দেবাশিস খেটো-র গদ্য

Spread This
Debashish kheto

দেবাশিস খেটো

চার দেওয়াল 
 
 
১ – বদ্ধ ঘরের ভিতর শব্দেরা
 
যে ভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে সরে যাচ্ছি সেই সরণ যদি হঠাৎ একদিন একসঙ্গে অনেকটা তফাৎ তৈরি করে এবং চেষ্টা করলেও সে সরণ কে উল্টোদিকে প্রবাহিত করা না যায় যদি সময়ের মত সে গিলে ফেলে সমগ্র পৃথিবীর মনুষ্য প্রজাতিকে আর সেই গহ্বরের অন্ধকার সিঁড়ি ধরে ধরে দেওয়াল ধরে ধরে গোপন কুঠুরির গুপ্তধন সন্ধানে আমি তুমি দিবারাত্র ক্লান্তিহীন বিশ্রাম বা বিশ্রামহীন ক্লান্তির অস্থিরতায় মগ্ন এবং মগ্ন এবং পা পিছলানোর ভয় নেই প্রতিযোগিতার ভয় নেই প্রত্যাখ্যানের ভয় নেই শুধু ভুলে যাওয়ার ভয় অনেক শব্দের মাঝখানে হারিয়ে যাওয়ার ভয় স্বপ্নভঙ্গের ভয় অথবা কোনোটাই ভয় নয় কেবল একতান্ত্রিকতা – নীচু হতে হতে নীচু হতে হতে একটি সাদা রঙের সরল রেখা কে স্পর্শ করার প্রাণপন চেষ্টা যে রেখার শুরু নেই শেষ নেই অথচ চলছে সেই সময়ের মত এই রেখাচালকের আকর্ষণ বিকর্ষণ মাধ্যাকর্ষণ অদ্ভুত প্রাকৃতিক ফোটন কণার ধর্মের মত পার্থিব অপার্থিব অনন্ত… অন্ধকার চিরে একক…
একটা উল্টানো গামলার ভিতর আটকে আছি যার ভিতরে সবকিছু আছে যা হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে এমন আলো অন্ধকার বাতাস সুগন্ধ দুর্গন্ধ প্রেম ঘেন্না নৈকট্য দূরত্ব অথচ আমি দুহাত বাড়িয়ে শূন্যে ভাসতে পারছি না কিছুই ধরতে পারছিনা…
  গোপন পরামর্শ নিজের সঙ্গে এবং নিজের মত সাজানো চিত্রকল্পে রুদ্রতেজ জরিবুটি সমাধানের মত কিংবা প্রেত-ভুত-প্রেমলোকে অস্পৃশ্য হয়ে বিতাড়িত একার ভাবনায় শুধু জ্যাকপট পাওয়ার ঘোরের মধ্যে রাতের পর রাত স্বপ্নের পর স্বপ্ন ধরে ধরে জমি থেকে আকাশ আবার আকাশ থেকে ধপ্‌ করে জমি এই ওঠাপড়া চলতে থাকে কিংবা সেক্সবর্ধক সেবন ছাড়াই অদ্ভুত সেক্স বাড়তে থাকে আর অজানা ছবির মত চেনা দৃশ্য বদলে যায় যে বদলানো শারীরবৃত্তীয় তীব্র কষ্ট বা মাথার যন্ত্রণা থেকে উৎপাদিত হয় আর দিনের পর দিন জুড়তে জুড়তে একটি যন্ত্রণা গ্রাফ তৈরি হয় যার একটি একক সময় অথবা ক্ষয় আর একটি একক তীব্রতা অথবা ভয়ার্ততা একটি মামুলি হারিয়ে যাওয়া ভিখারির মত পথের অবারিত আহবান সত্ত্বেও নিঃস্ব একা বসে থাকে অপেক্ষা করে কবে হঠাৎ একটা মহামারী এসে সকলকে মেরে ফেলবে কেবল আমি ছাড়া আমার পরিবার ছাড়া আমার বন্ধুবান্ধব ছাড়া সবাই মরবে আর রাস্তা একা পড়ে থাকবে স্থবির সংসারী…
 
 
২ – একটি পুরোনো স্মৃতি
 
সে ঘরে ঢুকেই ছিটকিনি দিয়ে দিত যাতে বাইরের কেউ প্রবেশ করতে না পারে সে ঘরে ঢুকেই বিছানায় ঘেঁসে বসত যাতে ফিস্‌ফিস্‌ করে কথা বলতে পারে অথচ ঘরের মধ্যে কেবল ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ কিছুক্ষণ ছাড়া ছাড়া পাতা ওল্টানোর শব্দ গভীর উপন্যাস যাপন যা দৃশ্যত সুঠাম শান্ত স্বাভাবিক স্তব্ধ দুর্গম তবুও ওভাবেই মেয়েটি বলত বা বলতে না পারাটাই ওর তীব্র বলা বা মৌন থাকতে থাকতে বার বার চার দেওয়ালের মধ্যে একজনকে খাঁচা বন্দী করতে করতে তার ব্যক্তিগত শারীরবৃত্তীয় উষ্ণ প্রস্রবণের উদাম খোলা জানালার মতো মননে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বার বার ধরা পড়ে যাওয়া এবং আদৌ সে গৃহে প্রবেশ করতে না পারা অথচ সেই গৃহেই বদ্ধঘরের বিছানায় বসে মৌনতা সম্মতি বলে যুগ যুগ অপেক্ষারত কোনো শরীরসুন্দরীর একাকী হেরে যেতে যেতে ভেঙ্গে যেতে যেতে হারিয়ে যেতে যেতে চিট্‌ফান্ডের এজেন্ট ইন্‌কামের টাকার হিসাব করতে করতে নিজের বাঁধা শিকল নিজেই খুলে প্রাণপন ছুটতে ছুটতে নিজের অভাবের সংসারের দিকে চলে গিয়েছিল আক্ষেপে আক্ষেপে ভরে যেতে যেতে…
আর আজ যে মগ্নতায় এক রাশ আকাশ কল্পনাবন্দি যে মহা সময় নিজেই নিজেকে থমকে থাকার কল্পনা জগতে সারা মাঠ সবুজের মত ছড়িয়ে রেখেছে এখানে একান্ত ব্যক্তিগত কলম বা রংতুলির চেয়েও বড় একটা সভ্যতার দেওয়াল বা শিখর বলতে পারি এই মুহূর্তে সেই সব উচ্চাঙ্গ নিম্নাঙ্গ কৃত্রিমাঙ্গ বিকলাঙ্গ হাতের অজস্র ঘুঁটে দেওয়ার দেওয়াল…
এক একটা নতুন শব্দ শিখছি আর থপ্‌ করে দেওয়ালে লেপে দিচ্ছি নিজস্ব স্বরচিত ঘুঁটে সুগন্ধী বা দুর্গন্ধী জল অথবা বারুদ সবাই সাপ্লুডো খেলছি আর কো-মরবিড শব্দের প্রকৃত অর্থ বুঝে ওঠার জন্য ঢুকে পড়েছি আস্ত একটা রহস্য উপন্যাসের ভিতরে…
উপন্যাস যাপন যদি মিথ্যা সাজানো গল্পের মত হয় তাহলে লক্‌ডাউনের চার দেওয়ালের মধ্যে সমগ্র আকাশ টুকরো টুকরো ভেঙ্গে পড়বে আর তুলির আঁচড় কাটার হাত কিছুতেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না কারন মেয়েটি আবার ঘরভর্তি সান্ধ্য আড্ডায় গা-ঘেঁসে বসে আছে (ওর মৌন মুখে কিছু কথা বসিয়ে দেওয়া যাক)
জানতাম তোমার দৌড়
কেন! আমি কি জীবনে কম ছোটাছুটি করেছি একবার পর্বত শিখর একবার সমতল একবার জলতল সর্বত্র শুধু তুলির আঁচড় টানার ছন্দ খুঁজেছি গুনে গুনে ডুব গেলেছি উঠবোস করেছি
ওসব তোমার কল্পনা নিজের কাছে নিজেকে প্রমান করতে চাওয়া বা অসহায় বোধ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস মাত্র
তাতেও একটা শিল্পবোধ থাকে প্রেম থাকে
প্রেম শব্দ তোমার মুখে মানায় না যে কিনা নিজেকে বেঁধে রেখেছ গাছের গুঁড়ির সঙ্গে আর ফাঁকা মাঠে অনেক ঘাসের স্বপ্ন দেখতে দেখতে বৃত্তাকারে নিজের সীমার মধ্যেই ঘাস খেয়ে চলেছ যা নাকি তোমার উপন্যাস যাপন যে ভাবে তুমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলে তোমার মহান একাকিত্বের মধ্যে সারা পৃথিবী আর তুমি নিপাট চরিত্রবান – একবার এই চার দেওয়াল ছেড়ে বের হয়ে দ্যাখো রাস্তাঘাট কতটা সচল কত মানুষ অকারণে নিজেকে ভেঙে ফেলে টুকরো টুকরো ছড়িয়ে যায় বাতাসে বাতাসে সুগন্ধ বা দুর্গন্ধ সে তুমি যাই বলোনা কেন ওসব আপেক্ষিক তোমার নিজের চাওয়া পাওয়ার ইচ্ছার উপর…
 
৩ – একটা অর্থহীন ভালোলাগা
 
যে চিরকাল বদ্ধ ঘরে একা একা থাকতে ভীষণ ভালোবাসে তার কাছে ছোট বড় বা দীর্ঘ বা সীমিত কি না একদম অপ্রাসঙ্গিক এবং সে নিজের একোরিয়াম ছেড়ে মোটেই বেরোতে চায় না ওই বাইরের জগতে যেখানে একই বাতাস থেকে সকলকে অক্সিজেন নিতে হয় একই পথ দিয়ে সবাইকে চলতে হয় যেখানে কারো নিজস্ব বাতাস নিজস্ব রাস্তা নেই কারো নিজের নিজের গাছ নেই নিজের নিজের ফসল ফলানোর বাগান নেই নিজস্ব পাখি নেই নিজস্ব পালিত পশু নেই – তবু তারা সবাই নিজেরটুকু ছাড়া কিছুই বোঝে না কিছুই বুঝতে চায় না আসলে সব চায় সব অধিকার করতে চায় একা সবটুকু খেয়ে নিতে চায় আর যাদের কারো কারো নিজস্ব গাছ আছে দুদন্ড বসে গল্প করার পোষ্য আছে বাগান আছে নিজস্ব ঘাসের বিছানা আছে তাদের একটুও ইচ্ছা নেই অন্যের কেড়ে খাওয়ার যদিও রাতের সাইক্লোন তাদের ঘাসের বিছানা কেড়ে নিয়েছে গাছেরা আহত অথবা মৃত কতজন মারা গেছে কাল রাতে সে সংখ্যা কি গাছেদের বাদ দিয়ে বা সাঁতার জানা মানুষটার বন্ধু পশুদের বাদ দিয়ে যে পাখিদের মৃতদেহ শায়িত লাইন দিয়ে তাদের বাদ দিয়ে…
তার চেয়ে এটুকুই ভালো আমার একা থাকা একার অভ্যাস হিংসা নেই ঘৃণা নেই ভালোবাসাও নেই বোধহয় কারন আমিও তো একা গোপনে সবটুকু খেতে ভালোবাসি আর প্রেম কথাটা আমার মুখে মানায় না বলে এই জলহাওয়ায় বড় হয়ে উঠেছি বলেই বার বার স্বার্থপর হতে খুব ভালো লাগে আমি প্রতিদিন গৃহস্থের আসবাবপত্রের মত ঠোক্কর খাচ্ছি অন্যের ইচ্ছায় এদিক সরছি ওদিক সরছি অথবা বাজারে অপেক্ষাবৃত্তে অপেক্ষা করছি দূর থেকে হাত বাড়িয়ে জিনিস নিচ্ছি হাত বাড়িয়ে টাকা দিচ্ছি নিচ্ছি পিছন থেকে কেউ কথা বলে ফেললেই মনে হচ্ছে ঘাড়ের কাছে এসে গেছে (ঘেন্না ঘেন্না বাড়ি ফিরে ভালো করে সাবান দিয়ে চুলগুলো ধুতে হবে ) আর আমি গর্জে উঠছি
কি মশাই বয়স হয়েছে বাড়িতেই তো থাকতে পারতেন না হলে অন্তত দূরত্বটা মেইনটেন করুন
আমার বাড়িতে আমিই সর্ব কনিষ্ঠ তাই আমিই আমাকে বাজারে পাঠিয়েছি এবং অনেকটা দূরেই আছি
বুঝলাম আমি উল্টোদিক থেকে ভাবতে পারছি না আর আমার স্বভাব সমাজের সঙ্গে বেশ মিলমিশ হয়ে যাচ্ছে আমি ছুচিবাইগ্রস্থ ছিলাম এবং সেই সুপ্ত গ্রস্থতা আজ প্রকট এবং বেশ মানিয়ে উঠেছে আমার দৈনন্দিন জীবনে খুবই সচল হয়ে উঠছি সবকিছু সাবান দিয়ে ধুয়ে ধুয়ে মুক্ত করতে চাইছি বাইরের কলে পা ধুয়ে বাড়িতে ঢুকছি বাজার সহ বাথ্রুমে ঢুকে সবকিছু ধুচ্ছি সবজি মাছ মাংস ব্যাগ টাকা চশমা জামা প্যান্ট নগ্ন হয়ে নিজেকে ধুচ্ছি সন্দেহ ধুচ্ছি ভয় ধুচ্ছি আতঙ্ক ধুচ্ছি পিছন থেকে বৃদ্ধের কথা ধুচ্ছি বাজারের হাজার হাজার মানুষের কথা নিঃসৃত বাতাসে বাতাসে উড়ন্ত সম্ভাবনা ধুচ্ছি… মাঝে মাঝে অফিসও যাচ্ছি একান্ত না গেলে নয় তাই নিয়ম রক্ষা করা আরকি অফিসের গাড়িতে দূরত্ব বজায় রেখে বসা মাত্রই মনে হচ্ছে এখানে আমার আগে যে বসে ছিল তার সকল সম্ভাবনা আমার পিছনে জড়িয়ে ধরেছে এটা ধুতে হবে ভাবতে ভাবতে পকেট থেকে ছোট্ট স্যানিটাইজার কৌটো থেকে কয়েক ফোঁটা হাতে নিয়ে হাতের সন্দেহ মুক্ত করলাম কারন ওঠার সময় গাড়ির হাতলে হাত দিয়েছি… এভাবে চলছি মুখে চাপা দিয়ে যান্ত্রিক শব্দ করে কথা বলছি না বললে ঘাড় নাড়ছি সকল আপন কে দূরে দূরে ঠেলে দিচ্ছি সেও দিচ্ছে সবাই সরছি বাইরে অন্তরে সত্তায় সরছি ঘন্টাখানেক অফিস করে সটান বাড়ি ফিরে আসার কোন মজা বা উৎসাহ বা নিরুৎসাহ কিছুই বোঝার অবস্থায় পাচ্ছিনা চা-এর দোকান আড্ডা সিগারেট কিছুই ধরতে পারছিনা হাত বাড়াতে চাইছি আবার পরক্ষণেই হাত গুটিয়ে নিচ্ছি ভালোবাসছি পরক্ষণেই ঘৃণার ব্যবহার করছি আর মনে মনে বা মোবাইলে মোবাইলে দূরে দূরে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভালোবাসা নিবেদন করছি সম্পর্ক বজায় রাখছি একটা বৃহৎ ভার্চুয়াল আচ্ছন্নতায় অনিচ্ছা সত্বেও ঢুকে পড়ছি আত্মকেন্দ্রিক এক ভিনগ্রহে…