির্মলেন্দুর লোকগীতি, মানবেন্দ্রর নজরুলগীতি। শচিনকত্তার গান পছন্দ করত ঠাকুমা, আমরা ভাইবোনেরা শচিনকত্তার নাকি স্বরের জন্য হাসাহাসি করতাম, ঠাকুমার পেছনে লাগতাম এই নিয়ে,  অনেক পরে বুঝেছি তাঁর গানের মাহাত্ম্য। তবে বাবা সে সময়ে আরও অনেক অভিভাবকের মতোই  হিন্দি সিনেমার গান আমরা শুনি তা চাইত না,  বাবা অফিসে বেরুলে বা বাড়িতে না থাকলে দিদিদের সঙ্গে বিবিধ ভারতী, মুকেশ-রফি-লতা-কিশোর-আশা, আমিন সায়ানির বিনাকা গীতমালা, তবে মা ব্যাটারির বেশি খরচ নিয়ে মৃদু বকা দিলেও রেডিয়ো বন্ধ করতে বলত না।
বাবার  ভালবাসার সবচেয়ে বড়ো ক্ষেত্রটি ছিল নাটক, অভিনয়-পরিচালনায় সুনাম ছিল স্থানীয় অঞ্চলে, আজও অনেকে তাঁর নাট্যচর্চার কথা বলে। স্বাভাবিকভাবেই নিয়মিত শুনত বেতার-নাটক। কিন্তু সেসব ‘বড়োদের’ নাটক শোনা নিষেধ ছিল ছোটোদের, আর তাই আমাদের তা শোনার আগ্রহ ছিল তীব্র, বাবাকে লুকিয়ে পাশের ঘর থেকে বা ঘুমের ভান করে নাটকে কান পেতে রাখার চেষ্টা ছিল ষোলোআনা, তবে বাবার সতর্কতা পেরিয়ে সে চেষ্টা একআনাও সফল হত বলে মনে পড়ে না, বরং এক-দুবার ধরা পড়ে জুটত রাম বকুনি।
বাবার প্রিয় খেলা ছিল ক্রিকেট, হকি একটু-আধটু, হকিতে ভারতের স্বর্ণযুগ তো ছিল সত্তর দশক পর্যন্ত, আর অন্য খেলায় সেরকম আগ্রহ দেখিনি। বাবার পাশে বসে খুব কম বয়েস থেকে ক্রিকেট-ধারাভাষ্য শুনতাম ওই বেতার-বন্ধুকে ছুঁয়েই। আর হয়ে গেলাম  ক্রিকেট-পাগল। এখন তা নই অবশ্য, আগ্রহ কমতে কমতে টি টোয়েন্টির যুগ থেকে আর কোনও খবরই রাখি না।
তো সেই সত্তর দশকের গোড়ায় টেস্ট ম্যাচে গাভাসকার, বিশ্বনাথ, ইঞ্জিনিয়ার, ওয়াদেকার, সোলকার, দুরানি, ভেঙ্কটরাঘবন বেদি, প্রসন্ন,  চন্দ্রশেখরদের সে এক অন্য যুগ! অজিত ওয়াদেকার ক্যাপ্টেন, একাত্তরে প্রথম বার  ইংলন্ডের মাঠে  ইংলন্ডকে হারিয়ে সিরিজ জিতে ভারতীয় ক্রিকেটদল সাড়া ফেলে দিয়েছে। বাহাত্তরে ইংলন্ড দল এলো ভারত সফরে, ডিসেম্বরের শেষে ইডেনে টেস্ট । সেই আমার প্রথম  ধারাভাষ্য শোনা রেডিয়োয়, বাংলায়।  শীতের সকাল, স্কুল ছুটি, বাবাও বছরের শেষে পাওনা ছুটিতে, বারান্দায় রোদে গা এলিয়ে রেডিয়ো শুনতে শুনতে বাবাকে ক্রিকেট নিয়ে টুকটাক প্রশ্ন করছি অসীম কৌতূহলে, বাবা উত্তর দিয়ে চলেছে,  রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে ফুলকপির গন্ধ, দুপুরে খাওয়ার পর কমলালেবু, সে সব দিনের কথা মনে হলেই বড়ো স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ি!
তখন ধারাভাষ্য দিতেন তিনজন, অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার আর কমল ভট্টাচার্য। ‘আউট আউট আউট’ অজয় বসুর ভরাট গলা আজও কানে লেগে আছে, ওঁর ভাষাও ছিল অন্যরকম,  ‘প্যাভেলিয়নে ফিরে যাচ্ছেন ফারুক ইঞ্জিনিয়ার, ক্রিকেটের নন্দনকাননে আজ আশাহীন নীরবতা, লক্ষ লক্ষ হৃদয়ের কল্লোল বদলে যাচ্ছে হাহাকারে…’ যতদূর মনে পড়ছে এইরকমই বলতেন তিনি। পুষ্পেন, কমল এঁরাও যার যার স্টাইলে মাতিয়ে রাখতেন পাঁচটি দিন। সকাল থেকে বিকেল রেডিয়োর সামনে থেকে নড়তাম না।
 এঁদের গলায় শোনা মনে পড়ে, ‘গুডলেংথ বল, গাভাসকার পিছনের পায়ে ভর দিয়ে বলটি মিড অনের দিকে একটু ঠেলে দিয়েই দৌড়ে একটি রান চুরি করে নিলেন’। ক্রিকেটের যাবতীয় পরিসংখ্যান ঠোঁটস্থ থাকত পুষ্পেনের।
সেই ম্যাচে ভারত জিতেছিল, বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখরের স্পিনের দাপটের সামনে ধূলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল ইংলন্ডের ব্যাটিং। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে বেশি রান করেছিলেন,ইঞ্জিনিয়ার, ওয়াদেকার আর দুরানি। ইংরাজিতে ধারাভাষ্য দিতেন যারা, কয়েকজনের নাম মনে পড়ছে, কিশোর ভিমানি, নরোত্তম পুরী, অনন্ত শীতলবাদ, সুরেশ সরাইয়া প্রমুখ। দেশের বাইরে খেলা হলে ধারাভাষ্য শোনার সময়ও বদলে যেত, অস্ট্রেলিয়া হলে ভোরের দিকে,  ইংলন্ড হলে বিকেল সন্ধ্যায়, এইরকম। ক্রিকেট-পাগলামি নিয়ে বকাও খেয়েছি মাঝে মাঝে।
মনে‌ পড়ে জ্বর গায়ে ঠাকুমার কোলে শুয়ে হকিতে ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের ধারাবিবরণী শোনার রোমাঞ্চ। পঁচাত্তর সাল, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ভারত পাকিস্তানকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল। ভারতের পক্ষে গোল দুটি করেছিলেন সুরজিত ও অশোককুমার।
প্রতি বছর মহালয়ার ভোরের রেডিয়োকথা তো অমৃতসমান। তখন এখনকার মতো ইচ্ছে হলেই  ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার সুযোগ ছিল না, বছরের এই একটি ভোরের জন্য অপেক্ষা করে থাকত সবাই। দু –তিন আগে থেকে রেডিয়ো-সারানোর দোকানে লাইন লেগে যেত। কেউ কেউ ভোরে উঠে স্নান করে ভক্তিভরে শুনতে বসত।  মা ডেকে দিত ভোর চারটেয়, টেলিরাড ট্রানজিস্টরটি মাঝে রেখে একটা ঘরে শুয়ে বসে থাকতাম সবাই, আধোঘুমে কানে ভেসে আসত বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের অপ্রতিম স্বর, ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর, ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনবার্তা, আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনির অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবণ…’  কৈশোরে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার একটু আগেই বেরিয়ে পড়তাম, পাশের বাড়ি থেকে আসছে শিউলি ফুলের গন্ধ, বন্ধুরা দল বেঁধে দেখতে ছুটতাম পালবাড়িতে প্রতিমাশিল্পীর কাজ আর কতটা বাকি,  পাড়ার পুজো প্যান্ডেলের কাজ এগিয়েছে কতটা।  সে এক আশ্চর্য ভোর!
ট্রানজিস্টর বন্ধুটি‌ আশির দশকের প্রথম কয়েকটা বছর  পর্যন্ত ছিল, তারপর কোথায় হারিয়ে গেল অভিমানে অনাদরে! লকডাউনের ভয়ংকর অবসরে, হে বন্ধু,‌ হে‌ প্রিয়, স্মৃতিমেদুর মন তোমাকে চায়, জানি, ফিরব বললে‌ ফেরা যায় না, তবু্ও…