শুভংকর গুহ-র গদ্য

Spread This

শুভংকর গুহ

কবিতার শব্দ

পৃথিবীতে যেদিন প্রথম রেখা চিহ্ন আঁকা হয়েছিল সেটিই কবিতার প্রথম ও শেষ আক্ষরিক শব্দ। হয় তো সেইটি একটি সামান্য রেখাঙ্কন ছিল। যা প্রাগৈতিহাসিক আদি মানবের কল্পনা এবং অনুভূতির একটি দাগ ছিল শুধুমাত্র। অনুভব ও কাল্পনিক রেখার সেই প্রথম প্রকাশই আধুনিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ ছিল। আজ দীর্ঘতর অনুশাসিত প্রতিষ্ঠিত শব্দগুলি বড় বেশি ক্লান্ত করছে, অমনোযোগী করে তুলছে। একটুকু ছোঁয়া দিয়ে যাওয়ার মতো, টোকা দিয়ে যাওয়ার তেমন কিছু অণু পরমাণু শব্দ-প্রকাশিত হোক যা সুদূর ভবিষ্যতে আমাদের বিবশ করে তুলবে। শুধুমাত্র একটা দাগ চিহ্ন বা গভীর কোনো ক্ষত যা থেকে অনায়াসে একটা কবিতার অনুভব আমাদের চেতনে বসে যেতে পারে। বা মনে হতে পারে একটি ক্ষত আরও গভীরে একটি ক্ষত চিহ্নের জন্ম দিল। পরবর্তীতে সেই দাগ চিহ্ন নিয়ে কিছু লেখার আর কোনো মানেই হতে পারে না, অনর্থক চর্বিত প্রচেষ্টা মাত্র। আসুক সভা ও স্বীকৃতিহীন অনুশাসনহীন খামখেয়ালিপনা কিছু শব্দ। কল্পনার মাধ্যমে ব্যকরণহীন তুলির আচরে রঙের যেমন ভাষা গড়ে ওঠে হেনরি মাতিস, পল সেজান, পল গ্যগা বা ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের এর বিন্যাসের মতো। তুলি ও কলম ছুঁয়ে ফেলার মতন চিহ্ন বা দাগ না বলা সংলাপের মতো কিছু অক্ষর। আসলে কবিতার জন্য কি নিয়ম করে কোনো শব্দ নির্ধারিত থাকে ? এইগুলি কবিতার শব্দ হবে ? আর এইগুলি গদ্যলেখার ?

কোনো শব্দেরই নির্দিষ্ট নিয়তি নেই। নিয়তি উপলব্ধ শব্দের একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান থাকে যা খোলামনকে ক্রমাগত বিব্রত করে। মধ্যমানের মুগ্ধতা আনে। সেই শব্দগুলি বিশুদ্ধ অভিধানিক। প্রতিষ্ঠানধর্মী। রাষ্ট্রীয় জীবনে বা সুসংহত সামাজিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠান ধর্মীতা আমাদের এক চূড়ান্ত বিলাস। প্রতিষ্ঠান বিরোধী শব্দের অনুশাসিত আকার থাকে না, থাকে না পরিচিত বা নিয়ন্ত্রিত ছাঁচ। বেশ কয়েক বছর আগে সাহিত্যে ছাঁচ ভেঙ্গে ফেলার অসামান্য আন্দোলন বিমোহিত করেছিল। সেটি তো সাহিত্য সৃষ্টির প্রথাগত ধারাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল শুধুমাত্র। কিন্তু শব্দ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ? কথাক্লান্ত ও কথামুগ্ধ জীবনে আদৌ কি শব্দের ছাঁচ ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব হয়েছে ? শব্দ তো মানব জীবনের স্বীকৃত প্রাচীন ঐতিহাসিক চিহ্ন। আমাদের ব্যবহারিক জীবনে বেঁচে থাকার অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। এখন তো শব্দ পরের পর লিখে যাওয়ার মধ্যে আধুনিকতার চূড়ান্ত অভ্যাস গড়ে তুলেছি। গড়ে তুলেছি চতুরতর লিপি কৌশল। কবি লেখক লিখে যান, সার্বিক প্রথাগত শব্দের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে। স্বীকৃত শব্দচিহ্নের প্রয়োগে। কখনো আবার শব্দের সাথে প্রথাগত শব্দের মেলবন্ধনে নতুন স্বাদের স্মরণীয় শব্দের সরণি নির্মাণ করে। যদিও ছাঁচের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নয়। তাই সকলেই সংলাপে সংলাপি, কবিতায় আলাপি কজনা ? কবিতার কোনো ধর্ম নেই। কবিতা ধর্মহীন। বিখ্যাত ইংরেজ কবি Robert Frost বলেছেন-Poetry is when an emotion has found its thought and the thought has found words.

সাধারণত আখ্যান রচনা করা হয় ভাবনার বিন্যাস, কল্পনা, ভাষা নিসর্গ, মেধা, ইতিহাস চেতনা বা অবচেতন ও চেতনকে আশ্রয় করে, সর্বপরি শিল্পস্বত্বাকে আশ্রয় করে। কিন্তু যা কিছু লিখি কবিতা বা গদ্য লেখার পরেও চূড়ান্ত তৃপ্তি থাকে না। একটা চিত্র দেখার পরে আমাদের মনে যে প্রতিক্রিয়া হয় আমাদের লিখিত ভাষায় তা কখনই উঠে আসে না। অনেকদিন চেষ্টা করেছি উত্তরবঙ্গের শীতকালে শুকিয়ে যাওয়া একটি জংলি নদীর বিবরণ লিখে ফেলতে। অনেকবার লিখেছি কিন্তু লেখার শৈলী ও বোধ কিছুতেই তৃপ্তি দেয় নি। তাহলে যা বলতে চাই বা যা লিখতে চাই সেখানে নিজস্ব অক্ষমতাই দায়ি। ভাষার সীমাবদ্ধতাই বা কি করে বলি ? কবিতার শব্দ মননে, বোধ, চেতনায় অনেক বেশি আরাম ও তৃপ্তি দেয় । তবুও কবিতার পাঠক হিসেবে কখনই চূড়ান্ত আত্মতৃপ্তি কি পেয়েছি ? এ কথা মানতেই হবে বোধ, কল্পনা ও স্মৃতি হৃদয়ের অভ্যন্তরে চিরকাল কারাবাস করে। কবিতার সাথে সহবাস গড়ে উঠলেও কোথাও যেন একটা ফাঁক থেকে যায়। অর্থাৎ মানুষ যেমন সংঘে থেকেও প্রকৃতই একা। তেমনি পাঠক হিসেবেও চিরকাল একা একা ভ্রমণ করে যায়। একজন চিত্রকরকে দেখার অভিজ্ঞতা আছে – তিনি একটি নদীর পাশে বসে জলরঙে নিসর্গ আঁকছিলেন। কেন্ট পেপারের ওপর জলের ভেজা ধরে ছড়িয়ে দিলেন রঙ। রঙ ছড়িয়ে পড়ছিল আপন খেয়ালে। জলরঙের ছড়িয়ে পড়ার স্বাধীনতাকে শিল্পী কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। কারণ রঙ যে ভেজা কাগজের ওপরে চমৎকার আত্মীয়তা নির্মাণ করেছে। রঙ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে আপন খেয়ালে ছড়িয়ে পড়ে অন্যমাত্রার ভুবন নির্মাণ করে মানুষের অনুভূতিকে ছুঁয়ে ফেলে। আলোছায়ার মাধ্যমে এক মায়াময় জগৎ সৃষ্টি করে। যা শব্দের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। হেনরি মাতিস তাই অভিমত পোষণ করেছিলেন রঙ মানুষের ভাবনাকে দলছুট করে দেয়। বড়ই একা করে দেয়। শব্দ মানুষের কল্পনাকে লিপিবদ্ধ করতে সাহায্য করে। কিন্তু রঙ মানুষের কল্পনার সেতু নির্মাণ করে। উল্লাসময় পৃথিবী থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নেয়। যেখানে শিল্পী এবং রঙ একসাথে সহবাস করে। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং হিমালয় সমান গম্ভীরতা কে আশ্রয় করে কবিতাকে মানব সভ্যতার প্রার্থনা করে তুলেছিলেন, আমরা সবাই তাঁর কবিতাকে দেবতা হিসেবে প্রতিদিন যাপন করি। জীবনানন্দের কবিতাকে নিসর্গ ও প্রকৃতি হিসেবে সাধনা করি। অক্লেশে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন –চিত্ত যেথা ভয় শূন্য- সত্যিই কি আমাদের চিত্ত ভয় শূন্য ? জীবনানন্দ দাস কে বাদ দিলে এখনও কি সত্যিই কবিতার ভাষা সৃষ্টি হয়েছে ? সংলাপ বিবর্জিত এক অসামান্য দার্শনিক প্রতিবেদন। কথা যদি কবিতার ঘরে এসে কিছু বলতে শুরু করে তাহলে কবিতার শরীর অসুস্থ বোধ করে। কথা দিয়ে কবিতা লেখার কাজ যতদিন চলবে কবিতার মহাকাশ ততদিন নিঃসঙ্গতা বোধ করবে। তাই সংলাপে সংলাপি কবিতার ফসল জমি। সংলাপের উর্বর জমিতেই কবি ও কবিতার যৌথ খামার। সেই ১৯২২ সালে প্রকাশিত জেমস জয়েস–এর ইউলিসিস আখ্যানটি পড়ে মাত্র সামান্য কয়েকজন পণ্ডিত তার গভীর অর্থ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন । অধুনা বাংলা ভাষার একজন উল্ল্যেখযোগ্য সম্পাদক তিনি প্রথিতযশা প্রখ্যাত এক প্রাবন্ধিককে বলেছিলেন ইউলিসিস নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ করুন, আমি পাঠকদের উপহার দেব। তিনি অনায়াসে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন,- বুঝতে পারছি আপনি আমাকে বিপদে ফেলার জন্যই এই প্রস্তাবটি করছেন। আর জয়েসের লেখার ওপরে বিশেষ করে ইউলিসিস নিয়ে কিছু লিখতে গেলে আমাকে ইউরোপে চলে যেতে হবে । কারন আমাকে মহাকবি হোমারের বিষয়ে অনেক অধ্যয়ন করতে হবে, ওখানকার আঞ্চলিক স্তরে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে।

বিনয় মজুমদারের সেই প্রখ্যাত উচ্চারণ– মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়। কবিতার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই যেন। কেননা আমাদের জীবনানন্দ দাশকে আবিস্কার করতেই কেটে গেছিল বেশ কয়েকটি বছর। তা স্বত্ত্বেও তিনি আজও বহু ক্ষেত্রে অনাবিষ্কৃত। সংলাপধর্মী কবিতাই মানুষের জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম। আর সামান্যই প্রকৃত কবিতা যে কবিতা মোটেই সংলাপের ভাষায় কথা বলে না সেই সব সামান্য কবিতাগুলি কবির ভাষায় অন্ধকার বিদিশার নিশা। অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়, বাচিক শিল্পীরা সেই সব লেখাই আবৃত্তি করেন যেখানে সংলাপের দীপাবলির ফুলঝুরি উপস্থিত। বাচিক শিল্পীর কপালে প্রচুর অর্থ ও করতালি জোটে বটে। জ্ঞানত কোনোদিন শুনিনি বা সেই অভিজ্ঞতা হয় নি বিশেষ প্রখ্যাত বাচিক শিল্পী তিনি শৈলেশ্বর ঘোষ এর কবিতা আবৃত্তির ঝুঁকি নিচ্ছেন। বা রামেন্দ্র কুমার আচার্য চৌধুরীর। আপনি কি কোনোদিন এমন কাউকে দেখেছেন, ফেলিনি, কুরোসোয়া, ঋত্বিক ঘটক ও সত্যজিৎ রায়ের-এর সিনেমা দেখে চোখের জলে দর্শক গঙ্গা যমুনা হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দর্শকের বিবেকে ক্রমাগত চাবুকের আঘাত দংশন করে যায়। প্রশ্ন আসতে পারে, রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখাই চোখে শ্রাবণ আনে। পোস্টমাস্টার শ্রাবণ এনেছিল। আজও আনে। কিন্তু পোস্টমাস্টার চেতনার গভীরে অনেক দার্শনিক প্রশ্ন তুলে দিয়ে যায় আজও। যতবারই পড়া যাক না কেন এক ঔপনিবেশিক চেতনার বিষাদ ও যন্ত্রণা আমাদের গ্রাস করে। চেতনা ও মনন হু হু করে ওঠে।

সংলাপ নির্ভর কবিতা আজকাল এত বেশি মাত্রায় লেখা হচ্ছে বলেই এই প্রশ্নের অবতারণা। কবিতায় নেমে আসুক শব্দ চিহ্ন। অথবা দার্শনিক, অনুভূতি সম্পন্ন কিছু অসামান্য শব্দ অতি কথনের ধর্মকে বর্জন করে আমাদের অভ্যাসের গভীরে গড়ে উঠবে কিছু চিহ্ন। অনাবিষ্কৃত অব্যক্ত অনুভব ও দার্শনিক সন্দর্ভ।