জয়দীপ সেন-র ভ্রমণ কাহিনী

Spread This
Joydeep Sen

জয়দীপ সেন

কাসারোদি সিঙ্গারোদির দেশে: একটি আত্মবর্ণনমূলক গল্প

সকালে বাবলু ডাকতে এলে ওর অটোতে কফি ক্ষেত দেখে আর ডলুরির ঝোরাতে স্নান করে ফরেস্ট অফিস যাওয়ার কথা, আর সেইমতো ৯ মিনিট এর বেশি দেরি না করে এখন দরজা পিটিয়ে চলেছে সে। মাথা থেকে গলা পর্যন্ত ওল্ড মঙ্ক ভাং আর গাঁজার নেশায় দ্বিগুণ ওজন, তিনগুণ হলো বাবলুর দরজা পেটানোর শব্দে। একঘন্টা আগেই ঘুম ভেঙেছে কাঁচের জানলা থেকে পর্দা ডজ করে আসা বাঁধহীন রোদে, তখন দেখেছি ঘড়িতে ৭ টা। পাশের বিছানায় শুয়ে থাকা সৌম্যকে মোদির মতো শয়তান আর আডবাণীর মতো অসহায় লাগছিলো। ওই রুক্ষ রোদ আর নেশাজমা অস্বস্তি নিয়ে দারিংবাড়ি আর কাশ্মীর শব্দদুটো ভাবলেও মাথা পাক দিয়ে আসছিলো তখন।  অথচ, কাল বিকেলে এই বাবলুর অটোতে করে ব্রহ্মাপুর থেকে এখানে আসার সময় বসন্তের শেষ দিকের কমলা আকাশ আর আমের মুকুলের বিকেলটা বেশ অন্যরকম ছিলো। অনেককিছু পরপর সাজিয়েছিলাম আর তার কিছুই নাও হতে পারে সেই বিশ্বাসটুকু নিয়েই। বাবলুরও বন্ধের বাজারে খদ্দের তারপরে বন্ধু আর তারপর মদের পার্টনার পেয়ে যাবতীয় ইনহিবিশন সরিয়ে রেখে অরণ্যের রাজা হয়ে যেতে সময় লাগেনি। মাত্র ৪ ঘন্টার আলাপেই আমাদের সাথে রাতে থাকতে রাজি হয়, সফরসঙ্গী হতে রাজি হয় রাতের এই কন্ধমলরাজা। কিন্তু সে ডাকতে আসছে কোথা থেকে? তার তো আমাদের সাথেই থাকার কথা! কিন্তু না, ওকে থাকতে হয় সার্ভেন্টস রুমে। কারণটা, ওর মূলনিবাসী পরিচয়। আমরা ওদেরই জমিতে হোটেল বানিয়ে ফেলেছি, আর ওদেরকে সেখানকারই সার্ভেন্ট বানিয়েছি। জানলা ফুঁড়ে আসা রোদের থেকেও দারিংবাড়িকে তখন খারাপ লাগতে শুরু করেছে এই নরখাদক নগরায়নের জন্য। পাশে আরেক নরখাদক জাগছে তখন আমাকে উঠিয়ে দরজা খুলিয়ে আরও খানিক ঘুমের সময় চুরি করে নেবে বলে।

বাবলুকে জানিয়েছিলাম আমাদের দেশে আসতে, যখন ও বলেছিলো ওর কলকাতায় একবার ঘুরতে আসার খুব ইচ্ছে। আমাদের ডোকরা শিল্পীদের পাড়াতেও নিয়ে গেছিলো ও, বলেছিলো শীতে আসতে, আরও সুন্দর লাগে ওর গ্রাম। বরফ দেখতে নয়, মানুষ এর সাথে মিশতে।

ডলুরির ঝর্ণার সামনে কিন্তু তখন দারিংবাড়িকে আবার আমাদের ভালো লাগতে শুরু করেছে। এই তো সব জায়গায় মানুষ আসে না ভাগ্যিস, এলেও থাক সেসব খবর আমাদের মধ্যে। এরকম মাঝেমধ্যেই আমার আর সৌম্যর হয়, আর কাউকে বলতে ইচ্ছে করেনা যে পুঁজি আর উন্নয়ন দুটো আলাদা বিষয়। তারপর হাল ছেড়ে উঠে পড়া, জঙ্গল আমরা হেরে গিয়েছি বলা, জঙ্গল আমরা তোমাকে হারিয়েছি বলা। গামাথা শুকিয়ে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে পারমিশন করানোর ইচ্ছে অনেকক্ষণ আগেই মেরে ফেলেছি, তখন তো সূর্য ডোবার প্রস্তুতি আর বসন্তের এই সময় হওয়ায় ভাসে মেলার শব্দ। মেলার গন্ধে ম ম করা কন্ধাদের গ্রাম এখুনি জেগে উঠবে, আর আমরাও আধঘন্টায় আবার উন্নয়নের নামে মানুষ ঠকিয়ে ভিক্ষা দেওয়া ছোট সবুজ বাসে করে পৌঁছে যাবো সেখানে যেখানে টিলার ওপর থেকে সূর্য ঝাঁপ মারে। ভোট হরতাল সব মিলিয়ে দোকানপাট কম। আগ্রহও কম, ভারতে কারা কি গদি সামলাতে এলো জানতে। আর আমাদেরও তখন চোখের সামনে রঙিন দোকান মানুষ খাবার, শুধু রঙ রঙ আর রঙ, রঙে নেশা লাগে ঝিমঝিম। চারিদিকে পাগলের ছড়াছড়ি, চারিদিকে প্রাণ। মাদল বাঁশি ঝুমুর উনুনের ধুঁয়ো… তারই মাঝে এক পাগল ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে নিয়ে গেল মহুয়া খাওয়াতে, এই তো কিছুক্ষণ আগেই পরিচিত হলাম আর এত তাড়াতাড়ি হৃদয় বেরিয়ে একসাথে হাঁটতে শুরু করলাম। তিন পাগলে হলো মেলা বিকেল শেষে।

গোটা দুপুরটা বালিগুড়াতেই কাটবে মনে হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো ফিরে যাই দারিংবাড়ি আবার নয় তো ঢুকে যাই ফুলবানির কাঠুরেদের সাথে তাদের জঙ্গলের ঘরবাড়িতে। সকাল থেকে রোদ ঘাম তথ্যের অভাব এসব নিয়ে এক বেগতিক দুপুরে এসে পৌঁছেছি, যেখানে বেলঘর যাওয়ার পারমিশন পাওয়ার মিনিমাম আশা টুকু তলানিতে। তবু জানতাম, ফুলবানির জঙ্গল শেষ অপশন ছাড়া হতে পারে না। আচ্ছা এখানে বলে রাখা যাক, দারিংবাড়ি পৌঁছনোর সবথেকে লাগসই মাধ্যম ট্রেন, হাওড়া থেকে ব্রহ্মাপুর, সেখান থেকে বাস বা ভাড়ার গাড়ি, প্রায় ঘন্টা চারেক। আমাদের দুদিনের দারিংবাড়ি শেষ করে আমরা সকালেই বন্ধ এর বাজার হাতরে পাওয়া বাস ধরে বালিগুড়া এসেছি। আশা ছিলো, বন্ধ থাকার ফলে বেলঘর এবং/অথবা কোটাঘরের যে পারমিশন আমরা পাইনি সেটা বালিগুড়ার ফরেস্ট অফিস থেকে পাবো। আর দারিংবাড়ি থেকে বেলঘর যাওয়ার পথেই পড়ে সেটি। পারমিশন এক দুরূহ জিনিস, মানুষের সাথে মানুষের বৈধ লাগাওগুলোকে স্মাগলিং এর পর্যায়ে ফেলে ছাড়ে। তবু আমাদের দরকার ছিলো, কারণ ওরা মানুষ দেখার টিকিট চেকার। পারমিশন লেনা চাইয়ে থা, কারণ আমাদের রাতের আশ্রয়টাও পেতে হতো। না, পাইনি। ভোটের জন্য ফরেস্ট অফিস এখানেও বন্ধ। তবে এখানে আবারও জিতে গেলাম মনে হলো, কারণ বরাবরের মতো আবার ব্যর্থতা। এ এক অদ্ভুত খেলা, এভাবেই চলে এসেছে বরাবর আমাদের পরিকল্পনাহীন ভ্রমণগুলোতে। কতবার এমন হয়েছে! মাঝরাস্তায় কাউকে পেয়ে নিজেদের রুট ঘুরিয়ে নিয়েছি আলগাড়ার মতো অখ্যাত পাহাড়ি গ্রামে, কিম্বা মধ্যরাতে পৌঁছনো কখনও নাম না শোনা দক্ষিন ভারতের সুলা বলে কোনও মফস্বলের বাস টার্মিনাসে। আসলে পরিকল্পনা তো থাকে হারিয়ে যাওয়ার, আর তাই তো হারকে জিতনেবালে বাজিগর হয়ে যাই সেই অখ্যাত রাতে। মহুয়া আর চাঁদ যে দেখতে পাচ্ছিলাম বালিগুড়া থেকেই সেরকম আশা আর আমাদের মতো ব্যর্থ বাজিগর ছাড়া কেই বা করতে পারে তখন! বসন্তের বিকেল, রাস্তার দুদিকেই আমরা দুজন আর আশেপাশের কয়েকটা নিভু নিভু দোকানি। আমাদের মন তখন কন্ধাদের সাথে সাঁট করে নিয়েছে। অতএব ভয় নেই… এরা বিশ্বাস করে বারবার ফেঁসেও আমাদের ওপর বিশ্বাস হারায়নি।

গতসপ্তাহে এক ওয়েব পোর্টালে পেলাম জঙ্গলকে জঙ্গল সাফ করে দিচ্ছে বিকাশ কে ভগবান। কয়েক হাজার কন্ধা মানুষ কন্ধা বন্যপ্রাণ ঘরছাড়া হবে। হবে তো হবে। কার কি গেলো এলো? তোমার জঙ্গল তোমার থেকে ছিনিয়ে তোমাকে চাকরিতে রাখার সুব্যবস্থা তো আছেই রাষ্ট্রের। তারপর একটা হাতি মরবে, বলা হবে অর্বাচীন স্থানীয়দের কাজ। তারপর একজন সরকারি লেঠেল মরবে কালোবাজারি করতে গিয়ে অথবা স্থানীয় মহিলার ইজ্জাত নিতে গিয়ে। ব্যাস! এবার তো অতি অবশ্যই নকশাল ভূত। অপারেশন হবে, রাতারাতি জমিন জঙ্গল রাষ্ট্রের দালালিতে দখল হয়ে যাবে বিকাশকে ভগবান দের হাতে। তারপর আবার একটা ওয়েব ব্লগ আসবে, উইকেন্ড ট্যুরিস্ট এনথুসিয়াস্টদের জন্য। বাবুবিবিরা মাওবাদী অধ্যুষিত গ্রাম ঘুরে আসবে সোমবারের অফিস লাঞ্চসেশনে প্রাইড ও অনার নেওয়ার জন্য। গল্পে গল্পে থাকবে মাওবাদী আর হাতি দেখতে পাওয়ার এডভেঞ্চারমূলক গল্প। অথচ যে মানুষগুলোর ওখানে থাকার কথা ছিলো তারা ধীরে ধীরে গাছ হয়ে যাবে।

এসব ভাবতে ভাবতে বলতে বলতে প্রায় ৫ কিলোমিটার হেঁটে কোথাও একটা পৌঁছেছি যেখান থেকে বেলঘর তখনও ২৩ কিলোমিটার মতো। মহুয়ার সঙ্গতে হাঁটতে হাঁটতে, সেই চাঁদের পাহাড় পৌঁছে যাবো ধরে নিয়েছি। আবার মানুষ, রক্তমাংসঘাম আর লম্বা লম্বা বিড়ি। অক্লান্ত পাথর ভাঙার কাজ, কারণ ওই যে ওখানেও বিকাশ এর রুমাইন্দারা পৌঁছে গ্যাছে। এরা অবশ্য সবাই কন্ধা নয়, গঞ্জাম বিন্ধ এমনকি বিহার এর নানান জায়গার শ্রমিক। জানিনা করোনার পরিযায়ী শ্রমিকের তকমা পেয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা সবাই বাড়ি পৌঁছেছে কিনা। আমরাও তো হেঁটে চলেছি, উদ্দেশ্যহীনতার উদ্দেশ্য তো আমাদেরও ছিলো। কোথায় আমরা ওদের মতো পাথর ভাঙতে জানি! কোথায় ওদের মতো গাছের তলায় গামছা পেতে ঘুমোতে পারি? কোথায় অচেনা জঙ্গলে সন্ধ্যে নামছে দেখে নিরুত্তাপ থাকতে পারি? তবে জানি সে আসবেই, সে এলোও। ওদের সাথে মহুয়া সহযোগে আধঘন্টাখানেক আড্ডার সুযোগ করে দেওযার জন্যই বোধহয় এই দেরি। ততক্ষণে তো গাছে গাছে খবর রটে যায় ততক্ষণে বারুদ ভরে নেয় আমাদের হৃদয়গুলো। আমাদের নাগরিক জীবনের সোমবার না থাকার গর্বগুলো মিলে সে এক শরীর তৈরি হয়েছে বুঝি, যে আমাদের কাছে বারবার পৌঁছে যায় মধুসূদন দাদার মতো।

শুধু পুঁজি নয়, সেদিন দেখেছিলাম ছাগলেও কিনা খায়! কুটিয়া কন্ধাদের গ্রামের এক ঝোরার জলে তখন স্নান করতে নেমেছি, রোগা বাদামি কালো নধরকান্তি স্পটেড মাঝারি সবরকম ছাগলের পাল চলে এসেছে তখন আমাদের দেখতে, সাথে ডাক্তারও ছিলো। ডাক্তার এর খাওয়ার কথায় বা ডাক্তার এলো কোথা থেকে সে কথায় আসছি, তার আগে আমাদের সামনে ঘটে গেলো এক তেজস্ক্রিয় বিপ্লব, দুটো গোটা শ্যাম্পুর পাতা আস্ত খেয়ে ফেললো ছাগলদের দুজন ক্লাস মনিটর, গামছাদুটো বাঁচাতে পেরেছি এই যা। ওদিকে ডাক্তার কিন্তু পুঁজির টিমে, তার খাওয়া আলাদা। সে নির্দ্বিধায় বিজেডি আর বিজেপি দুদলেরই টাকা খেয়ে হজম করে নিতে পারে ক্যান্ডিডেট দাঁড় করানোর নাম করে। আসলে এই ডাক্তার নামে ডাক্তার, আদতে বেলঘরের এক মাতব্বর গোছের। এর সাথে আমাদের পরিচয় আগের দিন জঙ্গলে ঢোকার পর। আগের দিন বিকেলে আমরা জঙ্গলে ঢুকেছিলাম আফরাজুলের অটোতে। আফরাজুল আর বাবলু দুজন অভিন্ন, আমাদের জঙ্গলের বাংলোর ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ছাড়েনি, আর সুযোগ বুঝে একটা টাকা বেশি নেয়নি। আসলে এটাও যে লিখতে হচ্ছে সেটাই আমাদের একরকম হেরে যাওয়া, কারণ শেষ অবধি আমরা রাতের মাথা গোঁজার ঘর পেয়েছিলাম ফরেস্ট অফিসারকে বিয়ার এর দাম ঘুষ দিয়ে। ফেরার পথে আফরাজুল এর খোঁজ আর নেওয়া হয়নি।

ডাক্তার এর এন্ট্রিটা পারপেন্ডিকুলার এর মত। ঠান্ডা মাথায় এসে বললো, “দাদা, এরা জঙ্গলের মানুষ। শহরের লোক দেখলে ভাবে একটু টাকাকড়ি পাবে। দুটো বিয়ার এর টাকা আমাকে দিন সব ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি।” পরে জেনেছিলাম, বেলঘরের কাঠ বাংলোর ভাড়া ১০০ টাকা। এখানে বলে রাখি, এই বাংলো বুক করতে হলে অনলাইন এপ্লাই করা যায় তবে তার ওপর বিশেষ ভরসা না রাখাই ভালো। এছাড়া, দারিংবাড়ির ফরেস্ট অফিস (যেটা কর্মচারীদের ইচ্ছাশর্তে চলে) অথবা বালিগুড়ার ফরেস্ট অফিস যা বেশিরভাগ দিন বন্ধই থাকে। এখানে এটা না বললেও চলে যে এই সব অফিসগুলোর পারমিশন এর অথরিটি নিয়ে যারা বসে আছে তারা কেউই জঙ্গলের লোক নয়, মানে ওই ঘুষখোর ফরেস্ট অফিসারও নয় আবার ডাক্তারও নয়। তো এই ডাক্তার (যার আসল নাম অমুক মন্ডল) জিনিসটি বিশেষ ঘোরেল সেটা বেলঘরে পৌঁছে চায়ের খাটিয়াতে প্রথম সাক্ষাতেই বুঝেছি। কথায় কথায় বেরোয় ইনি বারাসাত এর লোক এবং বছর দশেক হলো এখানে আছেন। নামের আগে ডাক্তারটা আসলে তার উপাধি, পেশায় ইনি মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলেন এককালে, তারপর কন্টিনেন্টাল ড্রিফটের কারণে উনি এখানে চলে এসেছেন। এখানে ওনার চেম্বার বউ বাচ্ছা মাংসের ব্যবসা মহুয়ার ব্যবসা আর পলিটিক্যাল কানেকশন সবই আছে। কথায় কথায় ভালোই ঘুরেছি গ্রাম, কিন্তু বাবলু বা আফরাজুল এর মত বন্ধু পাওয়ার পর ডাক্তারকে ঠিক লাগসই মনে হচ্ছিলো না। রাত হয়ে এসেছিলো প্রায় ৯ টা। বাংলোর ঘরে ব্যাগপত্তর রাখার পরই খাবার এর কথা বলে এসেছিলাম। তথ্যের খাতিরে এখানে বলে রাখা ভালো, মাংস পেতে হলে সকালে বলে রাখতে হয় যে দুটো বা তিনটে খাবার জায়গা রয়েছে সেখানে। বা বাজারে গিয়ে নিজে হাতে কিনে দিয়ে আসতে হয়। না আগুন জ্বালিয়ে পিকনিক বনফায়ার এসব করার মতো ভোগে যায়নি এই জঙ্গল এখনও। অতিউৎসাহী না হলে আর জঙ্গলকে চিড়িয়াখানা ভাবার অভ্যেস না থাকলে বনশুয়ার থেকে সজারু দেখা যায়, সাথে হৃদয়ে হৃদয়ে থ্রেডিং এর কাজে ব্যস্ত থাকা অজস্র পাখি।

(কাঠ বাংলো, বেলঘর স্যঙচুয়ারী: তত্বাবধানে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, ওড়িশা)

সে এক অদ্ভুত সকাল, রাতের অত মহুয়া তবু কোনও হ্যাংওভার নেই। রাতের কত বন্ধুকে সকালে দেখা গেলো বাজারে, চোখের সামনে কয়েকশো বছর যেন কেটে গেলো। কত যুগ ধরে ওরা এখানে আছে, ওদের জল জমি জঙ্গল আগলে রেখেছে। ওদের মায়েরা, বোনেরা বউরা কি সুন্দর উল্কি করে আজও মুখে। ওরাও তো বন্দুকের সামনে বাঁচা শিখতে শিখতে এখনও বাঁচা ছেড়ে দেয়নি। সকালে উঠে বুঝতে পারলাম, এখানেও নজর সাহেব বাহাদুর এর। জলপাই পোশাক চারিদিকে, বন্দুকের নলের সামনেই চলে বাজার। চায়ের দোকানে ডাক্তার এর সাথে ডাক্তারের মতোই আরও একজনের সাথে দেখা সকালে। তিনি সিআরপিএফ ক্যাম্প এর রাঁধুনি, কলকাতার পাইকপাড়া অঞ্চলের লোক। তার কাছে খবর ছিলো যে আমরা বাইরে থেকে এসে ঢুকে পড়েছি আগের দিন শেষ বিকেলে। “আপনারা বাঙালি!” বলে আপ্লুত হয়ে চা খাইয়ে দিলেন, কিন্তু ওই যে প্রাণ তো আটকে বাবলু আফরাজুল এর আতিথেয়তায়। ডাক্তার জওয়ান দুজনকেই টাটা বলে আমরা এগিয়ে চললাম কন্ধা পাতাকুড়োনিদের সাথে। এখানে কোন্ধা বলতে মূলত কুটিয়া আর টিকিরিয়ারা। ওদের থেকেই জেনেছিলাম যে যেমিতি কোন্ধারা ওখান থেকে চলে গেছে জঙ্গলের আরও গভীরে সভ্যতা, বিকাশ যেখানে পৌছতে পারে না। জঙ্গলের মধ্যেই জঙ্গলের মানুষদের বনবাস, এই পথেই তো এসেছিলো পাণ্ডবরা তাদের অরণ্যবাসের দিনগুলোতে, পাণ্ডবরা ফিরবে না আর তবে তাদের ফিরতেই হবে আবার যখন আর জঙ্গলে থাকবে না ইনশাস রাইফেল এর হিংস্র চোখরাঙানি থাকবে না কর্পোরেট দের শকুননজর। শীতের শেষে ঝড়া পাতার সময় ছিলো সেটা, কিছু না ফিরতে পারা পাখি ডাক্তার বা ওই রাঁধুনি জওয়ান এর মতোই হয় তো থেকে যাবে কন্ধাদের সাথে। কেউ কেউ কুটিয়াদের সাথে পাতা কুড়োতে চলে যাবে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড় কেউ কেউ দেশিয়াদের সাথে চলে যাবে শুয়োর শেয়াল সজারু শিকারে। ভাগ্যিস, তাদের কোনও ভোট থাকবে না, টাকা আর বন্দুক এর পাহারায় বাজার স্কুল যেতে হবে না।

আমাদের পকেটে ছিলো না কোনও গ্রেনেড কিম্বা সুরেলা ম্যান্ডোলিন, নিয়ে যাইনি কোনও নিষিদ্ধ ইস্তেহারও। আপনমনে গুনগুন করতে করতে পাতাকুড়োতে যাওয়া দুই কোন্ধা ছেলেকে পেয়েছিলাম জঙ্গলের পথে. . . কাসারোদি আর সিঙ্গারোদি। ওদের সাথেই পৌঁছে গেছিলাম জঙ্গলের আরও গভীরে, ওদের চোখেই দেখেছিলাম জঙ্গলের সাথে একাত্ম হয়ে মানুষের বেঁচে থাকার ইতিহাস। কারাবুদি আর থার্থবুদির মতই এই জঙ্গল তাদেরকে মায়ের মত আগলে রেখেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। জঙ্গলের রাস্তা ধরে কিভাবে রায়পুর চলে যাওয়া যায় তাও দেখিয়েছিলো কাসারোদি আর সিঙ্গারোদি, জানিয়েছিলো তাদের পূর্বপুরুষরা সীমান্ত বাটোয়ারার আগে কিভাবে এই জঙ্গলে থাকতো। দখল হওয়া সূর্য তো কোনওদিন ছিলো না তাদের। একটা ঢাল বরাবর পাহাড়ে উঠে গ্যাছে… ঘন আন্ডারগ্রোথ, রুক্ষ্ম জমি। প্রতিটা মুহূর্তে চোখের সামনে থেকে সরে যাচ্ছে ইতিহাস হতে থাকা অরণ্য আর তার শেষ স্বাক্ষর হিসেবে বেঁচে থাক মানুষগুলো। আমরা তো নিজের অজান্তেই ধীরে ধীরে চলে এসেছি পাণ্ডবদের ফেলে আশা পথে, যে পথ চলে যায় মানুষের শোষণের স্বাক্ষর বহন করা আরেক অরণ্যসভ্যতা… যার নাম বস্তার।

ফেরার পথেও কোনও গ্রেনেড ছিলো না পকেটে আমাদের তবে জানতাম এর পরেও অস্ত্র না তুলে নিছকই শোষক এর পক্ষ নিয়েছি আমরাও। আবারও যাবো তাদের দেশে. . . বন্দুক নয় আরও বন্ধু খুঁজতে। যারা দেখতে যেতে চান প্রিয় রাষ্ট্রের শোষণ আর বিশ্বাস করেন অরণ্যের অধিকার তার জাতকদেরই, দারিঙ্গবাড়িতে বরফ দেখার ফাঁকে পৌঁছে যেতে পারেন ওদের অন্তরে। সেক্ষেত্রে, ব্রহ্মাপুর এর বদলে অম্বাডোলা স্টেশনের টিকিট কেটে নেওয়াই ভালো, গাড়ি নিয়ে উইকেন্ড কাটানোর হলে মন্দরমনি রায়চক নেতারহাট মধুপুর এসব তো আছেই।

ছবি ও কাটআউটসূত্র:
1. https://www.downtoearth.org.in/blog/urbanisation/the-push-to-drive-indigenous-people-out-of-forests-62862
2. https://prohor.in/tribal-families-of-odisha-lost-their-homes-after-the-jungle-disappeared-in-one-night
3.https://feminisminindia.com/2020/03/27/niyamgiri-movement-questioning-narrative-developmental-politics/
4.https://thepolicytimes.com/development-and-displacement-of-tribal-population/