তিস্তা রায়চৌধুরী-র প্রবন্ধ

Spread This
Tista Roychowdhury

তিস্তা রায়চৌধুরী

গুপী গাইন বাঘা বাইন’ : প্রসঙ্গায়ন ও পুনর্পাঠ

সাহিত্যের পালাবদলের ঘোড়দৌড়ে যে বিবিধ বিস্ময়ের সতত পরিভ্রমণে ফুটে ওঠে আমাদের শৈশব থেকে বর্তমান, সেই আঙিনায় শিশুসাহিত্য যেন এক দিগভ্রান্ত নাবিকের হঠাৎ পাওয়া সার্চলাইট। ঝটিতে মনের কিনারে যে দ্বার উন্মুক্ত হয় তা কেবল আত্মস্মরণের নয়; আত্মানুসন্ধানেরও। তাই শৈশব হয়ে ওঠে সমকাল।

*শিশুসাহিত্যে গুপী গাইন বাঘা বাইন*

‘শিশুসাহিত্য’ ; যার নাম কখনও হয়েছে ‘রূপকথা’, কখনও ‘ছড়া’, কখনও বা ‘ননসেন্স সাহিত্য’। আসলে, সারমর্মটি রয়েছে একই, বদলে গেছে আঙ্গিক; দেখার পরিধি৷ যদিও সে ইতিহাস পালাবদলের। বলা বাহুল্য, ‘শিশুসাহিত্য’ নিয়ে যে গুটিকয়েক কাজ হয়েছে; তার আদিপর্বেই বোধহয় মনে পড়ে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীকে। মানুষের যে সহজাত শুভত্ব, তাকে কেন্দ্র করেই উপেন্দ্রের বকলমে তৈরি হয় গুপী গাইন বাঘা বাইন। নির্ভেজাল নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গীতে এ যেন এক অন্য মাত্রার গল্প বলে। গান গাইতে গাইতে ‘গায়েন’ হয়ে ওঠা কিংবা ‘বাঘের মতো তেড়ে ফুঁড়ে’ যাওয়া ‘বাঘা’ কীভাবে যেন হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার আদ্যন্ত আলুভাতে গৃহস্থ। যারা শখে কিনে আনে ‘গোলাপচারা’ -র মতো স্বপ্ন। কিন্তু, এ তো শিশুদের জগৎ, তাই সমস্ত না পাওয়াই এখানে পাওয়া হয়ে ওঠে। গল্পের শেষে তাই দেখতে পাই ‘হ্যাপি এন্ডিং’। এও শিশুসাহিত্যের একটা কৌশল। পান্তাভাতে স্রেফ আলুনি হয়ে যাওয়া জীবনে আঁশটে গন্ধের মতো। গল্পের সর্বজ্ঞ কথক তাই বুনে যান একের পর এক ছবি। সেই ছবিতে ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়’, ‘সব পেয়েছির দেশে’-র আড়ালে ফুটে ওঠে ছোটো ছোটো দুঃখ হাসির গল্প। মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় ‘child dream’ এর ধারক হয়ে ওঠে গুপী বাঘা।

*গুপী বাঘা এবং প্রতীকীবাদ*

‘শিশুসাহিত্য’ মাত্রেই তা যে কেবল ‘এলিস ইন ওয়াণ্ডারল্যাণ্ডের’ স্বপ্নজগত হবে, এমনটা মোটেই নয়। শিশুসাহিত্য যে প্রতীকীবাদের জন্ম দেয়; তাকে অস্বীকার করি কী করে? এখানে একটা প্রশ্ন আসে, প্রতীকীবাদ কী? বস্তুত, অবচেতনের উন্মোচনকেই আধুনিক প্রতীকীবাদের সচেতন লক্ষণ বলে ধরা হয়। যাকে ফ্রয়েড মনের ‘চেতন স্তর’ বলেছেন, তা যে আসলে অবচেতনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত এবং স্মৃতি ও স্বপ্নের মাধ্যমে মানুষ যে আবার অবচেতনায় তলিয়ে যেতে পারে, সেই তথ্যকে স্বীকার করে প্রতীকীবাদ। বাকশিল্প বা ভাষাই পরমার্থ—- এটি প্রতীকীবাদের মূল প্রত্যয়। আলোচ্যে, আমরা দেখি গুপী-বাঘা স্বয়ং প্রতীকী! কীভাবে? সে প্রসঙ্গে আসতে গেলে আরও কতগুলি বিষয় সম্পর্কে অবগত হওয়া প্রয়োজন।

আগেই বলেছি, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর কথক সর্বজ্ঞ কথক। সেই কথকের চোখে গুপী বাঘার আদল সম্পূর্ণ আদ্যন্ত বাংলার। যে বাংলায় ঈশ্বরী পাটনী; যার ঐকান্তিক ইচ্ছে “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”। গুপী-বাঘাও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই ভূতের রাজার থেকে প্রথম বরে তারা চেয়ে নেয় ইচ্ছামতো যথেচ্ছ খাবার খাওয়ার সুখ। শুণ্ডীর জেলে থাকার সময় এই খাবারই তাদের বাঁচায় সেপাইয়ের হাত থেকে আর এই খাবারের জোরেই তারা মানুষ থেকে দেবতায় রূপান্তরিত হয়। আসলে রাজা-রাজড়ার বাইরে থাকা এই উলুখাগড়াদের জীবনের একমাত্র চাহিদা ছিল দু-মুঠো ভাত। তাই যখন গুপী ” ভূতের দেওয়া থলির ভিতর হাত দিয়ে” বলে, ” ‘দাও তো দেখি, এক হাঁড়ি পোলাও।’ অমনি একটা সুগন্ধ যে বেরুল! তেমন পোলাও সচরাচর রাজারাও খেতে পান না।” সমাজের হাল হকিকতে দাঁড়িয়ে প্রতীকীবাদ যে স্বপ্ন দেখায়, তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ এটি৷ লক্ষ্যণীয়, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ যে সময়ের রচনা তখন সদ্য অভ্যুত্থান ঘটছে নবজাগরণের। ভারতীয় ইতিহাসের পালে লেগেছে উপনিবেশের হাওয়া। চিরাচরিত কৃষিজীবনে নেমে এসেছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, সূর্যাস্ত আইন। তৎকালীন সামাজিক অর্থনৈতিক অবনতির প্রেক্ষাপট নিয়ে সব্যসাচী ভট্টাচার্য বলছেন, “শিশু মৃত্যু, অন্নাভাব ও মহামারীর দৌলতে ভারতে জন্মে গড় আয়ু ২৫ বছর, ১৮৮১ সালের জনগণনা অনুযায়ী। বলে রাখা ভালো যে এই হিসেবটা অস্বাভাবিক নয় বৃটিশ ভারতের পক্ষে; ১৯৩১ সালেও গড় আয়ু ছিল মাত্র ২৬ বছর এবং ১৯৪১ সালে ৩১ বছর।” বস্তুত, তৎকালীন গ্রামবাংলা আদপে “মন্বন্তরে মরিনি আমরা, মারী নিয়ে ঘর করি।” তাই থলেতে যেমন ইচ্ছে খাবার পাওয়ার ইচ্ছে আসলে প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় অভুক্ত, আক্রান্ত না খেতে পাওয়া জীবনে। গুপী বাঘা সেখানে সেই অভুক্ত সমাজের ব্যঙ্গচিত্র।

*…..প্রসঙ্গক্রমেই এসে যায়, আরও একটি বিষয়। তৎকালীন সামাজিক পরিস্থিতি সর্বতোভাবেই প্রভাবিত হয়েছিল রাজনৈতিক অবস্থার দ্বারা। বস্তুত ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর কাহিনীকে একটি রাজনৈতিক গল্প বলা চলে কি না এ বিষয়ে খতিয়ে দেখা দরকার আছে।

*গুপী গাইন বাঘা বাইন এবং একটি রাজনীতির গল্প*

সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “তত্ত্বের যন্ত্রণা, আর ব্যক্তি টেনশন, তত্ত্বের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব আর ব্যক্তির উদ্বেগ এক হলে পলিটিক্যাল নভেল শৈল্পিক রূপ পায়৷ বস্তুত, আমাদের আলোচ্য এরকম কোনও তত্ত্বগত ধারণা বা টেনশন তৈরি করে না বরং তৈরি করে প্রতীকী। আর সেই প্রতীকীর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ‘টেনশন’। শুণ্ডীর রাজা গুপী বাঘাকে তাই ‘ভূত’ ভাবলে স্তাবকবৃন্দের তোষামোদীতে ধরা দেয় লালসার ছবি। এই স্তাবক কারা? হুতোমের ভাষায় —– ” ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি পুরোনো বছরের মত বিদায় হলেন —-কুইন স্বরাজ্য খাস প্রক্লেম কল্লেন ; বাজী, তোপ ও আলোর সঙ্গে মায়াবিনী আশা “কুইনের খাসে প্রজার দুঃখ রবে না” বাড়ি বাড়ি গেয়ে বেড়াতে লাগলেন….।” এ যেন সেই ছেলে ভুলানো ছড়া। এই মধ্যস্বত্ত্বভোগী জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ শুণ্ডীর দারোগামশাই। রাজার আদেশে গুপী বাঘাকে সে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে যায়। প্রসঙ্গত, এই ঘটনা রূপকথার খোলস থেকে বেরিয়ে আসা সত্যি। কীরকম? এ প্রসঙ্গে সাহায্য নেবো আবার সব্যসাচী ভট্টাচার্য-এর। তিনি লিখছেন, “খাজনা আদায়ের জন্য যা যা করা হতো, তা খানিক এইরকম— প্রথম ধাপে কৃষকের উপর শারীরিক নির্যাতন করা হতো। তাতে কাজ না হলে হাত বাড়ানো হতো পরিবারের দিকে। বাবা মায়ের সামনেই নবজাতককে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ বা মহিলাদের যোনীতে জ্বলন্ত মোম ঢুকিয়ে দেওয়া কোনও নতুন বিষয় ছিল না। সবশেষে খাজনা না পেলে ঘরবাড়ি সুদ্ধ জ্যান্ত পুড়িয়ে দেওয়া।” প্রসঙ্গে প্রত্যাবর্তন করা যাক। আমাদের আলোচ্যে খাজনা আদায়ের ছবি নেই বটে, কিন্তু আছে সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নের এবং অবক্ষয়ের ছবি।

সেইজন্যেই গুপী বাঘা বর চায় তিনটি।
যেমন ইচ্ছে খাওয়া, যেখানে ইচ্ছে যাওয়া আর গান গেয়ে, ঢোল বাজিয়ে লোকের মন জয় করা। এখানে কোনও মিথ্যা নেই, যে এই বরের পেছনে আসলে রয়েছে এক বিস্তৃত কালো সময় এবং এক টুকরো আশার আলোর চিরন্তন দ্বন্দ্ব।

*রূপকথা এবং গুপী-বাঘা*

গুপী-বাঘার গল্পে যেভাবে বারবার এসেছে বরদান কিংবা চমৎকার এর গল্প সেই সমস্তই রূপকথার সম্পূর্ণতা। লৌকিক কাহিনীর কথ্য রূপই বরাবর রূপকথা হয়ে এসেছে। কিন্তু সত্যি কি গুপী বাঘার গল্প রূপকথার না রূপকের? আগেও বলেছি গুপী বাঘা আদপে প্রতীকী। ভূতের রাজা এখানে সাধারণ গার্হস্থ্যের অপূরণীয় আকাঙ্ক্ষার অনুসন্ধিৎসু মন। গুপী বাঘা তাই নিমেষেই চেয়ে নেয় তাদের বঞ্চিত সাধ। গল্পের শেষে দেখি ‘ হ্যাপি এণ্ডিং’। রূপকথার যা অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

গুপী বাঘার গল্প তাই অচিরেই হয়ে ওঠে, বাংলাসাহিত্যের মাটির গন্ধে বুঁদ হয়ে যাওয়া শৈশব ; যে শৈশবের কালটি ছিল অনাস্থার, বিশ্বাসটা ছিল আত্মনিমজ্জনের আর সম্পর্কে ছিল জয়ের ডঙ্কা।