সমীরণ দাস-এর প্রবন্ধ

Spread This
Samiran Das

সমীরণ দাস

স্বপ্নময় স্বপ্নভুক                                             
            
মধুকবির জীবন নিয়ে একটি ক্ষুদ্রকায় নিবন্ধ পাঠ করেছিলাম বহু বছর আগে আমার প্রথম যৌবনে, অনেকেই পড়েছিলেন, তবুও হয়তো শুধু আমাকেই লেখাটা রক্তের মধ্যে বহমান স্বপ্নের মতো তাড়া করে চলেছিল বছরের পর বছর। যেমন ভাবে তাড়িত হয়েছিলেন বালক মধুসূদন কবি আলেকজান্ডার পোপের একটি বাক্যবন্ধে — কবিতার জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায়, এমনকি মা-বাবাকেও। আমি একজন প্রতিভাহীন ক্ষুদ্র লেখক, মা-বাবাকে ত্যাগ করার কথা ভাবতেও পারিনি। তবে ত্যাগ করতে পেরেছিলাম মোটামুটি ভালো বেতনের চাকরির শেষ কয়েকটি বছর। আর জীবনের অমুল্য দশটি বছর, যে সময়কালের মধ্যে অন্য কোনো গল্প বা উপন্যাস  আমি লিখতে পারিনি। বা লিখিনি। হয়তো মাইকেলই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছিলেন তাঁর জীবন-ভিত্তিক উপন্যাস  “মধুময় তামরস” – সেজন্য। 
             বেশ কয়েক বছর যাবত মধু-ভাবনা বহন করার পর, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আলোড়িত হওয়ার পর, একটু একটু করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর শুরু হল খোঁজ খবর নেওয়া। বইপত্র সংগ্রহ করা। মাইকেল মধু চাইতেন, মৃত্যুর পর প্রিয় বন্ধু গৌরদাস বসাকই তাঁর জীবনী লিখবেন। গৌরদাস উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন, উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মচারিও ছিলেন, কিন্তু মহাকবির জীবনী লেখার ক্ষমতা হয়তো তাঁর ছিল না। তিনি সেই চেষ্টা করেনও নি। যদিও তিনি সংগ্রহ করেছিলেন মধু জীবনীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সেই সমস্ত তথ্য পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র লালবিহারী বসাক মারফত চলে যায় নগেন্দ্রনাথ সোমের কাছে। মধুসুদনের আরও একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রাজনারায়ণ বসু, যাঁর সাহিত্য বিষয়ক পরামর্শের ওপর কবি আস্থা রাখতেন। সেই রাজনারায়ণ বসুও সংগ্রহ করেছিলেন তাঁর জীবনের অনেক তথ্য। তিনি সংগৃহীত সমস্ত তথ্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যোগীন্দ্রনাথ বসুকে, যিনি প্রথম মাইকেলের  জীবনীগ্রন্থ “মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত” রচনা করেন কবির মৃত্যুর একুশ বছর পর ( বাং ১৩০০ সাল)। সেটি একটি আকর গ্রন্থ হলেও ছিলনা কবির মাদ্রাসবাস ও লন্ডন-ফ্রান্স প্রবাস সংক্রান্ত যথেষ্ট তথ্য। একটি জীবনী উপন্যাস লেখার জন্য সেই সমস্ত বৃত্তান্ত ছিল অতি আবশ্যিক। এই গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার আরও সাতাশ বছর পর     ( বাং ১৩২৭ সালে ) নগেন্দ্রনাথ সোম লিখেছিলেন “মধুস্মৃতি” সেই গ্রন্থে মধুকবির জীবনীর সঙ্গে ছিল অনেক টুকরো স্মৃতিকথা। টুকরো ঘটনা। একটি জীবন ভিত্তিক উপন্যাস লেখার জন্য যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু কেবলমাত্র এই দুটি গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করেই “মধুময় তামরস” লেখা সম্ভব ছিলনা আমার পক্ষে, যদি না পেতাম অত্যন্ত গুরুত্ব পূর্ণ আরেকটি জীবনী গ্রন্থ— গোলাম মুরশিদের গবেষণা মূলক  রচনা “আশার ছলনে ভুলি” ( ইং ১৯৯৫ সাল )। সংগ্রহ করলাম সুরেশ্চন্দ্র মৈত্রের “মাইকেল মধুসূদন দত্ত জীবন ও সাহিত্য”, বনফুলের দুটি নাটক “শ্রী মধুসূদন” ও “বিদ্যাসাগর”। দেখলাম মধু বসু পরিচালিত চলচ্চিত্র “মাইকেল মধুসূদন”,  এইসব ছাড়াও বাহান্ন খানি গ্রন্থ আমাকে সংগ্রহ করতে হয়েছিল, অধ্যয়ন করতে হয়েছিল কবি মধুসুদনকে বুঝতে, তাঁর  চরিত্র নির্মাণ করতে। পেরেছি কি না শ্রদ্ধেয় পাঠক বলবেন। 
          একজন প্রকৃত অর্থে প্রতিভাবান, বহুমাত্রিক ও বর্ণময় মানুষের জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখায় সব থেকে বড় সমস্যা, সেই জীবন ও সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে অনুধাবন করা।  সঠিক ভাবে জানা। জীবনের সবকটি মাত্রা ঠিক মতো ধরতে না পারলে তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখা অসফল হতে বাধ্য। আমার দ্বিধাগ্রস্ততার আরও একটি কারণ ছিল – কয়েক বছর আগে শ্রদ্ধেয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একই সময়কে চিত্রিত করে লিখেছেন মহতী উপন্যাস “সেই সময়“ মাইকেলের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস লিখতে গেলে উনবিংশ  শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকে সাতের দশক পর্যন্ত ভালো ভাবে জানা প্রয়োজন।  আমার কি ক্ষমতা আছে সেই সময়কে যথার্থ ভাবে চিত্রিত করার? আমার কি ক্ষমতা আছে মাইকেলের মতো মহাকবিকে ঠিক ঠিক মতো বোঝার ? বস্তুত এই সমস্ত প্রশ্নই আমাকে দিনের পর দিন ভাবিয়েছে। বিব্রত করেছে। অস্থির করে তুলেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে , থাক!  কী দরকার উন্মাদের মতো একটা লেখার পেছনে ছোটার ? যে দীর্ঘ সময় ও অমানুষিক শ্রম আমাকে দিতে হবে এই একটা উপন্যাস লেখার জন্য, সেই সময়কালের মধ্যে আমি দশটি উপন্যাস ও পঞ্চাশটি ছোটগল্প লিখে ফেলতে পারব। অনেক দিন নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থেকেছি, উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি ভাবনাটাকে। কিন্তু ভাবনা আমাকে ছাড়েনি। কিছুদিন পর আবার আমার কাঁধের ওপর এসে বসেছে আরব্য রজনীর সিন্দবাদের ওপর চেপে বসে থাকা বৃদ্ধের মতো। শেষ পর্যন্ত পড়তে শুরু করলাম। জীবনী গ্রন্থ ছাড়াও সংগ্রহ করলাম বিনয় ঘোষ সম্পাদিত “সাময়িক পত্রে বাংলার সমাজ চিত্র”, “বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ” , ইন্দ্রমিত্রের “করুণাসাগর বিদ্যাসাগর”, সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের “মনু সংহিতা”,  “মধুসূদন রচনাবলী” ও আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের বই। কিনলাম হাওয়ার্ড ফাস্টের সুবিখ্যাত উপন্যাস “স্পার্টাকাস” , আরভিং স্টোনের  লেখা ভ্যান গঘের জীবনী উপন্যাস “লাস্ট ফর লাইফ”, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের “শাহজাদা দারা শুকো”, সমরেশ বসুর অসম্পূর্ণ উপন্যাস “দেখি নাই ফিরে”। সমস্ত বই পর পর পড়তে শুরু করলাম অখণ্ড মনোযোগ সহকারে। পড়তে পড়তেই কেটে গেল দুই বছর। তবুও পারব, কি পারব না —  এই দ্বিধা থেকে উত্তরণ ঘটল না। এই সময় একজনের সহযোগিতা ও সুপরামর্শ আমাকে সমস্ত দ্বিধা জয় করতে সাহায্য করল। তিনি বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক  শ্রদ্ধেয়া সুমিতা চক্রবর্তী। ওঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ দিনের পরিচিতি। আমার লেখা-পত্র উনি পছন্দও করেন। একদিন তাঁকে বললাম আমার দীর্ঘ লালিত স্বপ্নের কথা। আমি কী কী বই সংগ্রহ করেছি, পড়েছি  এবং কীভাবে এগোতে চাই। উনি বহুক্ষণ  আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, খুব কঠিন কাজ। মধুসুদনের মতো একজন মহাসাগরতুল্য মেধাসম্পন্ন, চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী, আপসহীন, দাম্ভিক — একই সঙ্গে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত মানুষকে  ঠিক ভাবে চিত্রিত করা সহজ সাধ্য নয়। তবে যেভাবে এগোতে চাইছেন, মনে হয় আপনি পারবেন । আত্মবিশ্বাস রাখুন, পরিশ্রম করুন, জয় আপনার হবেই। 
             ওই একটি কথাই আমাকে উদ্দীপ্ত করে তুলল। বুঝতে পারলাম, আমার সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব হাওয়ার মতো কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। ঘোরের মধ্যে বাড়ি ফিরে এলাম। আবার ডুবে যেতে চাইলাম পড়াশুনোর মধ্যে। ছেলে একদিন মজা করে বলল, বাবা, তুমি কি আবার স্কুলে ভর্তি হয়েছ নাকি ? 
               আমি কয়েক মুহূর্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলাম, হ্যাঁ রে বাবা, তবে সেটা অনেক কঠিন স্কুল। পাস করতে পারব কি না জানিনা। 
               ছেলে কী বুঝল, জানি না,পাশের ঘরে চলে গেল। কিন্তু সমস্যা শুরু হ’ল অন্য দিক থেকে। আমি চাকরি করতাম ব্যাঙ্কে। অফিসে যেতে সময় লাগত প্রস্তুতি সহ প্রায় দু ঘণ্টা। ফেরা ও বিশ্রাম দু ঘণ্টা। অফিসের সময় দশটা থেকে পাঁচটা। মোট এগারো ঘণ্টা অফিসের কাজে ব্যয় করার পর এই বিপুল পরিশ্রমের কাজ সুষ্ঠু ভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠছিল না। ক্রমশ বয়স বেড়ে যাচ্ছে , বার বার প্রশ্ন জাগছে , কী করব? চাকরি না মধুকবির জীবন ভিত্তিক উপন্যাস? দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তত দিনে ব্যাঙ্কে পেনসানের ব্যবস্থা হয়েছে। কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন দিলাম চাকরি ছেড়ে। আমার মাসিক আয় এক ধাক্কায় পঞ্চাশ হাজার থেকে নেমে এলো কুড়ি হাজারে। আত্মীয়-স্বজন, পরিবারের লোকজন কেউই ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিতে পারল না। সকলের বক্তব্য , চাকরি ছেড়ে বহু লক্ষ টাকা লোকসান হয়ে গেল তোমার। এই বোকামি কেউ করে? মনে মনে ভাবলাম, তোমরা শুধু টাকার দিকটাই দেখছ, সৃষ্টির দিকটা দেখছ না। বোকামিও তো কাউকে না কাউকে করতে হয়। অনেক সৃষ্টিধর্মী কাজের পেছনে আছে তথাকথিত বোকারাই। 
              ফের নতুন ভাবে  শুরু হল আমার কাজ , মাসের পর মাস শুধু পড়া আর লেখা। লিখি আর মাঝে মাঝে ফোনে সুমিতাদির সঙ্গে কথা বলি। উনি প্রতিবারই আমাকে উৎসাহ জুগিয়ে বলেন, লেখা কিন্তু ছাড়বেন না। ভালো কাজ কঠিনই হয়। আমি চোয়াল শক্ত করে মেনে নিই ওঁর কথা। প্রথমে মনে হয়েছিল, তিনশো পৃষ্ঠায় শেষ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওটার খসড়া বাড়তে বাড়তে তেরোশো পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গেল। তখন আমার ল্যাপটপ ছিল না,  কালি-কলম দিয়েই  লিখতাম। তেরোশো  পৃষ্ঠা লিখতে লিখতে  নিঃশেষিত হয়ে গেলাম। শুয়ে পড়ে রইলাম কয়েক দিন। হাতে ব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা, সমাজ বিচ্ছিন্ন একটা মানুষ। লেখা চলা কালীন বার বার মনে হত, এই বিশাল লেখা কে ছাপবে? আমার সমস্ত চেষ্টা পণ্ডশ্রম হয়ে যাবে না তো ? সবে লেখাটির খসড়া হয়েছে, পুনর্লিখন করতে হবে, প্রয়োজনে আবার লিখতে হবে। এই ভূতের বেগার না খাটলে কি চলছিল না? সুমিতাদি বললেন, হাল ছাড়লে চলবে না। রবীন্দ্রনাথ একবার রামকিংকরকে বলেছিলেন , যা ধরবে , শক্ত করে ধরবে। 
              আমি মনে-প্রাণে গ্রহণ করলাম রবীন্দ্রনাথের কথা। মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর-পাতন। আবার শুরু করলাম, কোনো জায়গা ফেলে দিলাম, আবার নতুন করে লিখলাম। আমি দিনে  তিন বার লিখতে বসি — সকাল দশটা থেকে বারোটা, সন্ধ্যা ছটা থেকে আটটা, রাত বারোটা থেকে দুটো। একদিন অনেক রাত, লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ কাঁধের ওপর করস্পর্শ। চমকে তাকিয়ে দেখলাম, অতুল বসুর ছবি থেকে বেরিয়ে এসে লম্বা কোট -প্যানটুলুন পরা, মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ও মাথার মাঝখানে সিঁথি করা মানুষটি এসে দাঁড়িয়েছেন আমার পাশে। আমি স্তম্ভিত, বিস্মিত, উত্তেজিত। প্রণাম করতেও ভুলে গেলাম। তিনি বললেন, আমি এসেছি কেন জানিস?
          এতক্ষণে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে তাঁকে প্রণাম করে বললাম, না। 
           তিনি বললেন, এতকাল সকলে আমার বাইরের নাটকীয়তাই দেখেছে। অন্তরাত্মার কান্না  শোনেনি। তুই কি সেটা শুনতে পাস ? 
           আমি ফের তাঁকে প্রণাম করে বললাম, আমি তো শুধু ওটাই শুনতে পাই মহাকবি । 
            তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন তাঁর প্রশস্ত বুকের মধ্যে। আবার মনে হোল, আমি পারব, অবশ্যই পারব। 
          তারপর তাকিয়ে দেখলাম, আমার কন্যা, বাবা ঘুমোতে যাও, বলে আলো নিভিয়ে দিয়ে পাশের ঘরে চলে যাচ্ছে। আর আমি চেয়ার থেকে উঠে এসে ঢুকে যাচ্ছি বিছানার মধ্যে। সেই রাতে আর ঘুম হয়নি। 
          মধুসূদন যখন হিন্দু কলেজে পড়েছেন, সেই সময় থেকেই সকলে জেনেছেন, তিনি সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা এক মহাপ্রতিভা। মধু তখন সিনিয়র বিভাগের ছাত্র, রামগোপাল ঘোষ নামে একজন ডিরোজিয়ান “ভারতীয় নারীদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা “বিষয়ে একটি রচনা প্রতিযোগিতা আহ্বান করেছিলেন। ঘোষণা হয় দুটি পুরস্কারের – একটি স্বর্ণপদক  ও একটি রৌপ্যপদক। সকলে ধরে নিয়েছিলেন স্বর্ণ পদক পাবেন ক্লাসের পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ছাত্র ভূদেব মুখোপাধ্যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভূদেব পেয়েছেন রৌপ্য পদক। স্বর্ণ পদক পেয়েছেন মধুসূদন। তাঁর লেখার দৃষ্টি ভঙ্গিই ছিল অন্য রকম। মধু লিখেছিলেন , “ — in india , women are looked upon as created merely to contribute to the gratification of the animal appetites of men — the people of this country do not know the pleasure of domestic life. —- “ একজন কিশোর যে এভাবে ভাবতে পারে, অন্যেরা কল্পনাও করতে পারেন নি। 
          মধুসূদন ছিলেন গ্রন্থকীট। খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করার পর হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। দেড় বছর সময় অপচয়িত হওয়ার পর ভর্তি হয়েছিলেন শিবপুরের বিশপস  কলেজে। সেখানে মাত্র বারো জন ছাত্র। সব সময় বন্ধু পরিবৃত হয়ে থাকা মধুর সময় কাটবে কীভাবে ? হতাশ হয়ে  গৌরদাসকে লিখলেন , এ কোন নির্বান্ধব জায়গায় এসে পড়লাম আমি? বন্ধু ছাড়া যে আমার একটি দিনও কাটে না। আমার সময় কাটবে কীভাবে? কিন্তু তৃতীয় দিনেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। লাইব্রেরিতে গিয়েই অবাক হয়ে গেলেন মধুসূদন। বিশাল হল ঘরের মধ্যে আলমারি ভর্তি বই। হাজার হাজার বই , জ্ঞানের সমুদ্র। সাহিত্যের বই , ভাষা শিক্ষার বই , ল্যাটিন সাহিত্যের বই , গ্রিক ভাষার বই , হিব্রু ভাষার বই , সংস্কৃত সাহিত্যের বই , নাটক, কাব্য। দশ বারো বছর টানা পড়েও এই সব বই শেষ করা যাবে না। মধুর মনে হোল, হাজার হাজার বইয়ের কোটি কোটি অক্ষর যেন আমাকে ডাকছে, এসো মধু, এসো। আমরা তো তোমার জন্যেই অপেক্ষা করে আছি। তুমি এসে আমাদের পড়বে, আর আমরা মুক্তি পাব। বইয়ের বুকের মধ্যের বন্দীত্ব থেকে মুক্তি পাবো। 
           একই সঙ্গে মাইকেল ছিলেন অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করা প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব। ব্যারিস্টারি পাস করে আসার পর হাইকোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। ওঁর চারপাশের যত  উকিল, ব্যারিস্টার, জজ — কেউই ওঁর সমকক্ষ নন। শ্বেতাঙ্গরা ওঁকে দাবিয়ে রাখতে চান। একজন নেটিভ কেন সবার ওপর মাথা তুলবে?  কিন্তু উনি কাউকেই পরোয়া করার লোক নন। মধুসূদন উচ্চৈঃস্বরে সওয়াল জবাব করতেন। সেই সময়ের অত্যন্ত দাম্ভিক ও প্রতিপত্তিশালী জাস্টিস জ্যাকসন একদিন ওঁর চড়া গলায় আপত্তি করে বললেন, Mr Dutt, The court orders you to plead slowly. The court has ears.
             মধুসুদনের পসার তখনো জমছে না। অন্য কোনও ব্যারিস্টার হলে জ্যাকসনকে একটু সমঝে চলতেন। কিন্তু আত্মগর্বী মধু মাথা নিচু করতে রাজি নন। সঙ্গে সঙ্গে বললেন , But pretty too long My lord. যে উকিল সকলের সামনে জজকে কান লম্বা গাধা বলতে দ্বিধা করেননা , তাঁর পসার যে জমবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। বাস্তবে হয়েছিলও তাই, সমস্ত রকম যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মাইকেল কখনো পসার জমাতে পারেন নি। এই রকম একজন আপসহীন, বর্ণময়  মানুষকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এতো দিন কেন উপন্যাস লেখা হয়নি, সেটাই আশ্চর্যের। ভাগ্যিস লেখা হয়নি বলেই লিখতে পেরেছিলাম ” মধুময় তামরস।” 
          উপন্যাসটি লিখতে লিখতে ও লেখার পর নানা রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। অনেক বন্ধু আমার সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁদের প্রতি আমার ভালবাসা। আবার কিছু তথাকথিত বন্ধু লেখার সময় উৎসাহ দিলেও প্রকৃত পক্ষে চাননি আমি কাজটি সম্পন্ন করতে পারি। যেজন্য লেখাটি শেষ হওয়ার পর তাঁদের মুখে হাসি ও আনন্দের পরিবর্তে দেখেছি ভাবলেশহীন গাম্ভীর্য। কিন্তু পুস্তক প্রকাশের পর পাঠক-প্রতিক্রিয়া ছিল আমার প্রত্যাশার বাইরে। এখনো পর্যন্ত একজনও পাঠক পাইনি, যিনি “মধুময় তামরস” পড়ে হতাশ হয়েছেন। তাঁদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা আমার সমস্ত অপ্রাপ্তি, হতাশা, যন্ত্রণা, শ্রম ভুলিয়ে দিয়েছে। আমার বইয়ের প্রথম গ্রাহক সুন্দরবন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রী সুবীর সেন ও  কলকাতার বিখ্যাত নাট্য সংস্থা “কৃষ্টি সংসদ”-এর প্রবীণ সর্বজন শ্রদ্ধেয় অভিনেতা চন্দ্রকান্ত মন্ডল উপন্যাসটি পাঠ করে যেরকম স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা করেছিলেন, ভুলতে পারিনি। বুঝতে পেরেছিলাম, আমি ভুল করিনি। আরও অনেক পাঠকের প্রশংসা “মধুময় তামরস” পেয়েছে, যেজন্য লেখক হিসেবে সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।       
            কিন্তু দুঃখ পেয়েছিলাম খিদিরপুরে মধুপিতা রাজনারায়ণ দত্তের পুরনো বাড়িতে গিয়ে। দেখেছিলাম বাড়িটার জীর্ণ দশা। চারিদিক জঙ্গলে আকীর্ণ, নানা স্থানে ফাটল। মনে হয়েছিল, যে কোনো সময় ধ্বসে যেতে পারে বাড়িটা। আশপাশের লোকের মুখে শুনলাম, বাড়িটা আর বেশিদিন থাকবে না। প্রমোটার থাবা বাড়িয়েছে ওটার দিকে। তখন বার বার মনে হচ্ছিল, যশোরের সাগরদাঁড়িতে মধুকবির ভিটের কথা। কত ভালবাসা, যত্ন ও মর্যাদা সহকারে সেটার রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। প্রতি বছর জন্ম দিনে আয়োজন করা হয় মধুমেলার। সারা পৃথিবী থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন, অথচ এই বঙ্গে, যেখানে মধুকবির জীবনের সার অংশটা কেটেছে, সেখানে তাঁর বাসস্থানের কোনো মর্যাদা নেই। 
               ফিরে আসতে আসতে বিড় বিড় করে উচ্চারণ করছিলাম, আমাকে ক্ষমা করো মহাকবি। আমি লজ্জিত এই বাংলায় তোমার বাসস্থানের অবস্থা দেখে।